বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দেশীয় ভাবধারায় পুষ্ট সুস্থ নির্মল সংস্কৃতিচর্চা প্রসারিত করে আদর্শিকভাবে উজ্জীবিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে

লালদীঘি মাঠে হিজরিবর্ষ ১৪৪১ বরণ অনুষ্ঠান 

বিশ্বের নিপীড়িত মানবতার পাশে দাঁড়ানো, মুক্ত নগ্ন আকাশ সংস্কৃতি, পর্নোগ্রাফি ও সাইবার ক্রাইম ঠেকাতে জাতীয়ভাবে কঠোর আইন প্রণয়ন করা এবং দেশীয় ভাবধারায় পুষ্ট সুস্থ নির্মল সংস্কৃতিচর্চা প্রসারিত করে আদর্শিকভাবে উজ্জীবিত প্রজন্ম গড়ার ডাক দিয়ে হিজরি নববর্ষ ১৪৪১ কে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বরণ করা হয়েছে। আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ইং রবিবার ১ মহররম ১৪৪১ হিজরি চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদ দশমবারের মতো হিজরি নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। হামদ, না’ত, গজল, কাউয়ালি, মরমী, মাইজভা-ারীসহ বিভিন্ন সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে হিজরি নতুন বছরকে বরণ করে নেন বিভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীগণ। গান ও সঙ্গীত পরিবেশনের ফাঁকে চলে আলোচনা সভা। এতে আলোচকরা বলেছেন, দেশে দেশে আজ নিরীহ মানুষের ওপর বর্বরতা ও জঘন্য নির্মমতা চলছে। দুর্বলের ওপর সবলের নিপীড়ন-নিষ্পেষণে দেশে দেশে আজ মানবতার করুণ আর্তনাদ-আহাজারি শোনা যায়। অথচ জাতিসংঘসহ মোড়ল দেশগুলো নিরীহ মানুষকে জুলুমযজ্ঞ ও নিপীড়ন থেকে বাঁচাতে কোনো পদক্ষেই নিচ্ছে না। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে দেশছাড়া করেছে বর্বর দেশ মিয়ানমার। তা সত্ত্বেও বিশ্ব বিবেক আজ নির্লিপ্ত-নির্বিকার। বক্তারা বলেন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে ভারত কাশ্মীরে নতুন করে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবাননে চলছে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ-সংঘাত-সহিংসতা। হিজরি নতুন বছরে দেশে দেশে চলমান নিপীড়ন ও মানুষের ওপর বর্বরতার রাশ থামাতে বিশ্ব নেতৃত্ব ও শক্তিধর দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বে শান্তি ও জননিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ জাতিসংঘ থেকে মুসলিম দেশগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলো নিয়ে বৈশ্বিক নতুন প্লাটফরম প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান বক্তারা। মাদকপণ্যে দেশ ভাসছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেছেন, সর্বগ্রাসী মাদক যুব সমাজকে বিপথে টানছে। যুব সমাজের বিপথগামিতা রুখতে পর্নোগ্রাফি ও মুক্ত নগ্ন আকাশ সংস্কৃতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। মাদকের সহজ হাতছানি থেকে সম্ভাবনাময়ী তারুণ্যকে বাঁচাতে সরকারকে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার ওপর বক্তারা গুরুত্বারোপ করেন। হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদের চেয়ারম্যান পীরজাদা মাওলানা মুহাম্মদ গোলামুর রহমান আশরফ শাহ্ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সূফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। উদ্বোধক ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষ। মুখ্য আলোচক ছিলেন গবেষক-সংগঠক অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার। বিশেষ অতিথি ছিলেন আঞ্জুমান রিচার্স সেন্টারের মহা পরিচালক আল্লামা এম এ মান্নান, ড. অধ্যাপক নূ.ক.ম আকবর হোসেন, রাজনীতিবিদ ও গবেষক স.উ.ম আব্দুস সামাদ, আল্লামা আবুল কাশেম নূরী, ড. মুহাম্মদ মাসুম চৌধুরী, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ তৈয়্যব আলী, মাওলানা রেজাউল করিম তালুকদার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদের মহাসচিব মুহাম্মদ এনামুল হক ছিদ্দিকী। প্রধান অতিথি আলহাজ্ব সূফী মিজানুর রহমান বলেন, হিজরি সন ও তারিখ মেনে আমরা প্রাত্যহিক জীবন-যাপন করি এবং ইসলামী আচার আনুষ্ঠানিকতা পালন করি। মুসলমানদের জীবনধারার সঙ্গে মিশে আছে হিজরি সন। চট্টগ্রাম থেকে বড় আয়োজনে সূচিত হওয়া হিজরি নববর্ষ পালনের সংস্কৃতি একদিন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে আমি আশা করি। তিনি বলেন, যুব সমাজ আজ অবক্ষয়ে ধুঁকছে। তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির অপব্যবহার তাদেরকে অবক্ষয়গ্রস্ত করছে, তাই দেশের সম্ভাবনাময়ী এই যুব সমাজকে অবক্ষয়-অনৈতিকতার অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আলোর পথে নিয়ে আসতে হবে। উদ্বোধক এম জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, মরহরম মাস শোক ও বেদনার মাস। সৃষ্টি জগতের সূচনা হয়েছে এই মাসে। এই বসুন্ধরার বিলয়ও ঘটবে এই মাসে।

আশুরা দিবসে আহলে বায়তে রাসূলের (দ.) সদস্যদের ওপর ইয়াজিদি নির্মমতার কথা জেনে আমরা শোকাতুর হয়ে পড়ি। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে কারবালার চেতনায় আমাদের বলীয়ান হতে হবে। বিশেষ অতিথি আল্লামা এম এ মান্নান বলেন, সংস্কৃতি চর্চার নামে আজ অপসংস্কৃতির চর্চাই বেশি হচ্ছে। সুস্থ নির্মল জাতীয় চেতনামন্ডিত ইসলামী সংস্কৃতি বিকশিত করে যুব সমাজকে আদর্শিক পথে ধরে রাখতে হবে। বিশেষ অতিথি বলেন, স.উ.ম আব্দুস সামাদ বলেন, চট্টগ্রাম দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। চট্টগ্রাম থেকে দশ বছর আগে সূচিত হিজরি নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান একদিন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। মুখ্য আলোচক মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার বলেন, পচাঁশি ভাগ মুসলমানের এই দেশে হিজরি নববর্ষ পালনে অনেকের উদসীনতা দেখে আমরা বিমর্ষ হয়ে পড়ি। খ্রিষ্টিয় নববর্ষ পালনের নামে চলা থার্টি ফার্স্ট নাইট সংস্কৃতি আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভিনদেশি এ মুক্ত নগ্ন আকাশ সংস্কৃতি রুখতে না পারলে বর্তমান প্রজন্মকে বাঁচানো যাবে না। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চাকে প্রসারিত করে যুব সমাজের মাঝে নৈতিকতার বীজ বপন করার আহ্বান জানান তিনি। স্বাগত বক্তব্যে মুহাম্মদ এনামুল হক ছিদ্দিকী হিজরি নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান আয়োজনে সম্পৃক্ত ও সহযোগিতাকারী সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম যে সব সময় অগ্রগামী হিজরি নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান তারই জানান দিচ্ছে। সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা গোলামুর রহমান আশরফ শাহ্ বলেন, আসুন নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চা বেগবান করে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন প্রতিরোধ করি। তিনি সংস্কৃতিকর্মী, বৃদ্ধিজীবী, গবেষক, সাংবাদিক ও উলামা মাশায়েখসহ সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় সুস্থধারার সংস্কৃতির প্রসারতা কামনা করেন। পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মুহাম্মদ আবু আজম ও সাংস্কৃতিক সচিব মুহুাম্মদ মাসুমুর রশিদ কাদেরীর সঞ্চালনায় হিজরি নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানে অতিথি ও আলোচক ছিলেন, অধ্যক্ষ আবু তালেব বেলাল, অধ্যাপক সৈয়দ মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন আযহারী, অধ্যক্ষ বদিউল আলম রেজভী, মাওলানা ফজলুল কবির চৌধুরী, এ.এফ মোহাম্মদুর রহমান, সৈয়দ মুহাম্মদ হোসেন, মুহাম্মদ নঈমুল ইসলাম, আবু নাছের মুহাম্মদ তৈয়্যব আলী, নাছির উদ্দিন মাহমুদ, মাওলানা ওবায়দুল মোস্তফা কদম রসূলী, আ.ব.ম খোরশিদ আলম খান, মুহাম্মদ শফিউল আলম, মুহাম্মদ সাদেকুর রহমান খান, মুহাম্মদ আব্দুল করিম সেলিম, এইচ এম শহীদ উল্লাহ, মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, মুহাম্মদ এনামুল হক এনাম, মুহাম্মদ আমান উল্লাহ আমান, মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন খোকন, মুহাম্মদ সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী, মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন কাদেরী, আব্দুল্লাহ আল রোমান, মুহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন ছিদ্দিকী, মুহাম্মদ নুর রায়হান চৌধুরী প্রমুখ। সালাত সালাম শেষে হিজরি নতুন বছরে দেশ ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পরিত্রাণে মহান আল্লাহ পাকের রহমত কামনায় মুনাজাত পরিচালনা করেন হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদের চেয়ারম্যান পীরজাদা মাওলানা মুহাম্মদ গোলামুর রহমান আশরফ শাহ্।

আরো খবর

Leave a Reply

Close