বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সন্তান এবং সুসন্তান

 

মাহমুদুল হক আনসারী

ছেলে ও মেয়ে সন্তান যাই হোক আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতা মাতার নিকট মহা এক নেয়ামত। বৈধ স্বামী-স্ত্রী সামাজিকভাবে পরিণতির মাধ্যমে মাতৃ গর্ভে জন্ম নেয়া আল্লাহর এক বিশেষ অলৌকিক  প্রক্রিয়ায় সন্তান সন্তুতি পৃথিবীতে আগমন করে থাকে। মাতা পিতার ভালোবাসার প্রতিক সন্তান সন্তুতি। সন্তানের  পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবন, পরিবার, সমাজ ও আত্মীয়তার মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরী হয়। দাম্পত্য জীবনে অনেকের সন্তানাদি জন্ম হয় না। কোনো কোনো পরিবারে একাধিক সন্তানাদির জন্ম হয়। আবার অনেক পরিবারে কোনো প্রকারের সন্তানাদি দেখে না। তাদেরকে নি:সন্তান পরিবার হিসেবে সমাজে আখ্যায়িত করে। পরিবারে ছেলে মেয়ে যেই হোক না কেন, সন্তানাদির আগমনে খুশির বন্যা বয়ে যায়। আবার, যেসব পরিবারে সন্তানাদির জন্ম হয় না, সেখানে পারিবারিক, সামাজিক অশান্তির সূত্রপাত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওই কারণে পারিবারিক বন্ধন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হতেও দেখা যায়। পৃথিবীকে দীর্ঘায়ু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্টা করতে হলে অবশ্যই পরস্পরা সন্তানাদির জন্মের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অব্যাহত নিয়মে ধরে রাখতে হলে মানবতার জন্ম প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। জন্ম এবং মৃৃত্যু দু’টোই সৃষ্টিকর্তার অফুরন্ত দয়া ছাড়া কিছুই নয়। মাতৃগর্ভে ছেলে না মেয়ে আসবে সেটা সৃষ্টিকর্তাই নির্ধারণ করে থাকেন। আজকের যুগে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে কী সন্তান জন্ম নেবে সেটা  পরিক্ষার মাধ্যমেও জানা যাচ্ছে। আবার, যেসব মহিলাদের সন্তান জন্ম দেয়া সম্ভব হয় না, সেটাও পরিক্ষার মাধ্যমে জানা যায়। আমার আলোচ্য বিষয় ‘সন্তান এবং সুসন্তান’। বিষয়ের দিকেই আলোকপাত করতে চাই। সন্তান আল্লাহ প্রদত্ত মহা নেয়ামত। সে সন্তান ছেলে হোক অথবা মেয়ে হোক। একটা সন্তানের মাতৃগর্ভে আসার পর থেকে নয় মাস দশ দিন চিকিৎসকের হিসেব মতে মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে আগমন করে। সেসময় থেকে জন্ম নেয়ার মাধ্যমে সন্তানের লালন পালন, নার্সিং, সেবা সবকিছুর দায়িত্ব থাকে প্রথমত মায়ের উপর। এরপর পিতা এবং পরিবারের অন্যান্যদের উপর। জন্মের পর থেকে একজন সুস্থ মা তার সন্তানকে কমপক্ষে ২ বছর ৬ মাস তার সন্তানকে বুকের দুধ পান করিয়ে বড় করতে থাকে। সাথে তার সুস্বাস্থ্যের জন্য যা যা করণীয় তা পারিবারিকভাবে সন্তানের জন্য করা হয়। আদর, ¯েœহ, মায়া মমতা, আর পারিবারিক ও সামাজিক ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে পর্যায়ক্রমে বড় করতে থাকে। এভাবে সে যখন কথা বলতে শিখে তখন তাকে অক্ষর জ্ঞান আর হাঁটা চলা শিখিয়ে ধীরে ধীরে মক্তব, স্কুল পর্যন্ত নেয়া হয়। তখন থেকে শুরু হয় তার প্রাতিষ্টানিক শিক্ষা কার্যক্রম। যতদিন না ওই সন্তান নিজে নিজে মক্তব স্কুলে যেতে পারে না, সে পর্যন্ত পিতা মাতার তত্তাবধানে সন্তান বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করে। এভাবে সামর্থ্যবান পরিবার তার সন্তানদের পেছনে বছরের পর বছর কয়েক যুগ পর্যন্ত অথর্, সময় নি:স্বার্থ ভাবে ব্যয় করতে থাকে। কখন সে সন্তান বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে, পিতা মাতা আর পরিবারের সকলের চেহারা আলোকিত করবে সেটার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে থাকে। দীর্ঘ সময় সন্তানের পেছনে অর্থ আর জীবন ব্যয় করতে করতে মাতা পিতা হয়ে পড়ে বয়ো:বৃদ্ধ আর সামর্থহীন। সন্তান যখন পড়ালেখা আর বয়সে বড় হতে থাকে, তখন পিতা মাতা ও পরিবারের অন্যরা ক্ষেত্র বিশেষে আনন্দ উপভোগ করে। সন্তান যখন পড়ালেখা, চরিত্র, আচার আচরণে নৈপূণ্য প্রদর্শন করে তখন তার প্রতি সকলের আদর ¯েœহ বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে তার বিপরীত চরিত্র সন্তানদের আচার অনুষ্টানে প্রদর্শিত হলে সেক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রীয়ভাবে মাথা নিচু হয়ে যায় মাতা পিতার। পরিবার ও সমাজের অনেকের সামনে তখন সন্তানের পিতা মাতারা সম্মানের চেহারা দেখাতে কষ্ট হয়। বিষয় ছিল সন্তান এবং সুসন্তান। সন্তান একটি বিষয়, সুসন্তান আরেকটি কঠিন বিষয়। সন্তান যত্রতত্র জন্ম দেয়া ও নেয়া যায়। কিন্তু সুসন্তান হিসেবে সন্তান পাওয়া সময়ের প্রেক্ষাপটে কঠিন একটি বিষয়। সমাজে দেখা যায়, সন্তানের প্রাচুর্য্য আছে। সন্তান আছে অনেকের কাছে, কিন্তু সুসন্তানের যথেষ্ট নাকাল এ সমাজে। সে অনেক দিন আগে আমরা শুনেছি, সন্তানরা পিতা মাতার লালন পালন আর সেবা দিতে জীবন বাজি রাখত। নিজে না খেয়ে না পরে, জীবনের আয়ের উৎস পিতা মাতার সুখ শান্তির জন্য খরচ করতো। বেশিদিন আগের কথা নয়, মাত্র কয়েক যুগ পূর্বেও এমন দৃশ্য আমাদের সামনে ছিল। আজকের আধুনিক ও বিজ্ঞানের যুগে এসে দেখতে পাচ্ছি এ যুগের সন্তানরা মাতা পিতা ও পরিবার থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। শুনছে না পিতা-মাতা, বড়জনের উপদেশ পরামর্শ। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সন্তানদের শিক্ষার ডিগ্রির সাথে পরিবার থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক শৃঙ্খলা অনেক সন্তানরা অনুসরণ করছে না। পিতা মাতার অবাধ্য ও উশৃঙ্খল হয়ে এক ধরনের পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করছে। সে এবং তার জীবনকে বেঁকে ফেলছে। শিশু, কৈশোর জীবনে তাকে যেভাবে তৈরী করতে পারিবারিক চেষ্টা ছিল ক্ষেত্র বিশেষে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে পরিবার ও সমাজ সেসব সন্তান থেকে সুখ, শান্তি ও কল্যাণ পাচ্ছে না। সুসন্তান সেটা এক পারিবারিক সুখের নাম। আর শুধুমাত্র সন্তান সেটা ক্ষেত্রবিশেষে উপকারের পরিবর্তে অপকার ও সামাজিক মারাত্মক অশান্তি। যারা সন্তানকে সুসন্তান হিসেবে তৈরী ও গঠন করতে পেরেছে মূলত তারা সুখি মানুষ। তাদের পরিবার ও সামাজিক জীবন আলোকিত জীবন। আর যারা এর বিপরীত সন্তানের পিতা মাতা হয়েছে, তাদের জীবনে কী পরিমাণ অশান্তি আর দুর্গতি সেটা ভূক্তভোগী পরিবার ভালোভাবে বুঝে। পৃথিবীতে সন্তান আর সুসন্তান দুটোই আছে। সন্তান অসংখ্য আর সুসন্তান স্বল্প সংখ্যক। এ সুসন্তানরাই সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধরে রেখেছে। তারাই সমাজের রক্ষক। সমাজকে তারাই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ছেলে সন্তানহারা যেসকল মাতা পিতা আশ্রয়হীন ওই সুসন্তানরাই তাদেরকে আশ্রআয়ন করছে। সেটাই সমাজ দেখছে। আলোকিত স্বল্প সংখ্যক সন্তানরা সমাজের জন্য আশীর্বাদ ও মহান গুরু। যুগে যুগে তারা ছিল, তারা থাকবে এবং আছে। যেসব মহা মনিষী পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এখনো করছে তার সকলেই মাতা পিতার বাধ্য সুসন্তান ছিল। মাতা পিতার আশীর্বাদ আর দোয়ার কারণে এসব সুসন্তানরা পৃথিবী জয় করতে সমাজ দেখেছে। সমাজ ও পৃথিবী তাদের নিকট আজ ও আগামী দিন চীর কৃতজ্ঞ থাকবে। আর যারা মাতা পিতার অবাধ্য হয়ে শুধুমাত্র সন্তানের তালিকায় নাম রেখে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চায়, তারা ও তাদের জীবন অভিশপ্ত জীবন। সেসব জীবনের দুই পয়সার মূল্য নেই। এ জীবন আর মৃত্যুর পরের জীবন কোনো কালেই তাদের কল্যাণ সুপ্রসন্œ্ নয়। সুসন্তানের জন্য পৃথিবীর সমস্ত রাস্তা ঘাট অত্যন্ত পরিষ্কার ও সহজ। আর এর বিপরীত সন্তানদের জন্য দুনিয়া ও তার পরের জীবন কঠিন ও মর্মান্তত যা বলে লিখে শেষ করা যাবে না। মাতা পিতার সুসন্তানদের জন্য রইল অসংখ্য আশীর্বাদ, দোয়া আর প্রার্থনা। এগিয়ে যাও, এগিয়ে চল তুমি  তোমার পরিবার ও সমাজকে নিয়ে। এর বিপরীত মেরুতে যারা আছো, তোমাদের জন্য কঠিন সময় ও শাস্তি অপেক্ষা করছে। ফিরে এসো, না হয় তোমাদের সব জীবন একদিন মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হবে।

আরো খবর

Leave a Reply