বাংলাদেশ, বুধবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

গ্রামকেও শহরের মতো দেখতে চাই

মাহমুদুল হক আনসারী
শহর ও গ্রামের দূরত্ব নীতিগতভাবে কমছে না। গ্রাম এখনো অনেকাংশে অবহেলিত। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবায় গ্রামকে এখনো শহরের মডেলে আনা সম্ভব হয় নি। লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষগুলো উন্নত সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য শহরমুখী হওয়া বন্ধ হয় নি। শহরে বিদুৎ, পানি, গ্যাস, চিকিৎসাসহ আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকলেও এখনো বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামকে সেভাবে রাষ্ট্র তৈরী করতে পারে নি। গ্রামকে নিয়ে শহর তৈরী হলেও কিন্তু সে গ্রাম এখনো রাষ্ট্রীয় শাসনে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের ৮০ হাজারের অধিক কম বেশী গ্রামের অবস্থান হলেও গ্রামের হালচাল জনগণের নাগরিক ভোগান্তির কথা বলে শেষ করা যাবে না। চট্টগ্রামের একটি গ্রামের কথা দিয়ে শহর ও গ্রামের কী পরিমাণ উন্নয়নগত দূরত্ব সেটাই পাঠক সমীপে তুলে ধরার চেষ্টা করব। গ্রামের নাম ১০ নং চাম্বল ইউনিয়ন। ১৫ হাজারের অধিক জনগণ এখানে বসবাস করে। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সমন্বিত বসবাস এ এলাকায়। সম্প্রীতি ভালোবাসা আন্ত:ধর্মের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। কোনো সময় এ এলাকায় ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের সংবাদ পাওয়া যায় নি। এখানে পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা রয়েছে। যার যার ধর্ম মানুষ পালন করছে। স্কুল, মাদ্রাসা, বিদ্যালয় আছে। নিজস্ব ধর্মীয় শিক্ষার অনুশীলন ও আপনাপন গোত্রের মধ্যে আছে। এটা হচ্ছে ধর্মীয় বিষয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি অনুশীলন সব ধর্ম গোত্রের স্বাধীনভাবে পালন দেখতে পাওয়া যায়। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় যে নিয়মে শিক্ষা বিস্তার ও প্রসারের কথা ছিলো সেটা কিন্তু এ গ্রাম অনেক পেছনে। গ্রাম হিসেবে এখানে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্টান সরকারি বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেখানে অনেক অনিয়ম দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা দেখা যায়। ঠিকভাবে ক্লাস, পরীক্ষা ও ছাত্রদের মেধা বিকাশ মূল্যায়ন হচ্ছে না। স্কুল কমিটি ও শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক দূরত্ব ও মতবিরোধ বিদ্যমান। এসব ঘটনা ও পরিস্থিতি শিক্ষার উপর প্রভাব ফেলছে। শিক্ষকদের মধ্যে মতবিরোধ এবং গ্রুপিংয়ের প্রভাব ছাত্রদের মধ্যে তৈরী হয়। এসব কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। দেখা যায়, অনেক ছাত্র সেসব কারণে মাঝপথে ঝরে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতি শহরের স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্টানে করা সম্ভব হয় না। কিন্তু গ্রামে এক শ্রেণীর মানুষ ভিলেইজ পলিটিক্স চালিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্টানকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে। ফলে শহর থেকে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্টান পিছিয়ে থাকে। ছাত্ররা নানা কারণে ছাত্রজীবন নষ্ট করতে বসে। এরপর রয়েছে যাতায়াত ব্যবস্থা। যাতায়াতে দেখা যায় এ গ্রামে যেসব গ্রামীণ রাস্তাঘাট রয়েছে, ওইসব রাস্তার করুণ অবস্থা। ব্রীকসলিনের রাস্তা ভেঙ্গেচুড়ে ধঝভঙ্গ হয়ে পড়ে আছে প্রায় ২ বছর থেকে। স্থানীয় প্রশাসন অর্থাভাবে রাস্তার সংস্কার করতে পারছে না। পরিবহন চলাচল, ছাত্র, রোগী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে চরমভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় জনগণকে। ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তার করুণ পরিস্থিতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্টানে আসা যাওয়া বিঘিœত হচ্ছে। এটাও গ্রাম পিছিয়ে থাকার একটি নমুনা। চিকিৎসায় এত বড় ইউনিয়নে কোনো চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে উঠে নি। সরকারি বেসরকারিভাবে কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা অথবা মহিলাদের প্রাথমিক ও ডেলিভারি সেবার কোনো চিকিৎসা কেন্দ্র এই ইউনিয়নে নাই। বাংলাদেশে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি আদর্শ গ্রামের কথা বলে সারাদেশের গ্রামের উন্নয়নের উদাহরণ সৃষ্টি করার কোনো যৌক্তিকতা দেখছি না। একটি গ্রামের হাজার সমস্যার কথা তুলে ধরে আমি বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের সুখ দু:খের কথা বলার চেষ্টা করছি। মানুষের দৈনন্দিন গ্রামের হাট বাজারের চিত্র আরো ভিন্ন। সেখানে এক ধরনের মোড়ল ও রাজনৈতিক ক্যাডার এসব বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা অযৌক্তিকভাবে টুল আদায় করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অহরহভাবে হয়রানি করছে। অর্থাৎ গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ দু:খ যেসব বিষয়ের উপর নির্ভরশীল সেসব বিষয়ের ভোগান্তির পরিসীমা বলে লিখে শেষ করা সম্ভব হবে না। এরপর আসুন, বিদুৎ, পানি ও বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্তির কথা। সেটা আরো ভয়াবহ। এ গ্রামে এক অঞ্চলে সহজে পানি পাওয়া যায়। আরেকদিকে সুপিয় পানি পাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে এক অমানবিক কষ্ট সহ্য করতে হয়। এরপর বিদুৎতের কথা বলে আর্টিকেল শেষ করব। আর বিদুৎ সেটা কখন আসে কখন যায়, তার কোনো সময় নেই। যখন জনগণের বিদুৎতের দরকার তখন বিদুৎ থাকে না। আর যখন সূর্যের আলো থাকে তখন কোনো কোনো সময় বিদুৎ উপস্থিত থাকে। একটি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের হালচাল ও ভোগান্তির চিত্র উপস্থাপন করে বাংলাদেশের সবগুলো গ্রামের অবস্থা রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস রাখলাম। এ যদি হয় গ্রামের অবস্থা, তাহলে গ্রামে মানুষ কীভাবে বসবাস করবে সেটাই রাষ্ট্রের শাসককে চিন্তা করতে হবে। ফলে গ্রামের মানুষ শহরমুখী, শহরে জনগণের অব্যাহত চাপ বাড়ছে। শহরের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে গ্রামকে শহরের তুলনায় তৈরী করতে হবে । সাজাতে হবে শিক্ষা, বিদুৎ, পানি, চিকিৎসা, বাজারসহ সব ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নে। জননিরাপত্তা, সঠিকভাবে জনগণের নাগরিক অধিকার প্রাপ্তি শহরের মানুষের ন্যায় কাছাকাছিভাবে তৈরী করতে হবে গ্রামকে। তাহলে শহর ও গ্রামের দূরত্ব কমবে। শহরকে সবদিকে তিলোত্তমা নগরীতে সর্বদা অর্থের উপর অর্থ ব্যয় করতে জনগণ দেখছে। কিন্তু গ্রামে বছরের পর বছর রাস্তাঘাট ভেঙ্গে চুরমার হয়ে চলাচল অনুপোযোগী হিসেবে থাকলেও স্থানীয় সরকার তার কোনো প্রতিকার করে না। জনগণের ভোগান্তি আর কষ্টের সীমা থাকে না। এভাবেই বাংলাদেশের গ্রামগুলো এখনো রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে উন্নয়নের আশায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সবসময় গ্রাম উন্নয়ন ও শহর গ্রামের দূরত্ব কমাবার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে সে দূরত্ব এখনো অনেক পেছনে। তাই শহরের উন্নয়নের সাথে গ্রামের উন্নয়ন অগ্রাধিকার রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন ও কর্মসূচীতে প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তাহলেই সম্ভব শহর ও গ্রামের দূরত্ব কমবে। শহরের জনগণের ন্যায় গ্রামের মানুষ তার নাগরিক ও ন্যায্য অধিকার পাবে। রাষ্ট্রের পরিচালকদের গ্রামের ৮৫ ভাগ মানুষের অধিকারের কথা বেশি করে ভাবতে হবে। কারণ গ্রাম বাঁচলেই শহর বাঁচবে। শহর এবং গ্রাম মিলেই দেশ। সুতারাং কোনো অবস্থায় গ্রামকে অবহেলায় রাখা যাবে না। উন্নয়ন ও নাগরিক সব ধরনের সুযোগ সুবিধায় শহর ও গ্রামের সমন্বয় থাকা চায়।

আরো খবর

Leave a Reply