বিশেষ প্রতিবেদক
রড, সিমেন্ট, বিটুমিন, বালু ও পাথরের বাজারে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় দেশের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন এখন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বেড়েছে শ্রমিকের বেতনও।ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়েছে, ব্যাংক সিকুরিটি আটকে গেছে বিভিন্ন দপ্তরে, ভুমি জটিলতায় কাজে হাত দিতে পারছেন না ঠিকাদারগণ।ফলে ঋণে -সুদে -মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্ধ শত বছরের সুনামধারী ঠিকাগারগণ মহা বিপাকে পড়েছে এ সময়ে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রধান দপ্তরসমূহ, বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতা ও বৈরী পরিস্থিতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে মেগা প্রকল্পগুলোতেও। পুরোনো দরপত্রের রেট শিডিউল আর বর্তমান বাজারমূল্যের আকাশ পাতাল ব্যবধানের কারণে শত শত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে এখন ।
১. যেসব সরকারি দপ্তর ও অবকাঠামো প্রকল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত:
-
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং সেতু কর্তৃপক্ষ: জাতীয় মহাসড়ক প্রসারীকরণের কাজ, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা (সাসেক-২) প্রকল্পের অধীনে এলেঙ্গা-হাতিয়াকুমরুল-রংপুর চার লেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের কাজ মারাত্মকভাবে ধীরগতির হয়ে পড়েছে।সওজ ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ,নান্দাইল এসব এলাকার সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে গেছে উপরোক্ত কারণে।
-
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি): গ্রামীণ অবকাঠামো, উপজেলা সংযোগ সড়ক ও স্থানীয় ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের শত শত প্রকল্প স্থবির হয়ে আছে।
-
গণপূর্ত অধিদপ্তর (PWD): সরকারি আবাসন, আদালত ভবন ও প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ কাজ ঠিকাদাররা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
-
বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সিটি করপোরেশনসমূহ: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ (ডিএসসিসি) বিভিন্ন নগর সংস্থা ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্র্যাকিং ও স্টেশন উন্নয়ন কাজের গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
২. নির্মাণসামগ্রী উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সংস্থাসমূহ:
-
রড ও ইস্পাত শিল্প (BSRM, KSRM, AKS, GPH ইত্যাকার মিল মালিকরা): বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSMA)-এর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ মেল্টিং বা কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির বাড়তি খরচের কারণেই রডের উৎপাদন খরচ টনে ৯০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
-
সিমেন্ট শিল্প (বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন – BCMA): ক্লিংকারসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বাড়তি ব্যয় ও ডলারের রেটের কারণে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম বেড়ে ৪৮০ টাকায় ঠেকেছে।
-
বালু ও পাথর সরবরাহকারী সিন্ডিকেট: দেশের অভ্যন্তরীণ ইজারা পয়েন্ট, জিরো পয়েন্ট এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত পাথরের ক্ষেত্রে এলসি জটিলতা ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পাথরের দাম ঘনফুট প্রতি ২৪০ টাকা ও বালুর দাম ৩০ টাকায় পৌঁছেছে।
৩. নীতি-নির্ধারক ও বাজার তদারকি সংস্থা:
-
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS): ঠিকাদার সমিতির অভিযোগ, সরকারি রেট শিডিউল হালনাগাদে বিবিএস-এর মূল্যস্ফীতি ও বাজারদরের তথ্য বাস্তবে মিলছে না। বাজারে দাম ৪০% বাড়লেও সরকারি নথিতে তা কম দেখানো হচ্ছে, ফলে মূল্য সমন্বয়ে (Price Adjustment) জটিলতা কাটছে না।
-
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়: ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামো কমানোর বিষয়ে রড ও সিমেন্ট মালিকদের প্রস্তাব থাকলেও রাজস্ব বোর্ডের নীতিগত বিলম্বের কারণে সুফল মিলছে না।
৪. ঠিকাদারি সংগঠন ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য:
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অ্যাসোসিয়েশন এবং সড়ক ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার কামাল ফিরোজের মতে, “২০১৯ সালের রেট শিডিউলে ২০২২ বা পরবর্তী সময়ে কাজ করা অসম্ভব। একটি প্রকল্পে আমরা ২০% মুনাফা ধরে কাজ নিই, কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর দাম যদি ৪০% বাড়ে, তবে ব্যাংক গ্যারান্টি জব্দ হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও ঠিকাদাররা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।”
ইতোমধ্যে ইনফ্রাটেক কনস্ট্রাকশন কোম্পানিসহ বেশ কিছু শীর্ষ উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে কাজ বন্ধ বা গতি কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে।
সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ:
১. পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (IMED): দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ও ‘প্রাইজ অ্যাডজাস্টমেন্ট’ ক্লজ হালনাগাদ করা।
২. এনবিআর (NBR): নির্মাণসামগ্রীর ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক, উৎসে কর ও ভ্যাট সাময়িকভাবে শিথিল করা।
৩. বাংলাদেশ ব্যাংক: আমদানিকারকদের জন্য কাঁচামাল আমদানির এলসি (LC) চেইন সহজ করা এবং ঠিকাদারদের আর্থিক প্রণোদনা প্রদান।



