ডিসেম্বর ২, ২০২১ ৪:৪০ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামে স্কুলের পিওনকে ফাঁসাতে প্রধান শিক্ষকের একি কান্ড ?

 

চট্টগ্রাম অফিস 

 

 

 

 

চট্টগ্রাম নগরীর কদম মোবারক সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে ওই স্কুলের পিওনকে ফাঁসাতে চুরি ঘটনা সাজিয়ে প্রধান শিক্ষক নিজেই বেকায়দায় পড়েছেন। প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসায় প্রধান শিক্ষক সেই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়েছে।।

প্রধান শিক্ষককের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কেউ প্রতিবাদ করলে তাদেরকে বিভিন্নভাবে ফাঁসিয়ে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ।

জানা গেছে, আন্দরকিল্লাস্থ কদম মোবারক সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে গত ২ এপ্রিল রহস্যজনক চুরির ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় গত ৪ এপ্রিল একটি ডায়েরী করেন। চুরির বিষয়টি লিখিতভাবে প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান সিটি কর্পোরেশনকে অভিহিত করেন। প্রধান শিক্ষককের দুই জায়গায় দুটি অভিযোগ করলেও একটি অভিযোগ অন্য অভিযোগের সাথে মিল নেই। থানার সাধারণ ডায়েরীতে নগদ ২৫ হাজার টাকা চুরির বিষয়টি প্রধান্য দেয়া হলেও সিটি কর্পোরেশনের অভিযোগে  দুটি ল্যাপটপ চুরির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে রয়েছে মূল  রহস্য। স্কুলে চুরির বিষয়টি তদন্ত করতে এসে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মূল রহস্য। স্কুলে রক্ষিত সিসিটিভির ক্যামরা ফুটেজেও মেমোরী থেকে মুছে দেন প্রধান শিক্ষক। ঘটনার দিন স্কুলের পিওন প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে মৌখিক ছুটি নিয়ে বাঁশখালী গ্রামের বাড়িতে ছিলেন বলেও স্কুলের একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীরা জানান। তবে যে দুটি ল্যাপটপ চুরির কথা বলে হচ্ছে ল্যাপটপ দুটি প্রধান শিক্ষকের বাসায় পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্কুলের কর্মচারী-শিক্ষকেরা ধারণা করছে। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে স্কুলের কোন শিক্ষক-কর্মচারীর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে তাদেরকে হয়রানির চেষ্টা করেন। এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে স্কুলের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য  শিক্ষার্থীদের উপর বিভিন্ন কৌশলে চাপ সৃষ্টি এবং চলতি বছর এসএসসি পাশ করা শিক্ষার্থীদের সনদ আটকে রেখে তাদের কাছ থেকে সাদা কাগজে জোর পূর্বক স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে এই প্রধান শিক্ষক স্কুল থেকে শাস্তিমূলক বদলী হয়েও  আবার নানান কৌশলে যোগদান করেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে অবৈধভাবে টাকা আদায়, স্কুলের বিভিন্ন ফান্ডের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমানের অনিয়ম দুর্নীতির কারণে স্কুলের সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৩ জুন সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ পারভেজ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভয় হুমকির অভিযোগে গত বছরের ১৪ মার্চ স্কুলের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় প্রধান শিক্ষক মোবাইলে ডেকে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে। গত ৩১ মে এসএসসি পরীক্ষার মূল সনদ আনতে গেলে প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে সহকারী  শিক্ষক  দিদারুল আলম জোর পূর্বক স্বাক্ষর নেন। অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে শিক্ষা জীবন নষ্ট করে দেয়ার হুমকি দেয়। বিষয়টি শিক্ষা কর্মকর্তার কাছেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সম্প্রতি প্রধান শিক্ষক অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে ১০৯ জন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে ২০০ টাকা নেয়ার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে টাকা ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও টাকা ফেরত দেয়া হয়নি। ভর্তির সময় নির্ধারিত ৩ হাজার টাকার বাইরে বিনা রশীদে বিভিন্ন অজুহাতে শতশত টাকা আদায় করা অভিযোগ রয়েছে।

এই স্কুলের পদাধিকার বলে সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে সিটি মেয়র এম. রেজাউল করিম চৌধুরী ও কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছে স্থানীয় কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী। স্কুলের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি শিক্ষক ও অভিভাবকেরা সিটি মেয়র এম. রেজাউল করিম চৌধুরীকেও জানিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী বলেন, স্কুলে চুরি হয়েছে বলে শুনেছি তবে চুরির ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছেও রহস্যজনক বলে মনে হয়েছে। যাতে অন্যায়ভাবে কেউ কোন ব্যক্তিকে ফাঁসাতে না পারে সেদিকে কমিটির খেয়াল রাখবে। যদি প্রধান শিক্ষকের কোন দোষ প্রমানিত তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান  উপরোক্ত বিষয়ে লিখিতভাবে আমাদের মেইলে জানান,আমার বক্তব্য নিম্নরূপ

১. মামলার অভিযোগ ও সিটি কর্পোরেশনে অভিযোগ একই। সিটি কর্পোরেশনের
অভিযোগে পুরাতন ০২টি ল্যাপটপ চুরি যাওয়া যোগ হয়েছে মাত্র। প্রধান শিক্ষকের বাসায় পাওয়া যাবে কথাটি আমাকে হেয় ও অপমানিত করার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের ০২টি সচল ল্যাপটপ রয়েছে। স্কুল বন্ধের সময় অনলাইন ক্লাস ও অফিসিয়াল কাজের প্রয়োজনে একটি আমার বাসায় ও একটি সহ. প্রধান শিক্ষকের বাসায় থাকে। স্কুল খোলা থাকলে অবশ্যই অন্তত একটি স্কুলে থাকে। চুরি হওয়ার পর থেকে তাও পাশবর্তী শিক্ষকের বাসায় থাকে।
২. দারোয়ান অনুপস্থিত থাকায় চুরি হয় এবং তার দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ
একাধিকবার প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তি অবধারিত বলে সে বেনামী চিঠি, পত্রিকায় ভূয়া খবর
নিয়ে প্রচার করছে। তাকে ইন্ধন যোগাচ্ছে একাধিক ফাঁকিবাজ ও দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ
না পাওয়া শিক্ষক, যারা ছাত্রদের নাম ব্যবহার করছে। সাবেক সহ. প্রধান শিক্ষক মি.
আবদুল গফুর, সহ. শিক্ষক মি. সুমেন, অফিস সহকারী মি. লিটন ও দারোয়ান নুরুচ্ছফার লেখা
ছাত্রদের নামে জমা দেয়া আমার নামে অভিযোগের উপর একটি তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে
একটি রিপোর্ট প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তার নিকট জমা দেন, যাতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রমাণিত হয়নি।
৩. আমার জ্ঞানতঃ আর্থিক কোন অনিয়মের সাথে আমি জড়িত নই এবং কাউকে এ
বিষয়ে সুযোগ ও দিই না বলেই মূলতঃ আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। সাবেক
সহ. প্রধান শিক্ষক মি. আবদুল গফুর ও দারোয়ান নুরুচ্ছফা মিলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান থাকার
সময় একটি ছাত্র ডায়েরী ৫০/- টাকা করে নিলেও আমি এসে সেটি ৩০ টাকা করায় ছাত্র-
শিক্ষক-অভিভাবকদের নিকট তাদের অনিয়ম দৃশ্যমান হয়। এতে তারা আমার উপর ক্ষিপ্ত
হয়ে উল্টো আমার বিরুদ্ধে উদ্ভট ও বেনামি চিঠি দিচ্ছে।
৪. আমাদের স্কুলে শিক্ষকদের মাঝে অত্যন্ত সুহার্দ্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান।
এখানে দায়িত্বে ফাঁকি দেয়ার কোন সুযোগ না থাকায় ২/১ জন ক্ষুব্ধ হতেই পারে। সুতরাং
শিক্ষকদের সাথে প্রধান শিক্ষকের সম্পর্কের কোন সমস্যার অভিযোগ ভিত্তিহীন।
৫. আমি কখনো শাস্তি মূলক বদলি হয়নি বরং এরকম অস্বস্থিকর পরিবেশ এরা
২০১৬ সালেও সৃষ্টি করেছিল বলে স্বেচ্ছায় আমি অন্যত্র বদলি হই।

পরিশেষে আমার বক্তব্য হল , আমার নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি সুন্দর ভাবে চলমান আছে এবং
থাকবে। আমার জ্ঞাতসারে কোন অন্যায় অনিয়ম করি না এবং করতেও দিই না। আমি সবার
আগে স্কুলে আসি এবং সবার পরে স্কুল ত্যাগ করি। নিয়মিত ক্লাস নিই এবং তদারকিও করি
যা আমার রুটিন ওয়ার্ক।

 

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply