বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বনাঞ্চল কমে আবাসস্থল ও খাদ্য সংকটে হাতি, ফাসিয়াখালীকে হাতির অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবী লামায় একের পর এক হাতি প্রাণ হারাচ্ছে

মো.কামরুজ্জামান, লামা : ২০ নভেম্বর
বান্দরবানের লামায় এক সময় বন্য হাতির অভয়ারণ্য ছিলো বলা যায়। সম্প্রতি কয়েক দিনের ব্যবধানে দু’টি হাতির মৃত্যুতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু সাপারী পার্কের একেবারে কাছে লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন। প্রবীণ লোকদের কাছে শুনা গেছে, একদা ফাঁসিয়াখালীর বনে ৪০/৫০টি হাতি দল বেঁধে চলা-ফেরা করতো। হাতি আর মানুষে ছিলো সখ্যতা। ষাটের দশকে মানুষের সাথে হাতির বন্ধুত্বপুর্ণ অনেক গল্প রয়েছে। ৮০’র দশক থেকে ওই ইউনিয়নে হাতি বনাম মানুষের লড়াই শুরু হয়। বিগত ৪০ বছর ধরে এই লড়াই চলছে। বনাঞ্চল কমে যাওয়া, আবাসস্থল ও খাদ্য সংকটে পতিত হাতি বনাম মানুষের লড়াই বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
হাতির আক্রমনের বিষয়ে মানুষ আগের তলুনায় অনেক সচেতন হয়েছে। এতে প্রাণ হানীর সংখ্যা কমলেও প্রচুর পরিমান সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। মানুষ বনাম বন্য হাতির এই লড়াইয়ে হয়তো হাতিরা হেরে যাবে। সরকারের হাতি রক্ষণাবেক্ষন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধের ঘাটতি থেকে যাবে। হাতির জায়গা দখলে নিয়েছে মানুষ। ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে হাতির আদি ও নিরাপদ বাস ঠিক করতে হলে কয়েকটি রাবার-হর্টিকালচার লীজ প্লট বাতিল করতে হবে। অন্যথায় পরিবেশের চরম সংকট দেখা দিতে পারে। অপর দিকে চলতে থাকবে হাতি বনাম মানুষের নিষ্ঠুর লড়াই।
লামা উপজেলার বন্য হাতির অবাধ বিচরণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন। ১৯৬০ সাল থেকে সেখানে জন বসতি বেড়ে চলছে। ১৯৮০ সালে মানুষের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে ঝোপজঙ্গল না থাকায় হাতির দল আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। ৮০’র দশক থেকে রাবার, হর্টিকালচার লীজ প্লট দিয়ে সেখানে বন শিল্প’র নামে হাতির আবাসস্থল ধ্বংশ করা হয়েছে। এর ফলে খাদ্য ও আবাস সংকটে পতিত হাতির দল বিগত ৪০ বছর ধরে অস্তিত্বের লড়াই করে চলছে। এ লড়াইয়ে নিশানা হচ্ছে, পার্শ্ববর্তী ফাইতং, সরই, গজালিয়া ও আজিজনগর। এর মধ্যে সব চেয়ে বেশি ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের সবকটি ওয়ার্ডে বছরে কয়েকবার করে হাতি হামলা চালায়। এতে প্রাণহানীসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ফাঁসিয়াখালীর সব চেয়ে হাতি প্রবণ হচ্ছে ২ নং ওয়ার্ড হারগাজা, মইশখাইল্যা পাড়া ও ফকিরা খোলা।
ক্ষেতের ধান শেষ করে হাতির দল কৃষকের ধানের গোলার সন্ধানে ওই গ্রামে প্রায়ই বসত ঘরে হামলা চালানোর খবর পাওয়া যেত। জানাযায়, এক সময় ২০/৩০টি হাতি এক সাথে বিচরণ করতো। এর মধ্যে দু’একটি ছিল খুবই রাগি। দৃষ্টি সীমার সব কিছু মাটিতে মিশিয়ে দিত। বাকি হাতিরা দলবদ্ধ হয়ে ধান ক্ষেতে নয়তোবা অন্যকোন ফল-ফসলে নেমে তাদের ক্ষুধা মিটিয়ে ২/৩দিন বা পক্ষকাল অবস্থানের পর ফেরৎ যেত। সা¤প্রতিক বছরগুলোতে হাতির সংখ্যা কমে এসেছে। এর কারণ জানা যায়, হাতি বনাম কিছু স্বার্থপর বাগান উদ্যাক্তাদের লড়াইয়ে হাতির সংখ্যা কমে গেছে(!)। দু’বছর আগেও সানমার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যাক্তির বিরুদ্ধে হাতি নিধনের অভিযোগে আদালতে মামলা করেছে লামা বন বিভাগ।
অপরদিকে পার্বত্য লামা উপজেলায় বনাঞ্চল উজাড়, বন দখল করে কৃষি জমির বিস্তার, যত্রতত্র জনবসতি, ব্রিকফিল্ড স্থাপনের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বন্য হাতি। জানা যায়, দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা হাতির পরিমান ২৩০-২৪০টি। এর মধ্যে লামা-নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বনাঞ্চলে রয়েছে ৫০টির মতো হাতি। নানান কারণে হাতির অনুকুল পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে হাতির আক্রোমনে বিগত ৪ দশকে অনেকে প্রাণ হানীর ঘটনাও ঘটেছে। দাঁত পাচারকারী চক্রসহ প্রাণ ও বন রক্ষার নামে মানুষের হাতেও বহু হাতি মারা পড়েছে।
গত ৫ বছরে লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে শুধু ৫টি হাতি মারা যায়। ২০১৪ সালের আগষ্ট মাসে কুমারী চাককাটা গ্রামে ১টিকে গুলি করে হত্যা, এর কিছুদিন পর ২০১৫ সালে লামা মানিকপুরের সীমানায় মিজঝিরিতে মস্তক বিহীন একটি হাতির সন্ধান পান স্থানীয়রা। একই বছর ফাঁসিয়াখালী সানমার বাগান এলাকায় আরো ১টি হাতিকে মেরে মাটি চাপা দেয়া হয়। এর আগে ২০০২ সালে ফাঁসিয়াখালীর ইয়াংছা গ্রামে আরো একটি হাতি মারা পড়েছিল। এছাড়াও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়ও মাঝেমধ্যে হাতি মারা পড়ার সংবাদ পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে মার্চ মাসে বন্য হাতির ২টি মুল্যবান দাঁতসহ ৫ জনকে আটক করেছিল পুলিশ।
জানা যায়, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে হাতির বিচরণক্ষেত্র লীজ প্লটের আদলে মানুষের দখলে চলে যাওয়ায়; হাতি বনাম মানুষের লড়াই শুরু হয়। হাতির দল দিশেহারা হয়ে মানুষের বসতি ও সৃজিত বনবাগান গুড়িয়ে দেয়। খাদ্যাভাবে হাতিরদল ধানক্ষেত ও কৃষকের ঘোলায় আক্রোমন চালায়। এ বাস্তবতায় হাতি বনাম মানুষের লড়াইয়ে চরম সংকটে পতিত হয়েছে বন্য হাতি। যার কারণে বন ও পরিবেশগত বিরুপ প্রভাব পড়ছে। ২০১৬ সালে একটি হাতির দল লামা পৌরশহরে লোকালয়ে চলে আসে। ১নং ওয়ার্ড চাম্পাতলী গ্রামে বেশকিছু বাড়িঘর ভেঙ্গে দেয়ার পাশাপশি সাপ্তাব্যপি শহর অভ্যান্তরে বিচরণকালে আতংকিত ছিল হাজার মানুষ। সর্বশেষ চলতি মাসে লামায় একই গ্রামে পরপর দু’টি হাতির মৃত্যু! নড়েচড়ে বসেন কর্তৃপক্ষ। প্রকৃতির এই গুরুত্বপুর্ন প্রাণিটি রক্ষায় নতুন নতুন চিন্তা করছেন বন কর্তৃপক্ষ।
লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম কাউছার জানান, হাতি-মানুষে লড়াই না করে কিভাবে নিরাপদ থাকা যায়’ সে ব্যাপারে বন বিভাগ কাজ করবে। জুমে আগুন দেয়াসহ হাতির নিজস্ব বিচরণ ক্ষেত্রে মানুষ নানাভাবে দখল নেয়। হাতির দল সেগুলো ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে। তখনই কেবল মানুষের সাথে হাতির সংঘর্ষ হয়। এছাড়া হাতি মানুষকে সাধারণত আক্রমন করেন না। তিনি জানান, আলো বা শব্দে হাতির মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়। কখনই তারা মানুষের উপর হামলা করেন না বলে জানান এই বন কর্মকর্তা। হাতির প্রধানতম খাদ্য কলাগাছ। সা¤প্রতিক সময়ে বনে কলাগাছসহ ইত্যাদি হাতির খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, মানুষ হাতির জায়গা দখলের পাশাপাশি খাবার পর্যন্ত খেয়ে নিচ্ছে! যার ফলে মানুষের উপর হাতির আক্রোমন বেড়ে চলছে। সরকার হাতিদ্বারা ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপুরণ দিচ্ছেন। সূতরাং হাতি মারা যাবেনা। হাতি থেকে রক্ষা পাওয়ার কৌশল জেনে নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, সর্বশেষ মৃত হাতিটি কারেন্ট শর্টে মরেছে। এ ব্যাপারে আদালতে মামলা হয়েছে।
মানুষ বনাম হাতির এই লড়াই থেকে উত্তরণে; প্রকৃতির সহায়ক হাতি রক্ষায়, স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি, ফাঁসিয়াখালী ইউপির হাতি প্রবন এলাকায় কয়েকটি লীজ প্লট বাতিল, প্রস্তাবিত অভয়ারণ্য গড়ার দাবী তুলেছেন লামা উপজেলা প্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ সচেতন সমাজ ।
এ বিষয়ে বান্দরবান সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন এর সাধারণ সম্পাদক এম রুহুল আমিন বলেন, বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন যুগযুগ ধরে হাতির আবাসস্থল হিসেবেই ছিলো। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কারণে সরকার অত্র ইউনিয়নে বাঙ্গালী পূনর্বাসন, রাবার ও হর্টিকালচার বাগান সৃজনের জন্য কয়েক হাজার একর জায়গা বন্দোবস্তি প্রদান করেন। ফলে বন্য হাতির আবাস্থলে পাহাড় সমুহের বৃক্ষ নিধন হয়। ঝিরি সমুহে শুস্ক মৌসুমে পানির অভাব দেখা দেয়। সে সাথে কতিপয় ইটেরভাটার মালিক অবৈধভাবে পাহাড় সমুহ বৃক্ষ শুণ্য করায় হাতি তাদের আবাসস্থল ছেড়ে খাদ্য সংকটে পড়ে লোকালয়ে হামলা চালায়। তিনি বলেন, প্রতি বছর হাতিদ্বারা মানুষের জীবন ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হাতি আবাসস্থল ও পাহাড় সমুহ বৃক্ষ শুন্য করার জন্য দায়ি। তিনি অবিলম্বে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে কিছু লীজ প্লট বাতিল করে হাতির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে হাতি, বন্য পশুপাখী ও জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর আসু হস্তক্ষেপ কামণা করছেন।

আরো খবর

Leave a Reply

Close