বাংলাদেশ, বুধবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৯ ইং, ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ঈদযাত্রায় ২৫৬ টি দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত, ৮৬০ জন আহত: যাত্রী কল্যাণ সমিতি

ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০১৯

 

 

ঢাকা, ১৫ জুন ২০১৯, শনিবার
সদ্য বিদায়ী পবিত্র ঈদুল ফিতরে যাতায়াতে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন নিহত ও ৮৪৯ জন আহত হয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌ-পথে সম্মিলিতভাবে ২৫৬ টি দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত ও ৮৬০ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
আজ ১৫ জুন শনিবার সকালে নগরীর সেগুনবাগিচাস্থ ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০১৯ প্রকাশকালে এই তথ্য তুলে ধরেন। সংগঠনটির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল প্রতিবছরের ন্যায় এবারো এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর ঈদ কেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় সংগঠনটি ঈদ যাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌ-পথে দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানীর বিষয়টি বিগত ২০১৬ সাল থেকে অত্যান্ত দক্ষতা ও বিশ্বস্থতার সহিত পর্যবেক্ষণ করে আসছে। যা সর্বমহলে প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখছে।
লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিগত ঈদের চেয়ে এবার রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো, নৌ-পথে বেশ কয়েকটি নতুন লঞ্চ বহরে যুক্ত হয়েছে, রেলপথেও বেশ কয়েক জোড়া নতুন রেল ও বগি সংযুক্ত হয়েছে। এবারের ঈদের লম্বা ছুটি থাকায় জনসাধারণ আগেভাগে বাড়ি পাঠানোর সুযোগ কাজে লাগানোর কারণে ঈদযাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে। রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতিসহ সার্বিক পরিকল্পনা এবং বিগত ২০১৬ সাল থেকে ঈদযাত্রায় যাত্রী কল্যাণ সমিতির ধারাবাহিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনসমূহ গণমাধ্যম ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগানোর কারণে এবারের ঈদে বিগত বছরের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা ১৯.৩৯ শতাংশ, নিহত ২৪.১৭ শতাংশ ও আহত ৪৮.৯৯ শতাংশ কমেছে। এবছর মোট সংঘটিত ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনার ৭৬টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের সাথে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ। যেখানে মোট নিহতের ৩০ শতাংশ এবং মোট আহতের ১০ শতাংশ । অন্যদিকে পথচারীকে গাড়ী চাপা দেয়ার ঘটনা প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘটেছে। আগামী ঈদে এ দুটি ঘটনা এড়ানো সম্ভব হলে এই দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ঈদ যাত্রা শুরুর দিন ৩০ মে থেকে ঈদ শেষে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরা ১১ জুন পর্যন্ত বিগত ১৩ দিনে ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন নিহত ও ৮৪৯ জন আহত হয়েছে। এসব ঘটনায় ৪০জন চালক, ২০জন শ্রমিক, ৬৮জন নারী, ৩৩জন শিশু, ২৪জন ছাত্র-ছাত্রী, ০২জন চিকিৎসক, ১৯জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর সদস্য, ০৩জন রাজনৈতিক নেতা, ৯১২জন পথচারী সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
উল্লেখিত সময়ে রেল পথে ট্রেনে কাটা পড়ে ০৮টি, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে ০২ টি , ট্রেন যানবাহন সংঘর্ষে ০১ টি, ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ০২টি ঘটনায় মোট ১৩ জন নিহত ও ০৩ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে নৌ-পথে ১১টি ছোটখাট বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত, ০৩ জন নিখোঁজ ও ০৮ জন আহত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য ৪০টি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক , ৮টি অনলাইন দৈনিক এ প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উল্লেখিত সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা নিন্মরূপ:

তারিখ সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা নিহত আহত
৩০ মে ২০১৯ ১৭ ১৫ ১৬
৩১ মে ২০১৯ ১৩ ১৩ ৩২
০১ জুন ২০১৯ ১৪ ১৫ ৩৭
০২ জুন ২০১৯ ২০ ৩০ ৮৬
০৩ জুন ২০১৯ ০৯ ১৪ ৩৭
০৪ জুন ২০১৯ ১৯ ২৬ ১০৫
০৫ জুন ২০১৯ ২২ ৩৬ ৯৩
০৬ জুন ২০১৯ ১৯ ২১ ৫৬
০৭ জুন ২০১৯ ২৩ ২৪ ১২৮
০৮ জুন ২০১৯ ২২ ২৫ ৬৯
০৯ জুন ২০১৯ ১৫ ১৩ ৯৭
১০ জুন ২০১৯ ১৮ ২০ ৫০
১১ জুন ২০১৯ ২১ ২১ ৪৩
১৩ দিনে————        সর্বমোট  ২৩২
২৭৩
৮৪৯

বিগত ০৪ বছরের পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঈদ যাত্রায় সড়ক, রেল, নৌ-পথে দুর্ঘটনার তুলনামূলক চিত্র
সাল সড়ক দুর্ঘটনা রেল পথে দুর্ঘটনা নৌ-পথে দুর্ঘটনা
দুর্ঘটনা নিহত আহত ট্রেনে কাটা  (সহ অন্যান্য) দুর্ঘটনা নিহত আহত
২০১৬ ১২১ ১৮৬ ৭৪৬ ০৩ ০৩ ১১ ১৮
২০১৭ ২০৫ ২৭৪ ৮৪৮ ৩৪ ০১ ০৩ ১৪
২০১৮ ২৭৭ ৩৩৯ ১২৬৫ ৪১ ১৮ ২৫ ০৯
২০১৯ ২৩২ ২৭৩ ৮৪৯ ১৩ ১১ ১২ ০৮

এইসময় খুলনায় রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ইজিবাইককে ধাক্কা দিলে মহেশ্বপাশা পুলিশ ফাঁড়ির কনেস্টবল রেশমা আহত হয়েছে। কিশোরগঞ্জের কুলিায়রচর উপজেলায় হাতধুয়া কান্দিব্রিজে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা উল্টে ০১জন পুলিশ সদস্য নিহত ও অপরজন আহত হয়। নাটোরের বড়াইগ্রামে মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢাকার কদমতলি থানার উপ-পরিদর্শক মোঃ আব্দুল জলিলের মেয়ে মারিয়া তাসনিম নিহত হয়েছে এবং আব্দুল জলিলসহ তার পরিবারের ০৪ সদস্য আহত হয়। সিরাজগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বাস লেগুনা মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৭জন নিহত হয়। কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামে মিয়াবাজার ড্রাগণ সুয়েটার মিলের সমানে পুলিশ ভ্যান খাদে পড়ে ০৩ শ্রমিক নিহত এবং পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ মনিরুজ্জামানসহ ০৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়। আশুলিয়ায় ট্রাকচাপায় পুলিশ কনস্টেবল নাদিম হোসাইন নিহত ও ০২ পুলিশ সদস্য আহত হয়। এইসময় অন্তত ০৫টি ঘটনায় স্ব-পরিবারে সকলে সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ায় এসব পরিবারে ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়।  ময়মনসিংহের ভালুকায় ট্রাকচাপায় ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম। সাতক্ষীরায় বাস ও পুলিশ পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে কালীগঞ্জ থানার ওসি হাসান হাফিজুর রহমান সহ ০৩ কনেস্টবল আহত হয়। গাজীপুরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিবাদ করায় ‘আলম এশিয়া’ পরিবহনের বাসে সালাউদ্দিন নামের এক যাত্রীকে বাস চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় পুলিশের হাতে নারী ট্রেনযাত্রী লাঞ্ছিত হয়।বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্তের গোলচত্বরে যানজটে আটকে আফরোজা বেগম নামে এক নারী পথেই সন্তান প্রসব করার ঘটনা ঘটে। একই সময় নৌ-পথে এমভি ফারহান-১০ লঞ্চ থেকে ফেলে সুটিং সহকারী সাদ্দাম হোসেন নামে এক যাত্রীকে হত্যার ঘটনা ঘটে।

সংগঠিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৭.৪৩ শতাংশ বাস, ২৩.৮৯ শতাংশ মোটরসাইকেল ২৩.৫৯ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, লরি, ৮.২৫ শতাংশ কার-মাইক্রো, ৭.৬৬ শতাংশ অটোরিক্সা, ৪.৪২ শতাংশ নছিমন-করিমন ও ৪.৭১ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

সংগঠিত দুর্ঘটনার ২৯.৭৪ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৪৪.৮২ শতাংশ পথচারীকে গাড়ী চাপা দেয়ার ঘটনা, ১৯.৩৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায় ও ৬.০৩ শতাংশ অনান্য অজ্ঞাত কারনে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে
১. ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন।
২. অদক্ষ চালক ও হেলপার দ্বারা যানবাহন চালানো।
৩. মহাসড়কে অটোরিক্সা, ব্যাটারি চালিত রিক্সা, নসিমন-করিমন ও মোটর সাইকেল অবাধে চলাচল।
৪. বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো।
৫. সড়ক-মহাসড়কে ফুটপাত না থাকা।
৬. পণ্যবাহী যানবাহন বন্ধের নিষেধাজ্ঞা অমান্য।
৭. মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

সুপারিশমালা:
(১) চালক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ইস্যু পদ্ধতি আধুনিকায়ন, যানবাহনের ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি আধুনিকায়ন, রাস্তায় ফুটপাত-আন্ডারপাস-ওভারপাস নির্মাণ, জেব্রা ক্রসিং অংকন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও গবেষণা, ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ সড়ক নিরাপত্তায় ব্যপক কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য চলতি বাজেটে সড়ক নিরাপত্তা খাতে ১০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্ধ দাবী করছি।
(২) জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।
(৩) চালক প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা।
(৪) ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা।
(৫) ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে মানসম্মত পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা।
(৬) মহাসড়কে গতি নিরাপদ করা, ধীরগতি ও দ্রুত গতির যানের জন্য আলাদা আলাদা লেইনের ব্যবস্থা করা।
(৭) মোটর সাইকেলে ঈদযাত্রা নিষিদ্ধ করা।
(৮) ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধের আদেশ শতভাগ কার্যকর করা।
(৯) সড়ক নিরাপত্তায় ইতিমধ্যে যেসব সুপারিশ প্রণীত হয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
(১০) ঈদের আগে ০৩ দিন ঈদের পরে ০৩ দিন ঈদের ছুটি নিশ্চিত করা।

আরো খবর

Leave a Reply