তিনি সোনার বাংলার কারিগর

  প্রিন্ট
(সর্বশেষ আপডেট: আগস্ট ১৩, ২০১৮)

আজহার মাহমুদ

বাংলার মাটি ও মানুষের হৃদয়ে যে নামটি চিরস্মরণীয় ও উজ্জল নক্ষত্রের মত চিরসম্ভার হয়ে আছেন তিনি হল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।তিনি বাঙ্গালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা।বাঙ্গালি জাতি যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নয়া উপনিবেশে পরিণত হলো ঠিক তখনই তিনি শোনালেন মুক্তির অমর বাণী।যুক্তি নির্ভর ভাষণ আর আপসহীন দৃঢ় মনোভাবের কারণে তিনি কোটি কোটি বাঙ্গালির মনের ঘরে স্থান করে নিয়ে হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু।স্বাধীনতার পর তাকে ‘জাতির জনক’ মর্যাদায় অভিষেক করা হয়।আবহমানকাল ধরে বাঙ্গালির স্বপ্নে লালিত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্টা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চির অম্লান হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতাসহ প্রতিটি বাঙ্গালির ‍হৃদয়ে। ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু।তার পিতার নাম শেখ লুৎফুর রহমান।মাতার নাম সায়েরা খাতুন।বঙ্গবন্ধুর ডাক নাম ছিল খোকা।দুই ভাই, চার বোনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তৃতীয় সন্তান।উল্লেখ্য ১৪৬৩ খ্রিষ্টাব্দে দরবেশ শেখ আব্দুল আউয়াল ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজে এ দেশে আসেন এবং টুঙ্গিপাড়ায় বসবাস গড়ে তোলেন।তিনিই হলেন বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষ।আতএব নি:সন্দেহে উনার বংশ উত্তম ব্যাক্তিবর্গের অন্যতম।বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা জীবন থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু পেয়েছে।১৯২৭ সালে বঙ্গবন্ধুর বয়স যখন ৭ বছর তখন তাকে স্থানীয় নিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।৯ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯২৯ সালে তাকে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি করা হয়।পরে আবার তিনি পিতার কর্মস্থল গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন।১৯৩৪ সালে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে প্রায় ৪ বছর তার পড়ালেখা বন্ধ থাকে।অত:পর ১৯৩৭ সালে আবারো তিনি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন।ওই স্কুল থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন।এরপরে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলে বসবাস করেন।১৯৪৪ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন।১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।বঙ্গবন্ধু যখন মিশনারি স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন তখন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী স্কুল পরিদর্শন করতে মিশনারি স্কুলে আসেন।তখন ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু স্কুলের দাবি দাওয়ার কথা তুলে ধরলেন।তার জোরালো এবং চমৎকার বক্তব্যের হয়ে তারা স্কুলের কাজে সাহায্য করেছেন।যা বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উত্তম নমুনা।বিশ্ব রাজনীতিতে অবিসংবাদিত কিংবদন্তি তথা বাংলা ও বাঙ্গাীর জাতির অমর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক জীবন শুরু করার আগেই গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের দুঃখ দেখে নিজের ভেতরে এক প্রকার কষ্ট অনুভব করতেন।বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ছাত্রজীবনেই।১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন ও নেতৃত্বদানকে কেন্দ্র করে বৈরী অবস্থার সৃষ্টি হলে আইন বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্ত ঘটে।১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন আইন পরিষদে ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে’ বলে ঘোষণা দিরৈ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবে ওই ঘোষণার প্রতিবাদ জানান।২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলে ভাষার প্রশ্নে এক বৈঠক অনুষ্টিত হলে সেখানে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবক্রমে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে উঠে।১১ মার্চ হরতাল চলাকালে সচিবালয়ের সামনে থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন।১৯৪৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ এর যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।এরপর তিনি কারাগারে বন্দি হন।১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারী খাজা নাজিমউদ্দিন আবারো উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন।এ ঘোষণার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু জেলখানায় বন্দি অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারীকে রাজবন্দি মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি দিবস হিসেবে পালন করার জন্য বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে আহবান জানান।১৬ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু এ দবিতে জেলখানায অনশন করেন।২১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ছাত্রজনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের করলে ওই মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়।ফলে সালাম, জব্বার, রফিকসহ অনেকেই শহিদ হয়েছেণ।বঙ্গবন্ধু জেলে বসে টানা ১৩ দিন অনশন অব্যাহত রাখেন।তারপরে ২৬ ফেব্রুয়ারী জেলখানা থেকে মুক্তি লাভ করেন।১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী লাহোর সম্মেলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালি জাতির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা পেশ করেন।তবে এ দাবি পেশকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু ১২ বার গ্রেপ্তার হন।১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারী পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জন সেনা সিএসপি কর্মকর্তার বিরোদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয়।১৯৬১ সালের ৫ জানুয়ারী ৬ দফাসহ ১১দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।এ পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে বিনা শর্তে মুক্তি এবং আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।এক পর্যায়ে এই আন্দোলন গণঅভূন্থানে রূপ নিলে সরকার ২২শে ফেব্রুয়ারী মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুকে বিনা শর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।পরের দিন ২৩শে ফেব্রুয়ারী ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন।১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন বাংলাদেশ।১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় জাতীয় পরিষদের ১৬২টি এলাকাভিত্তিক আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়লাভ করে।এছাড়া সংরক্ষিত ৭টি মহিলা আসনসহ আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত সর্বমোট আসন সংখ্যা ১৬৭।আবার প্রাদেশিক ৩০০টি আসনের মধ্যে সর্বমোট ২৯৮টিতে জয়লাভ করেন।১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেলেও পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে হস্তান্তর না করে চক্রান্তে মেতে উঠৈ।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জনসভায় বঙ্গবন্ধু জনতার সমুদ্রে দাড়িয়ে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণের মাধ্যমে বাঙ্গালি জাতি পেয়ে যায় বাংলাদেশ স্বাধীন করার দিকনির্দেশনা বার্তা।২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র বাঙ্গালিদের উপর অতর্কিত এবং নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়।এমতাবস্তায় রাত ১২টা ৩০ মিনিটে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকলেও তার নির্দেশেই মুক্তিযুদ্ধ চলে।১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়।বঙ্গবন্ধু ছিলেন অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত এবং ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়।১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু।দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।অর্থনৈতিক ঝুকিঁর মুখে ১,৬৫,০০০ শিক্ষকের চাকুরী সরকারিকরণ করেন এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ রেশন ব্যবস্থা চালু করেন।পঞ্চম শ্রেণী পর্য্ন্ত বিনামূল্যে বই খাতা, পোশাক প্রদানের ব্যবস্থা করেন।তিনি ৪৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করেন, ১১ হাজার নতুন বিদ্যালয় স্থাপন করেন।২৫ বিঘা জমির খাজনা মওকুফ এবং ১০০ বিঘা জমির সিলিং ধার্য্ করা হয়।হকারদের পূর্ণবাস দেওয়ার জন্য হকার মার্কেট স্থাপন করেন।তিনি ২৫০টি ব্রিজ, কালভার্ট, কলকারখানা, রাস্তাঘাট মেরামত এবং পুন:নির্মাণ করেন।শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্টা করেন।কাজি নজরুল ইসলামকে দেশে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।বায়তুল মোকররম মসজিদ সম্প্রসারণ করেন।মাদ্রাসা এতিমখানা অনেককিছু দিয়েছেন এই বাংলার মানুষকে।বঙ্গবন্ধু অতি অল্প সময়ে পরিপূর্ণ একটি উত্তম সংবিধান উপহার দেওয়া ছাড়া আরো যা করেছেন তা ইতিহাসে বিরল।১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলায় বক্তব্য রাখেন।১৫ই আগস্টের সেই কালো রাত।পবিত্র শুক্রুবার।মসজিদে মসজিদে ফজরের আজানের ধ্বনি হচ্ছে। দেশের এবং আন্তর্জাতিক চক্রের চক্রান্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিপথগামী অংশ বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নাম্বার রোড়ের ঐতিহাসিক বাড়িতে এক নির্মম হামলা চালিয়ে ইতিহাসের জঘন্য কাজটি করে। সেদিন জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ব্যতীত নিকট আত্বীয় স্বজন সহ সপরিবারে শহিদ হন তিনি।

পরিশেষে এটাই বলতে চাই, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের হৃদয়ে ছিলো আছে এবং আজীবন থাকবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিদেহী আত্বার স্মৃতির প্রতি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে:-

           সোনার বাংলা গড়বো পিতা

           তোমায় কথা দিলাম,

           চেতনা থেকে বিচ্যুত হবোনা

           কঠিন শপথ নিলাম।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password