বাংলাদেশ, সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এই ক্রান্তিকালেও এই চুরি!

 

 আজহার মাহমুদ

পৃথিবীটা আজ বিপন্ন। অসহায় মানুষ। অসুস্হ পুরো বিশ্ব। এসব সকলের জানা কথা। যে বিষয়ে লিখছি সেটাও সকলের জানা কথা। এই অসময়ে এদেশের কিছু আমলা এবং নেতাদের চুরির গল্প। সবকিছু সকলের জানা, তবু এসব চলছে একটানা। নেই কোনো গতিরোধ, আমলারা আজ হারিয়ে ফেলেছে মানবতাবোধ। করোনা ভাইরাসের ভয়াল মহামারিতে গোটা বিশ্ব আক্রন্ত। অদৃশ্য এই মরণঘাতি ভাইরাস মোকাবিলায় অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে বিশ্ববাসী। এই ক্রান্তিকালে জরুরিভিত্তিতে নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। আর এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দুর্নীতিবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাদের কারণে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বাধাগ্রস্থ ও সমালোচনার শিকার হচ্ছে। সেই সঙ্গে মূল সমস্যা সমাধানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের বিদ্যমান সমাজ কাঠামো। সব দেশেই করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ করে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর যোগান দিতে হচ্ছে জরুরিভিত্তিতে। ফলে সাধারণ নিয়ম থেকে বেরিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ঐসব মালামাল সরবরাহের সুযোগ ও অর্ডার দেওয়া হচ্ছে। এখানে সুযোগ নিচ্ছে দুর্নীতিবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ পকেটে ভরছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশ করেছে। ‘দুর্নীতির মহামারি…’ শিরোনামে এই প্রতিবেদনের মধ্যে আছে বাংলাদেশ, রোমানিয়া, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়ার কথা। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চাল কেলেঙ্কারি পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও লকডাউন চলছে। লকডাউনের ফলে কর্মহীন মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। লকডাউনে ঘরে আটকা পড়া মানুষজনের জন্য খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ সরকার। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষজনের জন্য ঐ খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হলেও ৬ লাখ পাউন্ড বা ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার (২ লাখ ৭২ হাজার কেজি) চালের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ৫০ জন আমলা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদের বিরুদ্ধে রয়েছে বেশি দামে পুনরায় চাল বিক্রির অভিযোগ। ফলে সরকার তাদেরকে বাইপাস করে ত্রাণ পরিকল্পনা ঢেলে সাজিয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি চাল বাজারে বিক্রির অভিযোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৫০ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রতিনিধিরাও রয়েছেন। এই চুরির ফলে যারা দিনমজুর রয়েছে তাদের কষ্টের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যাদের ত্রাণ প্রয়োজন তারা বঞ্চিত হচ্ছে। কালের কন্ঠের রির্পোটে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবে, রাজধানীতে কমপক্ষে ৪২ লাখ দিনমজুর এখন তীব্র সংকটে আছেন খাদ্যের পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘোষিত বরাদ্দ পাঁচ কোটির বেশি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ভাগ করলে মাথাপিছু মাত্র ১৫০ টাকা করে পড়ে, যা তাঁদের জীবনধারণের জন্য অপ্রতুল। উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ছুটি বা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশনার কারণে ৭২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন বা তাঁদের কাজ কমে গেছে। মাত্র ৮ শতাংশ মানুষের কাজ থাকলেও এখনো তাঁরা বেতন পাননি। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ দিনমজুরের আয় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ১৪ শতাংশ মানুষের ঘরে কোনো খাবারই নেই। ২৯ শতাংশের ঘরে আছে এক থেকে তিন দিনের খাবার। একদিকে ঘরে খাবার নাই, অন্যদিকে চুরি। এই যখন পরিস্থিতি তখন দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা নিয়েই সংকিত দেশের মানুষ। সবাই যে চুরি করছে তা কিন্তু নয়। আবার সবাই যে হৃদয় থেকে দান করছে তাও কিন্তু নয়। যাইহোক এ বিষয় নিয়ে অন্যএকদিন আলোচনা করবো। আজ এ বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে যাই। গত ৮ এপ্রিল বেশ কয়েকটি দৈনিকে পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখলাম, ত্রাণ বিতরণের কথা বলে ডেকে নিয়ে ছবি তোলার পর সেই ত্রাণ কেড়ে নিয়েছে হাটহাজারীর এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। হাটহাজারী উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৬ এপ্রিল দুপুরে হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ করার জন্য ২৬ পরিবারকে ডেকে নেন হাটহাজারীর ৩ নং মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আবছার। পরে ২৬ জনকে ত্রাণ দিয়ে ছবি তুলে তাদের ত্রাণ কেড়ে নেন চেয়ারম্যান ও তার লোকজন। এর প্রতিবাদ শুরু করলে তাদের মারধর করেছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। এই যখন একটি সভ্য স্বাধীন দেশের দৃশ্য তখন মানবতা নামক শব্দটিকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে তুমি কি বেঁচে আছো? আসলেই বড্ড জানতে ইচ্ছে করে মানবতা বেঁচে আছে? থাকার কথা। না থাকলে হয়তো পৃথিবীতে গুটি কয়েক মানুষ বেঁচে থাকতো। আর বাকি সকলেই হারিয়ে যেতো অমানুষদের পদতলে। তবে আফসোস হয় যাদের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন তারা দাঁড়ায় না। আবার অবাক হই যাদের দাঁড়ানোর জন্য কেউ বলে না তারা সেচ্ছায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং মানুষের উপকারে নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেয়। তবে কি পৃথিবীতে এই দুই প্রজাতির মানুষ থাকবেই? কিন্তু কেন? কেন এই পৃথিবী সুন্দর এবং সৎ মানুষের হতে পারে না। অমানুষদের হৃদয়ে কেন মনুষ্যত্ব সৃষ্টি হয় না। জানি এসব কেন এর উত্তর পাওয়া সহজ নয়। তবুও এই প্রশ্নগুলো প্রতিটি মানুষের কাছে ছুড়ে গেলাম। আর সেইসব চাল, তেল, ত্রাণ চোরদের জানিয়ে গেলাম, পরের জীবন তোমার জন্য হবে একটি দুস্বপ্ন। যেখানে সীমাহীন কষ্ট অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply