মাহমুদুল হক আনসারী
জাতিসংঘের ৮১তম ভাষণে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধাণমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাইলেন। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ উৎকন্ঠা রোহিঙ্গা সংকটকে তিনি বিশ^ নেতৃবৃন্দের নজরে আনতে জোরালো ভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের জনগন আশান্বিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বইছে সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে। এ নিয়ে স্থানীয় জনগণের মাঝেও বাড়ছে ক্ষোভ। কিন্তু কবে ফিরবে রোহিঙ্গারা, কবে হবে এ সংকটের সমাধান; তা নিয়ে শীঘ্রই কোন আশার সম্ভাবনা দেখছে না বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রোহিঙ্গা সমস্যার প্রথম শুরু হয় ১৯৭৮-৭৯ সালে। সে সময় প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। পরে মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা) সরকারের সাথে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এ সকল রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হলেও ১৯৮২ সালে সেদেশের সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করার পর পুনরায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। এরপর ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গা আগমন শুরু হয় ১৯৯১-৯২ সালে। সে সময় ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হলেও ২০০৫ সালের ২৮ জুলাইয়ের পর থেকে প্রত্যাবাসন বন্ধ থাকায় বাকী ১৩ হাজার ২৭৮ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আর ফেরত নেয়া হয়নি। আর আটকে পড়া এসব রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় অর্ধ লাখে উন্নীত হয়েছে। এরা এখন উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করছে। এরপর ২০১২ সালের সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এবং ২০১৭ সালের আগস্টের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে ৮ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। গত ২ বছর ধরে বিদ্রোহী আরকান আর্মির সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাত বৃদ্ধির পর আরো লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পসমূহে এবং আশপাশে বসবাস করছে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা। প্রায় ১০ হাজার একর বনাঞ্চল ধ্বংস করে তাদের জন্য বানানো হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র।
কিন্তু কবে ফিরবে রোহিঙ্গারা, কবে হবে এ সংকটের সমাধান; তা নিয়ে শীঘ্রই কোন আশার আলো দেখছেন না স্থানীয়রা। যদিও অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের সময়ে জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেসের সাথে প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুছ উখিয়ার কুতুপালংস্থ রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার সাথে ইফতার করার সময় তাদের আগামীর ঈদ নিজ দেশে উদযাপনের আশ্বাস দিয়েছিলেন।
মিয়ানমারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির সাথে আলোচনা ছাড়া কেবল মিয়ানমার সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এ সংকটের সমাধান আশা করা যায় না। আরাকান আর্মির উচিত হবে আরাকানের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য এ বিষয়ে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেওয়া।
রোহিঙ্গাদেরকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার কমতি নেই। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সরকার প্রধান, নোবেল বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুসের বিচক্ষন কূটনৈতিক তৎপরতায় সফলতা জনগন দেখতে পায়নি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্ভাস্তকে ফেরত নিতে আগ্রহের কথা শুনানো হয়েছিল । তালিকাভূক্ত ১ লাখ ৮০ হাজারের বাইর্ওে আরো ৮০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা পরিক্ষা নিরিক্ষা করার কথা জানিয়েছিল মিয়ানমার সরকার। রোহিঙ্গা উদ্ভাস্তদের তাদের দেশে সস্বম্মানে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতি ছিল কখনো ছিল না। ড. মোহাম্মদ ইউনুস আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরতে যথাযথ ভাবে চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের সফলতা দেখতে চায় দেশবাসী।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে আন্ত কোন্দল বাড়ছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন গ্রæপের সৃষ্টি। সন্ত্রাস অপহরণ নারী শিশু পাচার অহরহ ঘটছে। বাংলাদেশে উদ্ভাস্ত হিসেবে তারা অবস্থান করছে। এদেশের সরকার ও জনগন মানবিক কারণে তাদেরকে আশ্রয় দিলেও বর্তমানে এ অঞ্চলের জন্য তারা বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিচ্ছে। চট্টগ্রামসহ সারা দেশে তারা নানা ভাবে ঢুকে পড়ছে। বাংলাদেশের এনআইডি, জন্মনিবন্ধন বিভিন্নভাবে কৌশল করে সংগ্রহ করছে। মোটা অংকের অর্থ খরচ করে অবৈধ পথে পাসপোর্ট পর্যন্ত সংগ্রহ করার কথা নানা সূত্র থেকে শোনা যায়। এগুলো ব্যবহার করে স্তল, নৌ পথে বাংলাদেশের বাইরে পাড়ি জমানোর জন্য চেষ্টা করছে। সমুদ্র পথে নারী শিশু পাচার করছে। একটি সিন্ডিকেট শক্ত ভাবে তাদেরকে এসব পথে পাচার করছে। এ অঞ্চলের সমস্থ রকমের মাদকের পাচারের সাথে রোহিঙ্গারা নানা ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা শোনা যায়।
তাদের কারণে মাদক নারী শিশু পাচার কোনো ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দিন দিন তারা হিংস্র  হয়ে উঠছে। তাদের কারণে বাংলাদেশী স্থানীয় নাগরিকগণ নানা ভাবে দৈনন্দিন সমস্যার সম্মূখীন হচ্ছে। এ সব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও মাদক পাচার কারী গ্রুপের সাথে মায়ানমারসহ, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল এবং পাহাড়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কের কথা শোনা যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৈৗমত্ব বিরোধী চক্রান্তে রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী জড়িত থাকার যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে। তারা দেশের স্বাধীনতা স্বকীয়তা সার্বভৈৗমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ সব সন্ত্রাসীদের কতিপয় গোষ্টী মদদ দিচ্ছে বলেও শোনা যায়। এনজিও নামক অগনিত প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়ে কাজ করছে। দেশ বিদেশ থেকে তারা তাদের নামে বিপুল পরিমান অর্থ নিয়ে আসছে। অনুদানের অর্থ তাদেরকে দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে। প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ অনেকেই রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। এগুলো সবকিছু বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে সচেতন জনগন।
তাদের মধ্যে নিরীহ রোহিঙ্গারা মায়ানমারে প্রত্যাবর্তন চাইলে ও কতিপয় রোহিঙ্গা লিডার ফেরত যেতে চায় না। প্রত্যাবর্তন বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। তাদেরকে মদদ দিচ্ছে দেশী বিদেশী কতিপয় মহল। তাদের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জনগন দ্রæততার মধ্যে চায়। তাদেরকে মায়ানমার সরকার পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়ে তাদের নিজ নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন করুক সেটিই এদেশের জনগন চায়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে যারা অবস্থান করছে অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা তাদের কাছে গিয়ে সোহানুভুতি জানায় তাদেরকে বলবো, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করুন। সেই যায়গায় সার্বিক সহযোগিতা করুন। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক ভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রদের নিয়ে নানা ভাবে দিপাক্ষিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। তাদের বিষয়ে বাংলাদেশের পাশে থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের অভ্যান্তরিন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে ভাবে আগ্রহ ও তৎপরতা সেই ধরনের তৎপরতা এদেশের জনগন রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে দেখতে চায়।
একটি চক্র রোহিঙ্গাদের থেকে নারী ও শিশুদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করছে। উৎপেতে থাকা কতিপয় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঢুকে পড়ছে। কোনভাবেই তাদেরকে তাদের ক্যাম্পে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তারা কোন নির্দেশনা মানছে না। তাদের উশৃংখল জীবনযাপন আইন না মানা , আনুগত্য না করা। বিভিন্নভাবে তারা এদেশের শৃঙ্খলা মানছেনা। সেটি জনগন দেখছে। ফলে দ্রæত তাদের প্রত্যাবর্তন ছাড়া অন্য বিকল্প নেই।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতার বৃদ্ধি লক্ষনিয়। কিন্তু মায়ানমারের সরকার আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রাজি হলেও বাস্তবে এ পর্যন্ত তারা একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি। আন্তর্জাতিক দেশের সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বারবার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গাদেরকে আত্মমর্যাদার সাথে নাগরিক অধিকার প্রাপ্তির সাপেক্ষে তাদেরকে সে দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টায় আছে। কিন্তু সেটি মোটেও সফল হচ্ছে না।
ক্ষমতার দ্বন্দে তাদের মধ্যে আন্তোকোন্দল ছড়িয়ে পড়ছে। একে অপরকে হত্যা করছে, তারা বেপরোয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছে বিশ্লেষকগণ। এই সন্ত্রাসের সাথে এক শ্রেণীর এনজিও সেবা সংস্থা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকার অভিযোগ শুনা যায়।
রোহিঙ্গাদের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ঠিকমতো তাদের পেছনে খরচ করছে না এমন এনজিও সেখানে কাজ করছে সেটাও নানা সূত্র বলছে। তাদের জন্য প্রাপ্ত অর্থ নানাভাবে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করছে। নানাভাবে তারা সেটা অন্যখানে ব্যয় করছে অন্য কাজে ব্যায় করছে। ইচ্ছে মতো তারা তা ব্যায় করছে। যে উদ্দেশ্যে যে সব দেশ তাদের জন্য অর্থ পাঠায় সে অর্থ সেখানে যথাযথভাবে ব্যায় করছেনা। দীর্ঘসময় থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশাল একটি বাণিজ্য বাংলাদেশে চলছে। বৈধ অবৈধভাবে অনেক ধরনের সংস্থা এখানে রোহিঙ্গাদেরকে সাইনবোর্ড বানিয়ে কাজ করছে। বাস্তবে রোহিঙ্গারা বেঁচে থাকলেও তাদের বক্তব্য হলো আত্মমর্যদাহীন অবস্থায় তারা সেখানে আছে। অনেক রোহিঙ্গাদের বক্তব্য জানা যায় তারা পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে মায়ানমারে তাদের নিজ বাড়ি ভিটায় ফিরে যেতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আপ্রাণ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলেও বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মহল রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য যেটি করা দরকার, যা করা দরকার তা এখনো হচ্ছেনা। ফলে তারা আজকে বেপরোয়া উশৃংখল। কারো নিয়ম-নীতি তারা মানছেনা। আন্তঃকোন্দলে তারা বিভক্ত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রির রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে জাতিসংঘের ভাষণে জনগন আশার আলো দেখতে চায়।
আশা করছি যত দ্রæত সম্ভব বর্তমান সরকার জোড়ালো ভাবে কুটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাবেন এবং এই কর্মসূচীর সফলতা চায় জনগন। সরকার রোহিঙ্গা উদ্ভাস্তদের টেকসই প্রত্যাবর্তনের বাস্তব কর্মসূচী জাতিকে উপহার দেবেন। প্রত্যাশা জনগনের।