বাংলাদেশ, বুধবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি সরকারের অদূরদর্শীতা

মাহমুদুল হক আনসারী
নতুন করে জ্বালানী গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সংবাদে সাধারণ জনমনে উদ্বেগ উৎকন্ঠা দেখা যাচ্ছে। স্বভাবতই এটা হওয়া স্বাভাবিক। কারণ জ্বালানী গ্যাসের সাথে দেশের সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ সম্পৃক্ত। যারা ব্যবসায়ী জ্বালানী গ্যাসের সাথে সরাসরি সংযুক্ত যেমন পরিবহন সেক্টর, খাদ্য উৎপাদনশীল মিল কারখানা, কৃষির সাথে সম্পৃক্ত সেচ প্রকল্প, সার উৎপাদন কারখানা ইত্যাদি তাদের পণ্যের অবশ্যই মূল্য বাড়াবে। জ্বালানী গ্যাসের দাম বাড়ার ঘোষণার সংবাদে ইতিমধ্যে এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সারাদেশে পরিবহন সেক্টরে শ্রমিকরা গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। দাম বাড়ার পেছনে সরকারের লাভের চেয়ে জ্বালানী গ্যাসের সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের লাভ বেশি হবে বলে মনে করছে অভিজ্ঞ মহল। বাসা ভাড়া বাড়বে, বিদুৎ বিল বাড়বে, এক কথায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের উপর আরেক দফা দাম বেড়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ফলে আম মানুষের জনভোগান্তি দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় খরচ সব খাতেই বেড়ে যাবে। অভিজ্ঞ মহল মনে করছে এটা সরকারের একটা অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত সরকার না নিলেও পারতো। কারণ একটি মাত্র জ্বালানী গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়বে সেখানে কোনো সন্দেহ নেই। এটা করে সরকার মূলত সাধারণ মানুষ বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো খেটে খাওয়া মানুষ। যারা কর্ম করে চাকরী অথবা কায়িক পরিশ্রম করে জীবন জীবিকা পরিচালনা করে তাদের উপর বেশি প্রভাব পড়বে। যারা ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারি বেশি করে বললে যাদের জমিদারী আছে, তাদের কোনো সমস্যা হবে না। যারা বড়লোক তাদের নানাভাবে অর্থ চলে আসবে। তাদের অর্থনৈতিক ভোগান্তি ও সমস্যার কিছু নেই। যত সব সমস্যা আর ভোগান্তি সাধারণ জনগণের। তাহলে সরকার কাদের পক্ষে অবস্থান নেবে। সাধারণ মানুষ না, স্বল্প সংখ্যক পুঁজিপতিদের পক্ষে। সরকার যদি মনে করে সাধারণ মানুষের সুখ দু:খ সেটা যেখানেই যাক আমার কিছু যায় আসে না। যদি তাই হয় তাহলে দেশে যে হারে পণ্যমূল্য অস্থিতিশীল হয়ে পাগলা ঘোড়ার মতো চলে সেখানে যেরকম সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, একই নিয়মে জ্বালানী গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে আম জনগণকে অর্থনৈতিক ভোগান্তিতে ফেলতে চায়, তাহলে কারো কিছু করার থাকে না। জনগণের দু:খ দুর্দশা আর অধিকার নিয়ে কথা বলার গণতান্ত্রিক যেসব প্রতিষ্টান দেশে আছে তারাও মন খুলে কথা বলতে পারছে না। অঘোষিতভাবে রাজনীতি নেতা নেত্রী ও সভা সমাবেশ অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। ফলে জনগণের দাবি দাওয়ার কথা বলার প্লাটফরম থাকলেও অচল। এ অবস্থায় জনগণের সম্পৃক্ত সবকিছু কার্যকর আরো কার্যকর করার ক্ষমতা সরকারের উপর নির্ভর করছে। একমাত্র সরকারি পারে জনগণকে কীভাবে রাখবে ও চালাবে। ইচ্ছে করলে সরকার জনগণের সবগুলো ভোগ্যপণ্যের উপর সব ধরনের টেক্স ভ্যাট সহনশীল করে জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পারে। আবার চাইলে জনগণের ভোগান্তি বাড়ানোর জন্য সবগুলো পণ্যের চরমভাবে মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে। এক কথায় ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত কেউ বাস্তবায়ন করতে পারে না। তাহলে জনগণকে পিষিয়ে মারতে সরকারের এসব সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। এ জন্যেই বলছি যেসব বিষয় থেকে জনগণ সরাসরি উপকৃত হয় সেসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে জনগণকে কষ্টে ফেলার কোনো কারণ দেখছি না। আমি বলবো সরকারের যতগুলো মন্ত্রণালয় আর সেক্টর রয়েছে সেখান থেকে লুটপাট আর দুর্নীতি বন্ধ করুন। অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয় খরচ সংকোচিত করা হোক। মন্ত্রণালয়ের কর্মচারিদের অপ্রয়োজনীয়, অপব্যয় খরচ বন্ধ করুন। সরকারি কর্মচারিদের দুর্নীতির অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হোক। এভাবে রাষ্ট্রের লুন্ঠিত অর্থ জাতীয় ফান্ডে ফেরত আসলে বাংলাদেশকে বহি:বিশ্ব থেকে কোনো লোন নিতে হবে না। বার বার কর্মকর্তা কর্মচারিদের বেতন ভাতা চালাতে জনগণের উপর মূল্য বৃদ্ধির বোঝা চাপাতে হবে না। তাই বিজ্ঞ মহলের মতে সরকার ব্যবসায়ী শিল্পপতি আর সরকারি কর্মচারিদের পেট ভরাতে এসব সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এসব সিদ্ধান্তের সাথে জনগণের মোটেই সমর্থন নেই। জনগণ সমর্থন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত আইন জনতার উপর চাপিয়ে দেয়া মোটেই সংবিধান সম্মত নয়। সরকারি আইন সার্কুলার বাস্তবায়নের পূর্বে জন মতামতের গুরুত্ব থাকা চায়। সেটা না করে ইচ্ছেমতো যেকোনো সিদ্ধান্ত আম জনতার উপর চাপানোর ক্ষোভ কোনো কোনো সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়। এটা কোনো অবস্থায় কোনো সরকারের জন্য শুভনীয় নয়। ভুর্তকী সরকার অনেক জায়গায় দিচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আম জনতার কল্যাণে রাষ্ট্রের পক্ষে ভুর্তকী দেয়ার সংবাদ আছে। আমাদের দেশে তার বিপরীত। পরিবহন সেক্টরের মূল্য বাড়লে ছাত্র ছাত্রীদের পরিবহন ভাড়াও বেড়ে যাবে। এটাও সরকারকে ভাবতে হবে। এমনিতে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের গণপরিবহনের কোনো শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থা নেই। স্কুল, কলেজে যাতায়াতে ছাত্রদের অসহনীয় পরিবহন সংকট নিত্যনৈমিত্তিক। সেখানে নতুন করে ভাড়া বৃদ্ধি পেলে শিক্ষার্থীদের উপর চরমভাবে ভোগান্তি নেমে আসবে। সবকিছুর পেছনে যোগান দিতে হবে অভিভাবককে। এ অভিভাবক অর্থ সাধারণ মানুষ, এ মানুষগুলো সরকারের অদূরদর্শীতায় বার বার পারিবারিক অর্থনীতি পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। এসব কিছু শৃঙ্খলায় আনতে হলে অবশ্যই সরকারকে জনগণের সুখ দু:খের পাশাপাশি থাকতে হবে। তাহলেই সম্ভব নাগরিক স্বস্তি আর প্রশান্তি।

আরো খবর

Leave a Reply