মাহমুদুল হক আনসারী
রাজনীতি কী বা কেন? স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কারণ হলো মানুষ রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। এমনকি সারা বিশ্বেই রাজনীতিকের দায়ের কারণে রাজনীতির ওপর থেকেই আস্থা কমছে। মানুষের জন্য রাজনীতি হওয়ার কথা থাকলেও রাজনীতি এখন শুধু দলের জন্য এবং নিজের কার্য সিদ্ধির জন্য এবং ক্ষমতার জন্য করা হয়। এটাই প্রকৃত বাস্তবতা। রাজনীতি মানেই এখন ক্ষমতার পাহাড়। শুধু ক্ষমতার পাহাড়ই নয়, বরং ক্ষমতার যথেষ্ট অপব্যবহারও করা হয়। ঠিক এ কারণেই মানুষ বিরক্ত এবং রাজনীতির ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। সেই আস্থা ফেরানোর দায়িত্বও রাজনীতিবিদদের হাতেই। রাজনীতিকে কলুষিত করে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার বা থাকার জন্য রাজনীতি কোনো উপায় হতে পারে না। মানুষের কাছ থেকে সবচেয়ে চমৎকারভাবে সেবা করার উপায় হলো রাজনীতি করা এবং জনপ্রতিনিধি হওয়া।
কোনো দেশের মঙ্গলের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন হয় কল্যাণকর রাজনীতির। মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে রাজনীতি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সে কারণে রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা অবশ্যই ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন হবেন, এটাই জনগণ প্রত্যাশা করে। বুঝতে হবে রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে। এই দায়বদ্ধতা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের কাছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যখন জনগণই শেষ কথা, সেখানে রাজনীতি ইতিবাচক হতে বাধ্য। সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মপরিকল্পনা জনগণকেন্দ্রিক হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে তা হচ্ছে না। ব্যক্তিস্বার্থ ঢুকে বৃহৎ স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করছে। রাজনীতিতে হিংসা, বিদ্বেষ, নিজ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করাসহ নানা নেতিবাচক বিশেষণ ঢুকে গেছে। এর কারণ হলো রাজনীতিতে যারা প্রবেশ করছে, তারা অনেকে নিজেরাই মুক্ত মানসিকতার মানুষ নন। শুধু ক্ষমতা পাওয়াই যেখানে চূড়ান্ত কথা, সেখানে মানবসেবা মুখ্য ভূমিকা কীভাবে পালন করবে?
রাজনীতিকে আজ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে অনেকে। কিছু না করেও শুধু রাজনীতি করেই তার দিব্বি চলে যাচ্ছে। এমনকি সে বাড়ি-গাড়ির মালিকও বনে যাচ্ছেন। এতে জনগণের চক্ষু চড়কগাছ হলেও তার কিছু যায়-আসে না। কিন্তু রাজনীতি কি তাকে কিছু দেওয়ার কথা না, তার দৌলতে জনগণের কিছু হওয়ার কথা। রাজনীতিতে মেধাবীদের প্রবেশ নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। রাজনীতিতে মেধাবীরা আসছেন না। অথচ এই স্থানেই মেধাবীদের প্রবেশ সবচেয়ে বেশি জরুরি। মেধাবীরা তাদের মেধা ও মননশীলতা দিয়ে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনবেন- এমনটাই প্রত্যাশা। কিন্তু ঠিক কী কারণে রাজনীতিতে মেধাবীদের অংশগ্রহণ কম, তা আলোচনার বিষয়। এর পেছনে এক বা একাধিক কারণ জড়িত।
একজন মেধাবী তরুণ বা তরুণী যখন রাজনীতিতে আসবেন, তখন সে দেখবে তার কাজের ক্ষেত্রের আশপাশে কে বা কারা প্রভাব বিস্তার করে? সে নিশ্চয়ই এটিকে পেশা হিসেবে নিতে আসবে না। কিন্তু যখন দেখবে এর ভেতর যারা ঢুকে বসে আছে, তারা অনেকেই সমাজের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তখন কি আর আগ্রহ থাকবে। বিষয়টি এমন নয় যে, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা-মোকদ্দমা থাকলেই তাকে খারাপ বলা যায়। রাজনীতিতে হিংসাত্মকভাবে বহু মামলার শিকার হতে হয়। তবে সেসব জনগণের জন্য দাবি আদায় করতে গিয়ে।
এ রকম বহু রাজনীতিবিদের উদাহরণ আছে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি স্পষ্টতই তার দ্বারা অসামাজিক কার্যকলাপ হতে দেখা যায়, তাহলে আর ভরসা রাখবে কে। জনগণ যখন কোনো প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, তখন সেই এলাকার জনগণের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়া আবশ্যক।
তাদের কথা তাকে বলতেই হবে। তার জন্য উপযুক্ত স্থান মহান জাতীয় সংসদ। যদি কোনো অভিযোগ থাকে বা দাবি থাকে তা তুলে ধরার সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম হলো সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলা। সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করে নয় বরং একা হলেও তার নিজের কথা বলার জন্য সংসদে যাওয়া উচিত। তাতেই জাতির মঙ্গল। আমাদের দেশে রাজনীতিতে কাদা ছোড়াছুড়ি একটি পরিচিত ঘটনা। দেশের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে একপক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে। যখন দেশে কোনো সংকটময় পরিস্থিতির তৈরি হয়, তখনো এই দোষারূপের চিত্র চোখে পড়ে। অথচ জাতি ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলের সাহায্য প্রত্যাশা করে। কাঁদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি, দোষ চাপানোর রাজনীতি, অন্যকে সাহায্য না করার রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকতে হবে রাজনীতিবিদদের।
মানুষ তাকিয়ে থাকে রাজনীতির দিকে। রাজনীতি তাদের নিরাশ করবে কেন? রাজনীতি যদি স্বচ্ছ হয়, রাজনীতি যদি জবাবদিহিমূলক হয়, তাহলে রাজনীতিতে বিশ্বাস হারানোর কোনো কারণই দেখি না। কিন্তু অবস্থা এমন যে রাজনীতির ওপর সাধারণ জনগণের বিশ্বাস ফেরানোটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজনীতি হতে হবে আদর্শিক। যদি কেউ সেই আদর্শে আঘাত করে, তাহলে তাকে রাজনীতিতে ঠাঁই দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সোজা কথায় রাজনীতি কোনো সন্ত্রাসীর আশ্রয় হবে না। কোনো দলের সাইনবোর্ড লাগিয়ে সমাজের অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আশ্রয় না পায়।
রাজনীতির দোহাই দিয়ে যেন কোনো অপরাধী পার না পায়। কারণ আজকাল তো নেতা হওয়া তেমন কোনো কঠিন কাজ না। বড় কোনো নেতার সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিলেই তো নেতা হওয়া যায়! তারপর বিভিন্ন সভা-সমাবেশে একটু নেতার পাশে থাকলেই ব্যস! লেজুড়বৃত্তি করে দ্রুতই নেতা হওয়া যায়। তাই তো আজ কর্মীর থেকে নেতা বেশি! এ নিয়ে দেশে আলোচনাও কম হয়নি। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি পরিহার করতে হবে। আর দলে শুদ্ধীকরণ করাও আবশ্যক। কারণ দলের কর্মী বা নেতা হয়ে কে দলকে কিছু দিতে চায় আর কে শুধু সুসময়ের অতিথি, তা আলাদা করতে হবে।
রাজনীতি মানেই দায়বদ্ধতা। জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা। সেটি প্রমাণ করতে হবে। জনগণের নেতা না হলে রাজনীতি করার দরকার নেই। নেতাকে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে, কথা বলতে হবে এবং তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। গাড়ির কাচের ভেতর থেকে জনগণের সমস্যা বোঝা যায় না। সে জন্য তাদের পাশে থাকতে হবে।
জনগণের সেবা করার জন্য, জনগণের পাশে থাকার জন্য নেতা হওয়ার দরকার নেই। কর্মী হয়েও পাশে থাকা যায়। এসব হঠাৎ আসা নেতার চাপে প্রকৃত নেতারাই আজ আড়ালে থাকেন।
তাদের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত নেতারা মুখ লুকান। রাজনীতিতে সৎ এবং আদর্শিক মানুষের সমাগম ঘটাতে হবে। মেধাবীদের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। মেধাবীরা যেখানেই যায়, সেখানেই ইতিবাচক পরিবর্তন করে। ওরা যদি রাজনীতিতে আসে, তাহলে রাজনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যই হবে। কিন্তু শুদ্ধ এবং পরিমার্জিত রাজনীতিচর্চার অভাবে রাজনীতিতে মেধাবীদের প্রবেশ হাতে গোনা। দলের পদপদবি বাগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা, পোস্টার-ব্যানারে নিজের ছবি টানিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে সবাই। অথচ এরা বুঝতে চায় না রাস্তায় পোস্টার টানিয়ে মানুষের মনে স্থান পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় চোখে।
রাজনীতির উদ্দেশ্যই হলো জনকল্যাণ। তাই সেটা করলে আর কষ্ট করে, টাকাপয়সা খরচ করে পোস্টার-ব্যানারে বড় বড় ছবি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। মানুষ রাজনীতিবিদদের দিকেই ভরসা খোঁজে আর রাজনীতিবিদরা আজ খোঁজে ক্ষমতা। ক্ষমতার দ্ব›েদ্ব কত হানাহানি ঘটে, তার ইয়ত্তা নেই। এ দেশেই জন্মগ্রহণ করেছেন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন, এমন অনেক নেতা। পৃথিবী জুড়ে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। মানুষের পাশে থেকে তাদের সেবা করেছেন আজীবন। তারা কেউই বিলাসবহুল জীবনযাপন করেননি। তারা জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেছেন। বিনিময়ে পেয়েছেন জনগণের ভালোবাসা। এর চেয়েও বেশি সম্পদ আর কী হতে পারে। শুদ্ধ রাজনীতি কি তা তাদের জীবনাচরণ অনুসরণ করলেই বোঝা যায়। আজকের রাজনীতিবিদদের উচিত সেই শুদ্ধ রাজনীতিবিদদের অনুসরণ করা। রাজনীতিতে শুদ্ধতা আনার দায়িত্ব যে তাদের ওপরই বর্তায়। প্রথমে নিজেদের শুদ্ধীকরণ করতে হবে, জনগণের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে হবে এবং রাজনীতিটা মানুষের জন্যই করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, মানুষই সব ক্ষমতার উৎস। দুর্নীতি করার জন্য রাজনীতি না। রাজনীতি হলো মানুষের ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা পাওয়ার সর্বোত্তম উপায়। সেটা পেতেই চেষ্টা করতে হবে। মানুষ যেন স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে। তাদের ভালোবাসে। আমাদের দেশে সেই রাজনীতি চাই।
সেই রাজনীতি কোথায় এখন? রাজনৈতিক দলের কর্মসূচী জনতার জন্য নাকি ক্ষমতার জন্য? রাজনীতি ক্ষমতামুখী নাকি কল্যাণমুখী? এইসব প্রশ্ন দিনরাত জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ আজকের রাজনীতিতে জনগন অনেকাংশে অস্বস্তি বোধ করছে। রাজনৈতিক দলের বক্তব্য, আচার-আচরণ মোটেও জনগনের নিকট স্বস্তি বয়ে আনছে না। কারণ রাজনীতির কল্যানকর যেসকল উদ্দেশ্য কর্মসূচী ছিল, বর্তমান সময়ে তা অনুপস্থিত। রাজনীতিতে দলীয়করণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্পদের লুটপাট, জাতীয় অর্থপাচারসহ নানমুখী রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জনগন এখন রাজনীতির উপর থেকে আস্থা হারাচ্ছে।
রাজনীতির উপর থেকে আস্থা নষ্ট হওয়া এটা দেশ এবং জাতীর জন্য মহাবিপদ সংকেত। একটি দেশ এবং জাতি নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। রাজনীতির মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্রের বহুমাত্রিক মতের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি পরিচ্ছন্ন মার্জিত শালীনতাপূর্ণ রাজনীতি প্রচলিত না থাকে তাহলে গণতন্ত্র এবং জাতির জন্য মহা বিপদ সংকেত অপেক্ষা করছে। আমরা লক্ষ করছি সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ও বিরোধী দল তাদের কথাবার্তার মধ্যে রাজনীতির শালীনতা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অশালীনভাবে একদলের নেতা অপর দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতি বক্তব্য দিয়ে আঘাত করছে। শ্রদ্ধাবোধ, শালীনতাবোধ তাদের বক্তব্যে প্রায়ই অনুপস্থিত। ঠাট্টা, হাসি, বিদ্রোপের জন্ম দিচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের সূত্রে। এইসব আচরণ কোনো মতেই পরিচ্ছন্ন রাজনীতির পথেয় হতে পারে না।
দলের কর্মসূচী, রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য আন্দোলন এইসব বিষয় জনগন এখন পরিষ্কার ভাবে বুঝতে শিখেছে। রাজনীতিতে দলকর্মী, নেতা নেত্রিদের বক্তব্য, ভাষা, সম্বোদন যথাযথ ভাবে শালীনতার মধ্যে অনুশীলন থাকা চাই। অন্যথায় প্রচলিত এই রাজনীতি জনগন ঘৃণাভরে নিক্ষেপ করবে। তখন যে গণতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি হবে, জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা সবার জন্য কঠিন হবে।
সর্বশেষ সংবাদ
- আস্থাহীনতার রাজনীতি, কী ভাবছে জনগন ?
- চাকরি পেতে নেতার ফোন কেন, প্রশ্ন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর
- জাতিসংঘ সফর শেষে নিউইয়র্ক থেকে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী
- ইলিশের চড়া দামে হতাশ ক্রেতারা, সাধ থাকলেও সাধ্য নেই
- পটিয়ায় ৭০ বছরের বৃদ্ধা শিক্ষিকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জালিয়াতি ও প্রাণনাশের হুমকি
- নির্মাণসামগ্রীর দাম চড়া, টানাপোড়েনে স্থবির দেশের মেগা উন্নয়ন কাজ
- পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ
- নির্মাণসামগ্রীর দাম চড়া: সরকারি দপ্তর ও আমদানিকারকদের টানাপোড়েনে স্থবির দেশজুড়ে উন্নয়নকাজ
- ইদ্রিস মিয়া চট্টগ্রাম ওয়াসার বোর্ড চেয়ারম্যান হলেন
- ঠান্ডা মিয়ার গরম কথা ( ৩৬৪ ) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমীপে


