বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আধুনিক বিজ্ঞানও রোজা রাখতে বলছে

ফজলুর রহমান

মানুষ কতদিন না খেয়ে বাঁচতে পারে? প্রশ্নটির উত্তর মূলত নির্ভর করে একজনের স্বাস্থ্য , পারিপার্শ্বিক অবস্থা , শরীরের পানির চাহিদা এবং অন্যান্য বিভিন্ন জিনিসের উপর, যেমন- একজনের স্বাস্থ্য, জেনেটিক ভ্যারিয়েশন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, ডিহাইড্রেশন হচ্ছে কিনা, উষ্ণ আবহাওয়া , আঘাত বা রক্তক্ষরণ ইত্যাদি।

তবে বেশিরভাগ গবেষকের মতে , একজন সুস্থ সবল স্বাভাবিক ওজনের মানুষ যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়ে তবে পানি ও খাদ্য ছাড়া বাঁচতে পারবে মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন । আর, শুধু পানি ছাড়া বাঁচতে পারবে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত। তারপরও প্রচলিত আছে: 3 minute without air, 3 days without water, 3 weeks without food, kills a man.

আর মানুষ যদি স্বেচ্ছায় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে তাহলে কত দিন পর্যন্ত এই সঞ্চিত শক্তি উক্ত মানুষের প্রয়োজন মিটাতে পারে?

জবাবে চিকিৎসা বিজ্ঞান বর্ণনা করছে : মানুষ যদি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে সম্পূর্ণরূপে নিজকে বিরত রাখে তা হলে তার শক্তি ভান্ডার থেকে তার চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের পরিপ্রেক্ষিতে কম পক্ষে একমাস এবং উর্ধ্বে তিন মাস শক্তি সরবরাহ করতে পারে।

আর ইসলাম মুসলমানদের দৈনিক ১২ থেকে ১৮ ঘন্টা পানাহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে, এই সামান্য সময় পানাহার থেকে বিরত থাকা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তাই তার শরীরে এই রোযার মাধ্যমে কোনো ধরনের ক্ষতি হয় না, বরং এই রোযার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য উপকার। এই ইবাদতটির মধ্যে শুধু নৈতিক উন্নতি ও গুণাবলী অর্জনের ক্ষমতাই নেই, বরং এগুলির সাথে রয়েছে মানব দেহের সুস্থতার সম্পর্ক।

মানবজীবনে খাদ্য ও পানীয় বস্ত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কেননা খাদ্য ও পানীয় শরীর গঠনের মূল বা প্রধান উপকরণ এবং বেঁচে থাকারও উপাদান।মানুষের খাদ্য তার শরীরে প্রধান দুইটি কাজ করে (১) শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি যোগান দেয় এবং তাপমাত্রা রক্ষা করে (২) কোষের কার্যক্রম রক্ষা করে এবং কোষ বিভাজনে সহায়তা করে।

খাদ্য শরীরের মাঝে বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে দেহকে শক্তি যোগান দিয়ে থাকে। দেহের মধ্যে সজীব উপাদানের যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে তাকে বলা হয় Metabolism।

এ বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে শক্তি সঞ্চয় হয় তা কোষের কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে এবং খাদ্য উপাদানগুলি সূক্ষ্ম পদক্ষেপ ও ধারাবাহিকভাবে উত্তাপের মাধ্যমে তৈরী হয় ভিটামিন, চর্বি ও সার্বিক শক্তি।

সেখানে রয়েছে অ্যামিনো এসিড, আলোক শক্তি ও বিদ্যুৎ শক্তি। এই সমস্ত শক্তির মাধ্যমে শরীর তার বিভিন্ন যন্ত্র পরিচালনা করে যেমন হৃদপিন্ড, ফুসফুস, রক্ত পরিচালনা, পাকস্থলী ইত্যাদি।

জীবন পরিচালনায় সার্বিক কাজকর্ম ও নড়াচড়ায় যথোপযোগী এই শক্তি ব্যবহার হয়ে থাকে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদিত শক্তি বিশেষ ভান্ডারে সঞ্চিত ও সংরক্ষিত থাকে। সেখান থেকে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার হয়ে থাকে এই সংরক্ষিত শক্তি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রোজায় কি এই সংরক্ষিত শক্তি ক্ষয় হয়? না শক্তির সুব্যবহার ঘটে?

সকলে জানি, ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত কল্যাণকর এবং পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। তাই এতে অন্যসব বিষয়ের মতো স্বাস্থ্যনীতিও রয়েছে। দেহকে অযথা কষ্ট দেয়া ইসলামের বিধিতে নেই। দেহের সংরক্ষিত শক্তির অযথা অপচয় ইসলামের নীতিতে নেই।

আর ইসলামের পাচঁটি স্তম্ভের মধ্যে কলেমা, নামাজ এরপরই রোজার স্থান। সকল সক্ষম ঈমানদারদের উপর আল্লাহ রমজানের এক মাস রোজা ফরজ করেছেন।

মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের ¯্রফে কষ্ট দেয়ার জন্যে ইহা ফরজ করেননি। তিনি এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, “ওয়া আনতা সুউমু খাইরুল লাকুম ইনকুনতুম তা’লামুন” অর্থাৎ তোমরা যদি রোজা রাখো তবে তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ, তোমরা যদি সেটা উপলব্ধি করতে পারো।” (সূরা বাকারাহ-১৮৪)।

বস্তুত, এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রোজা পালনের নানাবিধ কল্যাণের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ক্রমেই এসব কল্যাণ তুলে ধরছে। যা নানা রূপে প্রকাশ হতে দেখা যাচ্ছে।

প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসাবিদ ড. হেলমুট লুটজানার। তাঁর লেখা একটি বই ‘‘The Secret of Successful Fasting’’ । মানে ‘উপবাসের গোপন রহস্য’।

বইটিতে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের গঠন ও কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে নিরোগ, দীর্ঘজীবী ও কর্মক্ষম স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে বছরের কতিপয় দিন উপবাসের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ড. লুটজানারের মতে, ‘খাবারের উপাদান থেকে সারাবছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ (টকসিন), চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস।

উপবাসের ফলে শরীরের অভ্যন্তরে দহনের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে শরীরের ভিতর জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থসমূহ দগ্ধীভূত হয়ে যায়’।

বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলাম-কে আমরা বছর জুড়ে দুটি বিষয়ে বেশ পেতাম। একটি ধূমপান বিরোধী আন্দোলন। আরেকটি, রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বিষয়ে ।

টিভি’র পর্দায়, সভা-সেমিনারে অনেকবারই তিনি বলেছিলেন, “রোজা মানুষের দেহে কোনো ক্ষতি করে না। ইসলামের এমন কোনো বিধান নেই, যা মানবদেহের জন্যে ক্ষতিকর।

গ্যাস্ট্রিক ও আলসার-এর রোগীদের রোজা নিয়ে যে ভীতি আছে তা ঠিক নয়। কারণ রোজায় এসব রোগের কোনো ক্ষতি হয় না বরং উপকার হয়। রমজান মানুষকে সংযমী ও নিয়মবদ্ধভাবে গড়ে তুলে।”

আসলে ‘রমজান’ শব্দটি আরবির ‘রমজ’ ধাতু থেকে উৎপত্তি। এর অর্থ দহন করা, জ্বালিয়ে দেয়া ও পুড়িয়ে ফেলা। এভাবে ধ্বংস না হলে, ঐসব বিষাক্ত পদার্থ শরীরের রক্তচাপ, একজিমা, অন্ত্র ও পেটের পীড়া ইত্যাদি বিভিন্ন রোগব্যাধির জন্ম দেয়।

এছাড়াও উপবাস কিড্নী ও লিভারের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরে নতুন জীবনীশক্তি ও মনে সজীবতার অনুভূতি এনে দেয়।

এটা বিজ্ঞান দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে গেছে যে, রোজা একই সাথে দেহে রোগ প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। রোজাব্রত পালনের ফলে দেহে রোগ জীবাণুবর্ধক জীর্ণ অস্ত্রগুলো ধ্বংস হয়, ইউরিক এসিড বাঁধা প্রাপ্ত হয়।

দেহে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিভিন্ন প্রকার নার্ভ সংক্রান্ত রোগ বেড়ে যায়। রোজাদারের শরীরের পানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার ফলে চর্মরোগ বৃদ্ধি পায় না।

ডা: ডিউই একজন চিকিৎসক বলেছেন, “রোগজীর্ণ এবং রোগকিষ্ট মানুষটির পাকস্থলী হতে খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে ফেলো, দেখবে রুগ্ন মানুষটি উপবাস থাকছে না, সত্যিকাররূপে উপবাস থাকছে রোগটি।”

ডা. আলেক্স হেইগ নামের একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী বলেছেন, “রোজা হতে মানুষের মানসিক শক্তি ও এবং বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তিশক্তি পরিবর্ধিত হয়।

প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি, অতীন্দ্রিয় এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রানশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায়। ইহা খাদ্যে অরুচি ও অনিচ্ছা দূর করে।

রোজা শরীরের রক্তের প্রধান পরিশোধক। রক্তের পরিশোধন এবং বিশুদ্ধি সাধন দ্বারা দেহ প্রকৃতপক্ষে জীবনীশক্তি লাভ করে। যারা রুগ্ন তাদেরকেও আমি রোজা পালন করতে বলি।”

একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা তার রোগীদের তিন সপ্তাহের জন্য উপবাস পালনের বিধান দিতেন।

ডা. বেন কিম তাঁর Fasting for health প্রবন্ধে বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে উপবাসকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ (হাঁপানী), দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা, অন্ত্রনালীর প্রদাহ, ক্ষতিকর নয় এমন টিউমার ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে তিনি বলেন, উপবাসকালে শরীরের যেসব অংশে প্রদাহজনিত ঘা হয়েছে তা পূরণ (Repair) এবং সুগঠিত হতে পর্যন্ত সময় পেয়ে থাকে।

বিশেষতঃ খাদ্যনালী পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়াতে তার দেহে ক্ষয়ে যাওয়া টিস্যু পুনরায় তৈরি হতে পারে। সাধারণতঃ দেখা যায় টিস্যু তৈরি হতে না পারার কারণে অর্থপাচ্য আমিষ খাদ্যনালী শোষণ করে দুরারোগ্য (Auto, une disease) সব ব্যাধির সৃষ্টি করে। ডা. বেন কিম আরো বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন উপবাসে কিভাবে দেহের সবতন্ত্রে ( system) স্বাভাবিকতা রক্ষা করে।

অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেন, সর্বক্ষণ আহার সীমাতিরিক্ত ভোজন ও দূষিত খাদ্য খাওয়ায় শরীরে এক প্রকার বিষাক্ত উপকরণ ও উপাদানের সৃষ্টি হয় এবং জৈব বিষ (Toxin) জমা হয়।

যার কারণে দেহের নির্বাহী ও কর্মসম্পাদন অঙ্গ প্রতঙ্গগুলো বিষাক্ত উপকরণ ও জৈব বিষ দমনে অক্ষম হয়। ফলে তখন জটিল ও কঠিন রোগের জন্ম হয়। দেহের মধ্যকার এমন বিষাক্ত ও দূষিত উপাদানগুলো অতি দ্রুত নির্মূলকরণের নিমিত্তে পাকস্থলিকে মাঝে মধ্যে খালি করা একান্ত প্রয়োজন। রোজা এর সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

১৯৬০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. গোলাম মোয়াজ্জেম কর্তৃক মানব শরীরের উপর রোজার প্রভাব শীর্ষক গবেষণামূলক নিবন্ধ অনুযায়ী জানা যায়, রোজা দ্বারা শরীরের ওজন সামান্য হ্রাস পায় বটে, তবে তা শরীরের কোন ক্ষতি করে না বরং শরীরের মেদ কমাতে রোজা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অপেক্ষা অধিক কার্যকর।

তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আলোকে আরও জানা যায়, যারা মনের করেন রোজা রাখলে শূল বেদনার প্রলোপ বৃদ্ধি পায়, তাদের এ ধারণা সঠিক নয় বরং ভোজনের তা বৃদ্ধি পায়।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ হোসেনের নিবন্ধ থেকে জানা যায়, যারা নিয়মিত রোজা পালন করে সাধারণত তারা বাতরোগে, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত কম হয়।

ক্যামব্রিজের ফার্মাকোলজি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লেখার জিম রোজাদার ব্যক্তির খালি পেটের খাদ্য নালীর লালা স্টোমক সিক্রেশন সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করেন।

এতে তিনি বুঝতে পারলেন, রোজার মাধ্যমে ফুডপাটি কোলস সেপটিক সম্পূর্ণ আরো দেহের সুস্থতার বাহন। বিশেষত্ব পাকস্থলীর রোগের আরোগ্য গ্যারান্টি।

মহাত্ম গান্ধীর উপোস থাকার ঘটনা সর্বজনবিদিত। ফিরোজ রাজ লিখিত দাস্তানে গান্ধীতে লেখা রয়েছে। তিনি রোজা রাখা পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন মানুষ খাবার খেয়ে নিজের দেহকে ভারী করে ফেলে। এরকম ভারী অলস দেহ দুনিয়ার কোনো কাজে আসে না।

তাই তোমরা যদি তোমাদের দেহ কর্মঠ এবং সবল রাখতে চাও তবে দেহকে কম খাবার দাও। তোমরা উপস থাকো। সারা দিন জপ তপ করো আর সন্ধ্যায় বকরির দুধ দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করো।

মনস্তত্ত্ব বিশারদ সিগমন্ড নারায়েড রোজা এবং উপবাসের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘রোজার মাধ্যমে মস্তিষ্কের এবং মনের যাবতীয় রোগ ভালো হয়। মানুষ শারীরিকভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।

কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির দেহ ক্রমাগত বায়ুচাপ সহ্য করার যোগ্যতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি খিঁচুনি এবং মানসিক রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে। এমনকি কঠিন রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে এবং এর রোগের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাকে।’

রমজান মাসে নাক, কান, গলার অসুখও নাকি কম হয়। জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি টিম এ সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য এক রমাজন মাসে পাকিস্তান আসে।

এরপর উক্ত বিশেষজ্ঞদের সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশ হয়। তার মূল কথা ছিলো -‘‘মুসলমানরা নামাজের জন্য যে অজু করে সেই অজুর কারণে নাক, কান, গলার অসুখ কম হয়। খাদ্য কম খাওয়ার কারণে পাকস্থলী এবং লিভারের অসুখ কম হয়। রোজার কারণে তারা মস্তিষ্ক এবং হৃদরোগের আক্রান্ত কম হয়।’’

আমেরিকানরা মনে করেন, বছরের কিছু সময় মানুষের জন্য এমনভাবে অতিবাহিত করা উচিত যেন সে ডায়টিং করে স্বীয় হজম পদ্ধতিতে কিছু সময়ের জন্য অবসর রাখবে।

এভাবে তার মধ্যে বিদ্যমান আর্দ্রতা যা সময়সাপেক্ষে বিষে পরিণত হয়ে যায়, তা রোজা দ্বারা নি:শেষ হয়ে যায়। আর এই মারাত্মক আদ্রতা নি:শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক জটিল রোগ নি:শেষ হয়ে যায়।

এই রোজার মাধ্যমে যকৃত চার থেকে ছয় ঘন্টা পর্যন্ত বিশ্রাম পায়। আর এই যকৃতের কঠিনতম কাজের মধ্যে একটি হল হজম না হওয়া খাদ্যদ্রব্য ও হযম হওয়া খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। রোজার কারনে সেই যকৃত বলবর্ধক খাবারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজ থেকে মুক্ত থাকতে পারে।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে মোটাদাগে কিছু উপকারিতা:
১। ঢাল যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাকে সার্বিক আঘাত থেকে রক্ষা করে, রোজাও তেমনি রোজাদারকে শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে রক্ষা করে। আধুনিক বিজ্ঞান মতে, কলেস্টেরল মানব শরীরের একটি প্রয়োজনীয় লিপিড এটি দেহ কোষের পাতলা আবরণ গঠনের ও হজমের পিত্তরসে ব্যবহৃত হয়। এটি স্নায়ু কোষকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে।

এ ছাড়া মানব দেহের ইষ্ট্রজেন ও এন্ড্রোজেন নামক প্রজনন হরমোন তৈরীতে এর ভূমিকা প্রধান। এটি সকল প্রকার ষ্টেরয়েড সংশোধনের মূখ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এর পরিমাণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে উচ্চ রক্ত চাপ ও হৃদপিন্ড রোগ প্রভৃতি সৃষ্টি হয়ে মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, শরীরে কলেষ্টেরল মাত্রা সীমিত রাখতে রোযা ও রোযার মাসের পরিমিত খাদ্য গ্রহণ এবং অতিরিক্ত নামাজ যথেষ্ট সহায়ক।

২। রোজা মানুষকে ডায়াবেটিস, স্থুলকায়ত্ব ও বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। মানব দেহের অগ্নাশয়ে উৎপন্ন ইনসুলিন নামক হরমোন রক্তে মিশে রক্তের শর্করাকে জীবকোষে প্রবেশ ও কার্যকরী করতে সাহায্য করে। ইনসুলিনের অভাব হলে শরীরে শর্করা কাজে লাগতে পারে না। এর ফলে চর্বি ও প্রোটিন থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে।

ফলে ডায়বেটিস রোগী দুর্বল ও ক্লান্ত হয় এবং বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। বর্তমান বিজ্ঞান বলে যে, রমজানের একমাস রোযা পালন এবং বছরের অন্যান্য সময় অতিরিক্ত রোজা ডায়বেটিস রোগীর রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ফলপ্রসু। একমাস সিয়াম সাধনার কারণে অগ্নাশয় পূর্ণ বিশ্রাম পায় এবং দিনের বেলায় অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন নির্গত কম হয় বিধায় তা বিশেষ উপকারিতা লাভ করে। এছাড়া স্থুলকায়ত্ব যা মানব দেহের বিভিন্ন রোগের কারণ তা থেকে মুক্ত করতে পারে রমযানের রোজা ও বছরের অন্যান্য রোজা।

৩। মানুষের শরীরে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদানের জন্ম হয়, যার অধিকাংশ খাদ্য ও পরিবেশ দুষিত হওয়ার কারণে হয়ে থাকে। বিশেষ করে, বর্তমান যুগে যন্ত্র চালিত যানবাহনের কারণে পরিবেশ দূষিত হওয়ার ফলে মানুষ বিভিন্ন ধরণের নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হয়। তন্মধ্যে ক্যান্সার, ব্লাড প্রেসার, ফুসফুস, হার্ট ও ব্রেন টিউমার ইত্যাদি।

অনেকে স্বীকার করেছেন যে, রোজা শরীর ও মন উভয়ের জন্য অত্যন্ত উপকারী। Science calls For fasting বইয়ে বলা হয়েছে: সঠিকভাবে রোজা রাখলে মনে হবে যেন দেহ নব জন্ম লাভ করেছে After a fast properly taken, the body is literally born afresh)। চিকিৎসা বিজ্ঞানী ম্যাক ফ্যাডেন বলেছেন : সীয়াম সাধনা করলে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। (The longer one fasts the greater becomes his intellectual power and the clearer his intellectual vision ).

৪। প্রতিটি মানুষ রোজার মুখাপেক্ষী, যদি সে রোগী না হয়। কেননা খাদ্যের বিষাক্ত অংশ শরীরের মধ্যে জমা হতে থাকে এবং তাকে আস্তে আস্তে রোগী বানিয়ে দেয় এবং তার ওজন বাড়িয়ে দেয়, এর ফলে তার কাজের আগ্রহ উদ্দীপনা লোপ পায়।

অতঃপর উক্ত মানুষটি যদি রোযা থাকে তাহলে এই সমস্ত বিষাক্ত উপাদান থেকে মুক্ত হয়ে আবার সে শক্তি ও উদ্দীপনা অনুভব করে।

স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী এ কে এম আবদুর রহীম লিখেছেন : ‘‘সমস্ত শরীরে সারা বছর যে জৈব বিষ দেহের স্নায়ু ও অপারপর জীব কোষকে দুর্বল করে দেয় রোযা সমস্ত রক্ত প্রবাহকে পরিশোধন করে সমগ্র প্রবাহ প্রনালীকে নবরূপ দান করে। রোযা উর্ধ্ব রক্তচাপ জনিত ব্যাধিসমূহ দূর করতে সাহায্য করে।’’

৫। রমজান মাসে অন্যমাসের তুলনায় কম খাওয়া হয় এবং এই কম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে দীর্ঘ জীবন লাভের জন্যে খাওয়ার প্রয়োজন বেশি নয়। কম ও পরিমিত খাওয়াই দীর্ঘজীবন লাভের চাবিকাঠি। বছরে একমাস রোজা রাখার ফলে শরীরের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশ্রাম ঘটে।

এটা অনেকটা শিল্প-কারখানায় মেশিনকে সময়মত বিশ্রাম দেয়ার মত। এতে মেশিনের আয়ুষ্কাল বাড়ে। মানবদেহের যন্ত্রপাতিরও এভাবে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়।

৬। অনেক রোগী রয়েছে যারা অধিক ওজন সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে তারাও রোজা রাখার ক্ষেত্রে অনেক সাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। রমযান শুধু দৈহিক অসুস্থতাই নয়, যারা অনেকদিন ধরে মানসিক অবসন্নতা বা বিভিন্ন রকম দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত তাদের জন্যও চিকিৎসা হিসেবে কাজ করছে।

একটি জরিপে দেখা গেছে, রোজা রাখার কারণে যেসব রোগী তাদের কথাবার্তা এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম নিময়-শৃক্মখলার মাধ্যমে অতিবাহিত করেছে তাদের ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করা গেছে।

৭। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০% প্রোটিন সঠিকভাবে সংশ্লেষ হতে পারেনা ফলে এদেরকে ধ্বংস করা, শরীর থেকে বের করে দেওয়া কিংবা অন্য উপায়ে কাজে লাগানো জরুরি কেননা শরীরে এরা থাকলে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হবে। প্রশ্ন হল, কিভাবে ক্ষতিকারক প্রোটিনকে কাজে লাগানো যায়? আমাদের দেহ অটোফেগির মাধ্যমে এদের কাজে লাগায়।

অটোফেগি প্রক্রিয়াটি আমাদের শরীর কে কার্যকরী করে রাখে, দুর্বল অঙ্গাণু থেকে মুক্তি দেয় এবং ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে। শরীরে এ প্রক্রিয়া অনুপস্থিত থাকলে ক্যান্সার কিংবা নানাবিধ স্নায়ুবিক রোগ হতে পারে। এক কথায় বলা যায়, অটোফেগি রোগ প্রতিরোধ করে এবং আমাদের যৌবন ধরে রাখে। যখন শরীরে খাবারের সংকট তৈরি হয় তখন অটোফেগি প্রক্রিয়াটি চালু হয়। অর্থাৎ, অটোফেগি প্রক্রিয়াটিকে কার্যকর রাখতে হলে আমাদের নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে অথবা উপবাসে থাকতে হবে।

কৃচ্ছ্রসাধনা, ত্যাগ, সংযম এবং পরহিতৈষণার মহান বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে মাহে রমজান। আমরা জানি, বিভিন্ন মেশিন দীর্ঘ দিন কাজ করার ফলে তার মাঝে ময়লা জমার কারণে শক্তি কিছুটা কমে যায়। পরবর্তীতে, বিভিন্ন অসুবিধা দেখা দেয়। তাই সার্ভিসিং এর মাধ্যমে উক্ত ময়লাগুলো/ ভাইরাসগুরেঅ পরিস্কার করলেই পূর্বের শক্তি আবার ফিরে পায়।

আর যদি তা না করা হয়, তাহলে উক্ত মেশিনটিই এক সময় অকেজো হয়ে যায়। মানুষের শরীরটাও আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর হুকুমে পরিচালিত একটা অলৌকিক মেশিন। এই মেশিন যেহেতু আলাদা করে সার্ভিসিং করা যায় না। বরং যিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই অলৌকিক মেশিনটি সুস্থ রাখার জন্য রোজাপদ্ধতি অবলম্বনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর এই রোজার পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে সার্বিক সুস্থ থাকার নির্দেশ মানাতেই মুক্তি।

লেখক, ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার,চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

আরো খবর

Leave a Reply