বাংলাদেশ, রবিবার, ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

লুত জাতির ধ্বংসের দৃষ্টান্ত আমাদের শিক্ষা

মো. আলী আশরাফ খান
মহান আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, একমাত্র তাঁরই ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য। তাঁর দেখানো পথে নিজেদের পরিচালিত করার জন্য। কিন্তু মানুষ শয়তানের পদাঙ্ককে আলিঙ্গণ করে নিজেরাই নিজেদের মহাসর্বনাশ ডেকে আনে। গভীর এক ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। ইহকাল ও পরকাল হারিয়ে বরণ করে নেয় মহাক্ষতিকে। অভিশপ্ত হয়ে দোজখে গমন করে অনন্তকালের জন্য। তেমনি ইতিহাসের পাতায় উল্লেখ্যযোগ্য এক জাতি ‘লুত’ তথা ‘সুদুম’। যে জাতি সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়মের লঙ্গণ করে, নিজেরাই নিজেদের মত করে মহা অনৈকিতায় মত্ত হয়েছিল। তারা চরম হীন ও লজ্জাকর কর্মে লিপ্ত হয়ে মানুষ নামের সংজ্ঞা হতে বহু দূরে সরে গিয়েছিল। তারা ইতিহাসের এমনই একটি ঘটনার জন্ম দিয়েছিল-যাদের ধ্বংসের দৃষ্টান্ত পুরো মানব জাতির জন্য এক চরম শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আজ আমরা এ লেখায় লুত জাতি তথা তাদের হীন কর্মকা- ও তাদের ধ্বংসের বিষয়ে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করবো।
আমরা প্রথমে হযরত লুত (আ:) এর পরিচয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে ইতিহাসের পাতা হতে কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি এখানে। ‘লুত’ শব্দটি আসলে লাতা শব্দ থেকেই এসেছে। এর অর্থ হলো-নিজেকে স্নেহভাজন করে তোলা। হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর হৃদয় লুত (আ:) এর প্রতি অতিশয় স্নেহানুরক্ত ছিল বলেই এর নামকরণ হয়েছে বলে নানা তথ্য-উপাত্ত থেকে প্রতিয়মান হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার (লুত)-এর প্রতি বিশেষভাবে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে আপন বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নবুওয়্যাত দান করেন। আমরা জানি, লুত (আ:) ছিলেন ইব্রাহীম (আ:) এর ভাতিজা হারানের পুত্র। তাঁর শৈশবকাল কেটেছে ইব্রাহীম (আ:) এর ছত্রছায়া। লুত (আ:) কে ইব্রাহীম (আ:)-ই লালন-পালন করেন। এজন্যই লুত (আ:) এবং বিবি সাবাহ দ্বীনে ইব্রাহীমের প্রথম মুসলিম বা আনুগত্যকারীদের অন্যতম। ইব্রাহীম (আ:) এর প্রায় প্রতিটি সফরে লুত (আ:) এবং তার স্ত্রী তার সফরসঙ্গী থাকতেন। ইব্রাহীম (আ:) যখন হিজরত করে মিসর গেলেন তখনো লুত (আ:) এবং তার স্ত্রী সঙ্গে ছিলেন। পরবর্তী সময় লুত (আ:) মিসর থেকে হিজরত করে পূর্ব জর্দানের সুদুম (সোডম) ও আরা অঞ্চলে চলে যান। ইব্রাহীম (আ:) চলে যান ফিলিস্তিনে। সেখানে অবস্থান করেন এবং ইসলাম প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। ইব্রাহীম (আ:) এর সময়কালেই লুত (আ:) নবুওয়্যাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। ইব্রাহীম (আ:) এর সময়কাল হতেই লুত (আ:) এর সময়কাল নির্ণয় করা হয়ে থাকে। গবেষণা লব্দ ফলাফল হতে জানা যায়, মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ:) এর জন্মস্থান, তাঁর আগমণ ও সে সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নানা তথ্য-উপাত্ত ইতোমধ্যে মানুষ ভালোভাবেই জেনে গেছেন।
এবার আমরা লুত (আ:)-এর সম্প্রদায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করবো। লুত (আ:) এর জাতি ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী এক স্থানে বসবাস করতেন। যে স্থানটি বর্তমানে ট্রন্সজর্দান বা ধুমজর্দান। বর্তমান যে সাগরকে মৃত সাগর বা ডেডসি বলা হয়। অপর দিকে জানা যায়, ‘সুদুম’ ব্যতীত এ অঞ্চলে আরো চারটি বড় বড় শহর ছিল। প্রত্যেকটি শহরের মাঝখানে বড় বড় সুদৃশ্য বাগান ছিল। ‘ওদুন’ নামে যে এলাকা ছিল তারই আশেপাশে ছিল ‘সুদুম’ এবং ‘আমুরা’ নামক এলাকা। জানা যায়, এখন যেখানে সমুদ্র সেখানে ইতিহাসের কোন এক সময়ে ছিল বিশাল মরুভুমি। কালক্রমে সেই মরুভুমি প্রকৃতির খেয়ালে শহরে রুপান্তরিত হয়। তারপর আবার আসমানী গযবের ফলে সাগরতলে বিলীন হয়ে যায় এ অঞ্চলটি। দৃশ্যমান মৃত সাগর জর্ডান ও ইসরাইল সীমান্তে অবস্থিত। এ বিষ্ময়কর সাগরটি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা নিচু জায়গায় অবস্থিত। সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে ৪০০ মি. নীচু, অতি লবণাক্ততা-যা ২৪০ ভাগ। স্বাভাবিক লবণাক্ততার পরিমাণ ৩০%। এই পানিতে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড ও বিষাক্ত পদার্থের কারণে কোন প্রাণি বাঁচে না বলেই এটিকে মৃত সাগর বলা হয়। এর পানির আপেক্ষিক ঘনত্ব এতো বেশি যে, যাতে হাত-পা বেঁধে ফেলে দিলেও কেউ ডোবে না। এ হ্রদে লবণ জমে অনেক অদৃশ্যমান পিলার সৃষ্টি হয়েছে। আর এই স্থানেই একসময় লুত (আ:) এর জাতি বাস করতেন। চালাতেন চরম হীন কর্মকা-। যার ফলে তাদের উপরই আল্লাহর গযব নির্তাধির হয় এবং এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সে এলাকা সমুদ্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়। গবেষকদের ধারণা, ভুমিকম্পে ইটালীর পম্পেই নগরী যেমন শতশত মিটার নীচে চলে গেছে ঠিক তেমনি লুত (আ:) এর জাতি ভূমিকম্পে শত শত মিটার মাটির নীচে চলে গেছে এবং সে এলাকা সমুদ্রের তলদেশে নিমজ্জিত রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা ‘সুদুম’ ও ‘আমুরার’কে সবুজ শ্যামল ও বেশ উর্বরতা দান করেছিলেন। ওই দুই এলাকায় উর্বরতার পাশাপাশি পানির সরবরাহ ছিল পর্যাপ্ত। যার ফলে নানা রকম শষ্যে ভরপুর ছিল স্থান দু’টি। এককথায়, স্বাচ্ছন্দপূর্ণ জীবনের অধিকারী, জীবনের সব রকমের উপকরণের প্রাচুর্য-ই তাদেরকে দান করেছিলেন সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু লুত (আ:) এর জাতি প্রকৃতির কাছ থেকে এত কিছু পেয়েও তাদের মন ভরেনি-তারা বেপরোয়া জীবনযাপন শুরু করে। হেন হীন কর্ম নেই যে, তাদের মধ্যে দেখ্ াযায় না। সমাজজীবনে ওই জাতি যারপরনাই জুলুম-অত্যাচার, মারামারি, নির্লজ্জতা ও কুকর্ম করছিল। যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিনই বৈকি। আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, সে সময় তারা এমন একটি অপরাধ অবিষ্কার করেছিল যা তখন পর্যন্ত কোন জাতির লোক এর সাথে পরিচিত ছিল না। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন হতে জানা যায় যে, তখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোন মানুষই জানতো না যে, এই ধরনের কোন কু-কর্মও করা যায়! লূত (আ:) এর জাতি শুরু করেছিলেন ‘সমকাম’-যাকে ইংরেজিতে বলে হোমোসেক্স। এমন কুকর্মের জন্ম দিয়ে তারা ব্যাপকারে এর প্রসার ঘটিয়ে ছিলেন। পুরুষেরা নারীর সাথে যৌনক্রিয়া না করে পুরুষে পুরুষে রতিক্রিয়া করাই ছিল তাদেও চরম নেশা। আর এই জঘন্য অপকর্ম তারা প্রকাশ্যে করে বেশি আনন্দ লাভ কর!। যত সুন্দরী নারীই হউক তাদেরকে ত্যাগ করে তারা পুরুষের সাথে রতিক্রিয়ায় মহাব্যস্ত হয়ে উঠতো। শুধু তাই নয়, ওই জাতি কোন বিদেশী মেহমান সুদুম এলাকায় গমন করলেই তার সমস্ত সম্পদ ছিনিয়ে নিত এবং তার সাথে জোর-জবরদস্তি করে সমকামে লিপ্ত হত। একসময় ইব্রাহীম (আ:) আল ইয়ারাজকে সুদুমে প্রেরণ করেছিলেন। তখন ওই এলাকার এক লোক তার মাথায় পাথর ছুঁড়ে এবং তার সব সম্পদ কেড়ে নেয়। অবাক করা কা-! ওই অপরাধী আঘাতের পরিশ্রমের মজুরিও দাবি করেন। আদালতও আঘাতকারীর পক্ষে রায় দিয়ে বলেন যে, তার আঘাতের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও!! আহত ব্যক্তি একটি পাথর নিয়ে বিচারকের মাথায় আঘাত করে তার মাথা ফাটিয়ে দেন এবং বলেন, আমার এই মজুরি আমাতে দিয়ে দাও। এ ঘটনাটি নিছক গল্পও হতে পারে কিন্তু এতে সুদুম জাতির চরিত্র সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আর এমন এক পর্যায়ে লুত তথা সুদুম জাতি পৌঁছে ছিল যে, আসমানী গযব তাদের উপর অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক কুরানুল কারীমে বলেন, ‘আর লুতকে আমি নবী বানিয়ে প্রেরণ করেছি। তারপর স্মরণ করো যখন সে নিজ জাতির লোকদেরকে বললো, তোমরা কি এতদূর নির্লজ্জ হয়ে গিয়েছো যে, তোমরা এমন সব নির্লজ্জতার কাজ করছো, যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করেনি। তোমরা স্ত্রী লোকদেরকে ত্যাগ করে পুরুষদের দ্বারা নিজেদের যৌন ইচ্ছা পুরণ করে নিচ্ছো। প্রকৃতপক্ষে তোমরা একেবারেই সীমালঙ্গণকারী জাতি। কিন্তু তার জাতির লোকদের জবাব এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, বের করে দাও এই লোকদেরকে তাদের নিজেদের জনপদ হতে, এরা নিজেদেরকে বড় পবিত্র বলে দাবী করে। শেষ পর্যন্ত লুত ও তার ঘরের লোকদেরকে তার স্ত্রী ব্যতীত যে পছন্দের লোকদের সাথে রয়ে গিয়েছিল, বেছে বের করে নিলাম। সেই জাতির লোকদের উপর এক প্রচ- বৃষ্টি বর্ষণ করলাম। এরপর দেখ, ওদের সেই অপরাধী লোকদের কি পরিণাম হলো’। (সূরা আরাফ : ৮০-৮৪) এ ছাড়াও লুত (আ:) এর জাতির অনেক অপরাধের কথাই কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। সেসব আপরাধের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ ছিল সমকামিতা। আর এ কারণেই তাদের উপর আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন এমন ধরনের গযব নাযিল করেছিলেন যে, পৃথিবীর ইতিহাস হতে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
এই ঘৃণ্য ও কদর্যপূর্ণ কাজের ফলেই সুদুম জাতির লোকজন পৃথিবীতে স্থায়ী কুখ্যাতী লাভ করে। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে. সমমৈথুন একান্তই প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ। আর এটি কারোই আজ অজানা নয়। মহান আল্লাহ পাক সমগ্র জীব জাতীর মধ্যে স্ত্রী ও পুরুষের পার্থক্য রেখেছেন। আর এই ধারা কেবলমাত্র বংশ রক্ষার উদ্দেশ্যেই নয়, মানবজাতির ক্ষেত্রে এর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে-যা স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে মিলে পরিবার গঠন অতঃপর ক্রমশ এর ভিত্তিতে গড়ে উঠবে সমাজ-সভ্যতা। এ ক্ষেত্রে লুত জাতি শুধুমাত্র নির্লজ্জ নৈতিকতা বিবর্জিত ও চরিত্রহীন-ই ছিল না, তাদের অধ:পতন এতো নিম্নে নেমে গিয়েছিল যে, এই ঘৃণ্য কাজকে তারা কোন অপরাধ বলেই মনে করতো না। এবং এই কাজ যারা ঘৃণা করতো তাদেরকেই ঐ জাতির লোকজন ঘৃণা করতো। শুধু তাই নয়, নানা ধরনের নির্যাতনের পাশাপাশি অস্তিত্বও বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল তাদের। লুত (আ:) এবং তার আদর্শ যারা গ্রহণ করেছিল তাদেরকে ঐ সমাজের লোকজন সে সমাজ হতে বের করে দেয়ার জন্য ছিল বদ্ধপরিকর। লুত (আ:) এর স্ত্রী সুদুম জাতিরই মেয়ে ছিল। সে ছিল সুদুম জাতির যাবতীয় কর্মকান্ডের সমর্থক। এ কারনেই আল্লাহ পাক লুত (আ:) কে আযাব অবতীর্ণ হবার আগে বলেছিলেন, ‘এই স্ত্রীকে তোমাদের সাথে গ্রহণ করো না, সে আল্লাহর বিধানের বিপরীত কর্মকান্ডের সমর্থক। আযাব আসার পূর্বে লুত (আ:) কে ও তার ঈমানদার সঙ্গীদেরকে উক্ত এলাকা থেকে হিজরত করার জন্য আদেশ দিয়ে ছিলেন।
লুত (আ:) কে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ:) এর সহযোগী হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। সুদুম জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যে ফেরেশতা দলের (দুইজন মতান্তরে তিনজন) আগমন ঘটেছিল সে ফেরেশতার দল সরাসরি লুত (আ:) এর কাছে না যেয়ে প্রথমে নবী ইব্রাহীম (আ:) এর নিকট এসেছিলেন। ইব্রাহীম (আ:) তাদের জন্য খাওয়ার আয়োজন করলেন। কিন্তু মেহমানগণ তা খেতে অস্বীকার করলেন। এতে ইব্রাহীম (আ:) ধারণা করলেন যে, এরা কোন শত্রু পক্ষের লোক হবে। মেহমানগণ বললেন, ‘আমরা আযাবের ফেরেশতা। আমরা আল্লাহর নির্দেশে লুত (আ:) এর জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এসেছি’। ইব্রাহীম (আ:) বললেন, ‘সামান্য কোন কল্যাণও যদি ঐ জাতির ভিতর বিদ্যমান থাকে তাহলে সেই কল্যাণের বিনিময়ে ঐ জাতিকে রক্ষা করুন’। কিন্তু ফেরেশতাগণ তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, ‘তাদেরকে অনেক সুযোগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু তারা সে সুযোগ গ্রহণ করেনি। এখন আর কোন অবকাশ নেই। তাদের ধ্বংস অনিবার্য এবং অত্যাসন্ন’। এ প্রসঙ্গে কুরানুল কারীমে উল্লেখ্য যে, “ইব্রাহীম বললেন, ‘হে ফেরেশতাগণ আপনারা কোন অভিযানে আগমন করেছেন’? তারা উত্তর দিল, ‘আমরা এক অপরাধি জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি-যেন আমরা তাদের প্রতি পাক মাটির পাথর বর্ষণ করি। যা আপনার প্রতিপালক এর সীমা লঙ্গণকারীদের জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে। পরে আমি সে সব লোকদেরকে বের করে দিলাম, যারা এই জনপদে মুমিন ছিল”। (সূরা যারিয়াত : ৩১-৩৫)।
অবশেষে আযাবের ফেরেশতাগণ ইব্রাহীম (আ:) এর সাথে দেখা করে লুত (আ:) এর জাতির আবাসস্থল সুদুমে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তারা অপূর্ব সুন্দর চেহারার কিশোর বালক বা তরুণদের আকৃতি ধারণ করে লুত (আ:) এর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলেন। আল্লাহর নবী মেহমানদের দেখে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাঁর চিন্তার কারণ ছিল, সুদুম জাতি সুন্দর চেহারার কিশোর তরুণ দেখলেই তার সাথে জোর করে সমকামে লিপ্ত হতো। লূত (আ:) ভাবলেন, এই মেহমানগণ বয়সে এমন যে, এদেরকে তার জাতির লোকজন দেখলেই শক্তি প্রযোগ করে তাদেরকে ছিনিয়ে নেবে এবং পাপাচারে লিপ্ত হবে। সুতরাং মেহমান রক্ষার চিন্তায় তিনি অস্থীর হয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে তার জাতির লোকজন জানতে পারলো যে, এমন কয়েকজন অতি সুদর্শন তরুণ তাদের শত্রু লুতের বাড়িতে এসেছে। তারা দলবদ্ধভাবে এসে লুত (আ:) এর বাড়ি ঘেরাও করলো। তারা এ তরুণদের তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য বারবার দাবি করতে লাগলো, অন্যথায় তারা শক্তি প্রয়োগ করে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়ারও হুমকি দিল! লুত (আ:) তাদের বুঝালেন এবং বললেন, ‘এই দেশে সুন্দর নারীর অভাব নেই। আমারও মেয়ে রয়েছে, ইচ্ছে করলে তোমরা বিয়ে করে স্বাভাবিক ঘর-সংসার করতে পার’।
কিন্তু সুদুম জাতির লোকজন নবীর কোন যুক্তিই গ্রহণ করলো না। তারা শেষে সময় বেঁধে দিল, এই সময়ের মধ্যে সুদর্শন তরুণদের তাদের হাতে তুলে না দিলে তারা জোর করে বাড়ি থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। লুত (আ:) কথায় কৌশলে তাদের বাড়ির বাইরে রেখে মেহমানদের কাছে এলেন। নবী আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করলেন। আল্লাহ যেন তার জালিম জাতির লোকদের নিকট মেহমানদেরকে রক্ষা করেন। মেহমানরুপী ফেরেশতাগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! আমাদের এই চেহারা দেখে আপনি চিন্তিত হবেন না। কারণ, আমরা মানুষ নই আমরা আল্লাহর ফেরেশতা। আল্লাহর আদেশে আমরা আপনার জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এসেছি। কারণ, আপনার জাতির কর্মকা- এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, তারা আল্লাহর গযবের উপযুক্ত হয়ে পড়েছে। আপনি এবং আপনার সঙ্গি-সাথীগণ এই ধ্বংসলীলা হতে সংরক্ষিত হবেন। কিন্তু আপনার স্ত্রীকে তাদের সাথে ধ্বংস করে দেয়া হবে’। লুত (আ:) আল্লাহর আদেশে তার ঈমানদার সাথীদের নিয়ে রাতের প্রথম প্রহরে নিরাপদ এলাকায় চলে গেলেন। তার স্ত্রী তাদের সাথে যেতে অস্বীকার করেছিল। সে তার নবী স্বামীকে ত্যাগ করে তার জাতীর সাথেই থাকতে অধিক পছন্দ করলো। রাতের এক অংশে যখন অপরাধী জাতি গভীর সুসুপ্তিতে নিমগ্ন ছিল, এমন সময় আল্লাহর ফয়সালা কর্যকর হয়ে গেলো। ভয়ংকর একটা গর্জন হলো, গোটা এলাকাটিকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে তা উল্টিয়ে ফেলে দেয়া হলো। উপর হতে পাথর নিক্ষেপ করে গোটা জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হলো। অপরাধী জাতি তাদের অপরাধের বিনিময় এভাবেই আল্লাহর নিকট থেকে গযব প্রাপ্ত হলো।
আর কেয়ামত পর্যন্ত যে মানব সভ্যতা এই পৃথিবীকে আবাদ করতে থাকবে, তাদের শিক্ষার জন্যই আল্লাহ তায়ালা সুদুম জাতির ধ্বংসের চিত্র পবিত্র কুরআনে এঁকে দিলেন। আল্লাহ তায়ালা সুদুম জাতির ইতিহাস এভাবে বর্ননা করেছেন, ‘ফেরেশ্তাগণ যখন লুত-পরিবারের নিকট আসিল, তখন লুত বলিল, ‘তোমরা তো অপরিচিত লোক’। তাহারা বলিল, ‘না, উহারা যে বিষয়ে সন্দিগ্ধ ছিল আমরা তোমার নিকট তাহাই লইয়া আসিয়াছি। আমরা তোমার নিকট সত্য সংবাদ লইয়া আসিয়াছি এবং অবশ্যই আমরা সত্যবাদী। সুতরাং তুমি রাত্রির কোন এক সময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বাহির হইয়া পড় এবং তুমি তাহাদের পশ্চাৎদানুসরণ কর এবং তোমাদের মধ্যে কেহ যেন পিছন দিকে না তাকায়; তোমাদের যেখানে যাইতে বলা হইতেছে তোমরা সেখানে চলিয়া যাও।” আমি তাহাকে এই বিষয়ে ফয়সালা জানাইয়া দিলাম যে, প্রত্যুষে উহাদের সমুলে বিনাশ করা হইবে। নগরবাসীগণ উল্লসিত হইয়া উপস্থিত হইল। সে বলিল, ‘উহারা আমার অতিথি; সুতরাং তোমরা আমাকে বেইযযত করিওনা। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ও আমাকে হেয় করিও না।’ উহারা বলিল, ‘আমরা কি দুনিয়াসুদ্ধ লোককে আশ্রয় দিতে তোমাকে নিষেধ করি নাই ?’ লুত বলিল, ‘একান্তই যদি তোমরা কিছু করিতে চাও, তবে আমার এই কণ্যাগণ রহিয়াছে’। তোমার জীবনের শপথ, উহারা তো মত্ততায় বিমূঢ় হইয়াছে। অত:পর সূর্যোদয়ের সময়ে মহানাদ উহাদেরকে আঘাত করিল; আর আমি জনপদকে উল্টাইয়া উপর নীচ করিয়া দিলাম এবং উহাদের উপর প্রস্তর-কংকর বর্ষণ করিলাম। অবশ্যই ইহাতে নিদর্শন রহিয়াছে পর্যবেক্ষণ-শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য। উহা তো লোক চলাচলের পথিপার্শ্বে এখনও বিদ্যমান। অবশ্যই ইহাতে মুমিনদের জন্য রহিয়াছে নিদর্শন। (সুরা নাহল : ৬১-৭৭)।
নিঃসন্দেহে নবীগণ হলেন নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তার বাড়িতে মেহমান এলো আর সেই মেহমানকে নোংরা উদ্দেশ্যে সেই জাতি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আক্রমন পরিচালিত করেছিল। এ থেকেই অনুমান করা যায় যে, সেই জাতি কতটা নিচে নেমে গিয়েছিল। তাদের পশু প্রবৃত্তি কতটা নিকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। নির্লজ্জতা তাদেরকে কিভাবে গ্রাস করেছিল। একজন নবীর বাড়ির মেহমানের জান-মাল ইজ্জতের কোন মূল্য তাদের কাছে ছিল না। তালমুদ গ্রন্থে এই সুদুম জাতির আরো বিচিত্র অপরাধের কথা বিষদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা তা এখানে তুলে নাইবা ধরলাম। পোড়া মাটির বর্ষণ সম্পর্কে গবেষকগণ বলেন, ‘হতে পারে তা পোড়া মাটিকে পাথরে রূপান্তরিত করে তা বৃষ্টির আকারে বর্ষণ। অথবা উর্ধ্বগগন হতে পোড়া মাটির মত উল্কাপাত। আবার এমন হতে পারে, আগ্নেয়গিরি অগ্নুৎপাতের ফলে তা মৃত্তিকাগর্ভ হতে বের হযে তাদের উপর চতুর্দিক হতে বৃষ্টির মত বর্ষিত হয়েছিল। অথবা একটা প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় তাদেরকে পরিবেষ্টন করা হয়েছিল এবং সেই ঝড় তাদের উপর পাথর বর্ষণ করেছিল। কিন্তু এই মহাঅভিসম্পাদ ধ্বংসপ্রাপ্ত এই এলাকাটি লোক চলাচলের পথের পাশে অবস্থিত, হিজাজ থেকে সিরিয়া এবং ইরাক হতে মিসর যাবার পথে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাটি দৃশ্যমান। সাধারণত বাণিজ্য যাত্রীদল এ ধ্বংসের নিদর্শনগুলো দেখে থাকেন। বার্তমানেও সমগ্র এলাকা জুড়ে এ ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে এখনও। যা মানবজাতির জন্য এক শিক্ষয়ণীয় বিষয়।
পরিশেষে আমরা এখানে সমকামিতা সম্পর্কীয় একটি হাদিস দিয়ে লেখাটির ইতি টানবো। রাসূলে পাক হযরত মুহাম্মদ (স:) এরশাদ করেন, ‘আমি তোমাদের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টির আশংকা করি, তা হচ্ছে কওমে লুতের জঘন্য কাজ’। অত:পর তিনি এই দুষ্কর্মে লিপ্তদেরকে এই বলে তিনবার হুশিয়ার করেন: ‘কওমে লুতের দুষ্কর্ম যে করবে তার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত”। (ইবনে মাজাহ, তিরমিযী, হাকেম)। সুতরাং লুত সম্প্রদায়ের ওই ধ্বংসের দৃষ্টান্তই হতে পারে আমাদের জন্য শিক্ষার একটি বড় উদাহরণ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বোঝার এবং ধর্ম মেনে নৈতিকতার পথে চলার তৌফিক দান করুন। (আমিন)।

আরো খবর

Leave a Reply

Close