বাংলাদেশ, সোমবার, ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ১লা পৌষ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শিশুদের যৌন নির্যাতন একটি পর্যালোচনা

মাহমুদুল হক আনসারী
শিশু হচ্ছে পবিত্র একটি ফুল। দুনিয়াতেও শিশুরা ফুল, বেহেস্তেও তাদেরকে ফুল হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। ইসলামের প্রবর্তক নবী মুহাম্মদ (স.) শিশুদের প্রতি অধিক ভালোবাসা স্নেহ দেখাতেন। তিনি শিশুদের সাথে খেলতেন এবং তাদের সাথে রুচিশীল আচার ব্যবহার করতেন। কোনো শিশু কান্না করলে তখন তিনি শিশুর কান্না থামাতে বলতেন। শিশুকে নৈতিক চরিত্র শিখাতে প্রায় সময় শিশুকে সালাম দিতেন। পাশে টেনে আগলে ধরে আদর স্নেহ দিয়ে পাশে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো অনেক ঘটনা ইসলামের উজ্জ্বল ইতিহাসে পাওয়া যায়।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষৎ। পরিবার রাষ্ট্রের জন্য তারাই হবে কর্ণধার। দেশ, রাষ্ট্র, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব আসবে একদিন তাদের উপর। শিশুদের চরিত্র আদর্শে বড় করার দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের। সামর্থ্যের মধ্যে শিক্ষায় ও নৈতিকতায় তাদের গড়ে তোলার দায়িত্ব সকলের। একটি সমিক্ষা এবং বর্তমান সমাজের নানা ক্ষেত্রে শিশুর প্রতি নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র জাতিকে ভাবিয়ে তুলছে। শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণ, যৌন নিপীড়ন যেনো জাহিলী যুগকে হার মেনেছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই দেশের কোথাও না কোথাও তিন বছরের শিশু থেকে এগারো বছরের শিশু পর্যন্ত নরপশূদের লালসার শিকারে নির্যাতিত হওয়ার সংবাদ দেখছি। কোথাও প্রতিষ্টান ভিত্তিক নির্যাতিত, আবার কোথাও কোথাও পারিবারিক নিকট আত্মীয় প্রতিবেশী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিশুরা। মর্মান্তিক লোমহর্ষক এসব শিশু যৌন নির্যাতনের সামাজিক চিত্র জাতিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। জাহিলী সমাজে যে ধরনের চরিত্র ছিল না এর চেয়ে জঘন্য চরিত্র বর্তমানে শিশুদের প্রতি সমাজ দেখছে। বিবিসি বাংলার সাম্প্রতি এক সমীক্ষায় জানা যায়, মাত্র ১৫ দিনের একটি সমীক্ষা তারা দেশে চালায়। সেখানে বিবিসি ৪৭টি শিশু ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন নির্যাতনের সংবাদ সংগ্রহ করেছে। এসব সংবাদে মাত্র ১৫ দিনে ৪৭টি শিশু কেউ ধর্ষণ অথবা ধর্ষণ চেষ্টার মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি ছিলো ধর্ষণের ঘটনা। দেশের (উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন) এই তথ্য দিয়েছে। শিশুদের প্রতি হঠাৎ করে নির্যাতনের এমন আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানবাধিকার সংগঠন সমূহ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শিশুদের কীভাবে নিরাপদে ঘরে বাইরে রেখে বড় করবে সেটা নিয়ে অভিভাবক মহল গভীরভাবে উৎকন্ঠিত। চাকরীজীবি অনেক মা-বাবা অফিসে থাকলেও তাদের সন্তানদের কারণে সারাক্ষণ চিন্তিত থাকেন। এ রকমই এখন চতুর্দিকে উদ্বেগ উৎকন্ঠা বেড়ে চলছে। একজন মা সেই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, চারপাশে আজকাল যা ঘটছে তা খুবই ভীতিকর ও মর্মান্তিক। লেখাটি যখন লিখছিলাম তখন পত্রিকার পাতায় দেখছি একটি কওমি মাদ্রাসার মহিলা হোস্টেলে থাকা ১২ জন মহিলা ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন করেছে ১ বছরে ওই হোস্টেলের শিক্ষক। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রের উপর যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন ধারাবাহিকভাবেই চলছে। গত ১০ এপ্রিল চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার অনন্যা আবাসিকস্থ একটি কওমি মাদ্রাসায় একজন ছাত্রকে যৌন নিপীড়ন চালিয়ে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখার সংবাদ এ এলাকায় ব্যাপকভাবে আলোচনার ঝড় তুলে। এ ঘটনায় মামলা হলে ওই মাদ্রাসার ৩ জন শিক্ষক বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। সারাদেশে প্রতিদিন কোনো না কোনো এলাকায় এসব মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্টানে অহরহ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। লাগামহীনভাবে এ ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে সরকারি প্রতিষ্টানের বিপরীত প্রাইভেট এসব মাদ্রাসাগুলোর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ দেখছি না। অনিয়ন্ত্রিত এসব প্রতিষ্টানে জঘন্য অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের যৌন নিপীড়ন অব্যাহত একটি মর্মান্তিক সমস্যা। সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় এসব প্রতিষ্টান কঠোরভাবে আইনের আওতায় আসছে না। এরপর নানাভাবে দেশে পারিবারিক সামাজিকভাবে যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় পারিবারিক সামাজিকভাবে উৎকন্ঠা বৃদ্ধি পেয়েছে। নানাভাবে চলচাতুরী লোভ দেখিয়ে শিশুদের যৌন নির্যাতন করার সংবাদ পত্রিকায় নিয়মিত দেখছি। এখন এসব সামাজিক অবক্ষয়ের গভীর চিন্তায় অভিভাবক মহল উৎকন্ঠার মধ্যে আছে। বর্তমান অতীত সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এখন একটি কঠিন সময় অতিবাহিত হচ্ছে বলে সমাজবিজ্ঞানীগণ মনে করছেন। যেভাবে কিশোর থেকে শিশু পর্যন্ত নানাভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তাতে অবশ্যই সমাজকে গভীরভাবে ভাবা দরকার। এবং শিশু কিশোর যৌন নির্যাতন থেকে বিভিন্নমুখী অপরাধ নিয়ে এখন থেকে কঠোরভাবে ভেবে একটি অবক্ষয় মুক্ত সমাজ প্রতিষ্টার দিকে ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে। শিশুর প্রতি ভালোবাসা দায়িত্বনুভূতি জাগাতে হবে। ¯েœহ, ভালোবাসা ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা শিক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নিজ নিজ ধর্মের প্রতি অনুশীলন ও অনুশাসন আনুগত্য রপ্ত করতে হবে। আজ ও আগামী সমাজ বিনির্মাণে শিশুর সুরক্ষা তাদের প্রতি যতœ সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কোনো অবস্থায় এ দায়িত্বের প্রতি অবহেলা অবজ্ঞা সমাজ ও রাষ্ট্রের মারাত্মক অবনতি বয়ে আনবে। আধুনিক সমাজ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে শিশুর প্রতি গভীর ভালোবাসায় যতœবান হই। তাহলেই হয়তো শিশুর প্রতি নিষ্টুরতা ও যৌন নির্যাতন কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে ।

আরো খবর

Leave a Reply

Close