নিজস্ব প্রতিবেদক
রড, সিমেন্ট, বিটুমিন, বালু ও পাথরসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় দেশের অবকাঠামো নির্মাণ খাতে চাপ বাড়ছে। পুরোনো দরপত্রের রেট শিডিউলের সঙ্গে বর্তমান বাজারদরের বড় ব্যবধানের কারণে অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, একদিকে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে, অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ব্যাংক গ্যারান্টি ও সিকিউরিটি আটকে থাকা, ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব প্রকল্পের দরপত্র কয়েক বছর আগে করা হয়েছিল, সেসব প্রকল্পে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে প্রাক্কলিত ব্যয়ের বড় পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ঠিকাদারদের ভাষ্য, নির্ধারিত রেটে কাজ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সড়ক ও অবকাঠামো প্রকল্পে চাপ
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি), বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের অধীনে চলমান অবকাঠামো প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
জাতীয় মহাসড়ক সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সড়ক, গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা, সেতু-কালভার্ট, সরকারি ভবন, রেলওয়ের অবকাঠামো এবং নগর উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজন হয়। ফলে রড, সিমেন্ট, পাথর, বিটুমিন ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রকল্প ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে।
ঠিকাদারদের একটি অংশের দাবি, কিছু এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ ও অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় কাজ শুরু হলে আগের দরপত্রের রেটে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
রড-সিমেন্টে মূল্যবৃদ্ধি
নির্মাণ খাতের অন্যতম প্রধান উপকরণ রড ও সিমেন্টের বাজারদর সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েক দফা ওঠানামা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম, স্ক্র্যাপের মূল্য, ডলার বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়সহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত ক্লিংকারসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সিমেন্টের বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। নির্মাণসামগ্রীর এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের মোট ব্যয় আরও বাড়ছে বলে ঠিকাদারদের দাবি।
ব্যাংক ঋণেও বাড়ছে চাপ
নির্মাণ খাতের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে অর্থায়নের ব্যয়। ঠিকাদারদের অনেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাংক ঋণ ও চলতি মূলধনের ওপর নির্ভর করেন। ঋণের সুদের হার বেড়ে গেলে প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয়ও বাড়ে।
অন্যদিকে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি ও সিকিউরিটি আটকে থাকলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। কাজের বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে ঠিকাদারদের নগদ অর্থের সংকট আরও তীব্র হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে অর্থায়ন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোতে ঠিকাদারদের ঝুঁকি বেড়েছে।
‘ব্যাংক সিকিউরিটির কোটি কোটি টাকা আটকে আছে’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ঠিকাদার সমিতির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ আলাউদ্দীন বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে ঠিকাদাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি অনেক ঠিকাদারের কোটি কোটি টাকা ব্যাংক সিকিউরিটি হিসেবে আটকে আছে।
তিনি বলেন, অনেক ঠিকাদার ব্যাংকের পে-অর্ডারের বিপরীতে ঋণ নিয়ে প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করেন। কিন্তু যথাসময়ে কাজ শুরু বা শেষ করা সম্ভব না হলে সেই ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে। তাঁর ভাষ্য, আইনি জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কারণে অনেক সময় ঠিকাদারদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
মোহাম্মদ আলাউদ্দীন বলেন, “সরকারি কোনো জটিলতা বা বিলম্বের কারণে যাতে ঠিকাদার ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। ব্যাংকঋণের সুদের চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ থাকা দরকার।”
বাংলাদেশ ঠিকাদার সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সামছুল কাউনাইন (কুতুব) বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেও অনেক ঠিকাদার যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেন না।
তিনি বলেন, “সরকারি প্রকল্পে কাজ করার জন্য অনেক সময় নির্ধারিত জায়গা যথাসময়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয় না। ফলে ঠিকাদার চুক্তি করার পরও কাজ শুরু করতে পারেন না। অথচ এরই মধ্যে ব্যাংক সিকিউরিটির টাকা আটকে থাকে এবং ঋণের সুদ বাড়তে থাকে।”
তাঁর দাবি, বছরের পর বছর ব্যাংক সিকিউরিটির অর্থ আটকে থাকায় ঠিকাদারদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে। বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঠিকাদারদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো সরকারি নির্মাণকাজের রেট শিডিউল নিয়মিত হালনাগাদ করা। তাঁদের বক্তব্য, কয়েক বছর আগের বাজারদর ধরে করা রেট শিডিউলে বর্তমান বাজারদরে কাজ করা বাস্তবসম্মত নয়।
একজন ঠিকাদার বলেন, “দরপত্রের সময় যে দামে রড, সিমেন্ট বা অন্যান্য উপকরণ কেনার হিসাব করা হয়েছিল, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সেই দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে নির্ধারিত মূল্যে কাজ করতে গেলে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়।”
তাঁদের মতে, প্রকল্পের সময়সীমা দীর্ঘ হলে মূল্য সমন্বয়ের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
নির্মাণ খাতের সংকট কাটাতে বাজারভিত্তিক ও নিয়মিত হালনাগাদ রেট শিডিউল প্রণয়ন, মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ বৃদ্ধি, দ্রুত বিল পরিশোধ এবং ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা অনুমোদন, প্রকল্পস্থল হস্তান্তর ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত সমাধান করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণ খাতের সঙ্গে রড-সিমেন্ট শিল্প, পরিবহন, শ্রমবাজার, ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির বহু অংশ সরাসরি যুক্ত। ফলে নির্মাণকাজে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিলে এর প্রভাব শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই নির্মাণসামগ্রীর বাজার স্থিতিশীল রাখা, বাস্তবসম্মত প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ, সময়মতো বিল পরিশোধ, ব্যাংক সিকিউরিটি দ্রুত অবমুক্ত করা এবং মূল্য সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঠিকাদারদের প্রত্যাশা, প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি দপ্তর, ব্যাংক, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদক ও সরবরাহকারী এবং ঠিকাদারদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি হলে চলমান সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন ঠিকাদারি খাতের আর্থিক ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে দেশের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।



