মুফতি এ এইচ এম আবুল কালাম আযাদ
ইসলামের প্রচার-প্রসার, বিস্তৃতি ও স্থায়িত্বে ওয়াজ মাহফিলের অবদান এবং প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যুগে যুগে মুসলিম জনসাধারণের সংশোধন ও ইসলামি চেতনায় উজ্জ্বীবিত হওয়ার পেছনেও ওয়াজ মাহফিলের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সর্বস্তরের জনসাধারণকে ইসলামমুখী করার জন্য, ইসলামি আদর্শে অনুপ্রাণিত করার জন্য ওয়াজ মাহফিলের কোনো বিকল্প নেই।
মানুষের ধর্ম সম্পর্কে জানার ইচ্ছা থেকেই প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে এসব মাহফিলে অংশ নিয়ে থাকেন। আর ধর্ম সম্পর্কে মানুষকে জানানো আলেম-উলামাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ স. বলেন, ‘(আমার ইন্তেকালের পর) লোকেরা তোমাদের অনুসারী হবে। বিভিন্ন দিক হতে তারা তোমাদের নিকট দ্বীনি জ্ঞান লাভ করার উদ্দেশ্যে আগমন করবে। অতএব তারা যখন তোমাদের নিকট আসবে তখন তোমরা তাদেরকে সদুপদেশ দেবে। ’ (তিরমিজি/ ২৬৫০)
মহানবী মুহাম্মদ স. নবুওয়তের গুরুদায়িত্ব লাভের পর যখন মানুষের কাছে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের আসমানি আদেশ পেলেন তখন মক্কার পাহাড়ে উঠে এক একটি গোত্রের নাম ধরে সবাইকে পাহাড়ের পাদদেশে সমবেত হওয়ার আহ্বান করলেন। সবাই সমবেত হলে তিনি আল্লাহর একত্ববাদের যৌক্তিকতা তাদের সামনে উপস্থাপন করেন। সেই থেকে শুরু হয় ওয়াজ মাহফিলের সোনালী অধ্যায়। পরবর্তীতে নবী স. মক্কাবাসীদের বিভিন্ন গনজমায়েতে উপস্থিত হয়ে ইসলামের আবেদন ও সৌন্দর্য তুলে ধরে উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করে ভাষণ দিতেন। এমনকি তিনি সাহাবিদেরও ওয়াজ করার জন্য বিভিন্ন স্থানে পাঠাতেন। সাহাবাদের পরে তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনরা ওয়াজ করার জন্য বিভিন্ন স্থানে যেতেন। তাদের অবর্তমানে যুগের উলামা-মাশায়েখরা ওয়াজের মঞ্চগুলোকে অলংকৃত করেছেন। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইসলাম পৌঁছেছে ওয়াজ মাহফিলের নিরবিচ্ছিন্ন ধারায়। ওয়াজের এই ধারা কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি কিংবা বন্ধ হয়নি। (আলহামদুলিল্লাহ)
উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা আছে। ভারত-বাংলাদেশে কবে থেকে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছে, কে শুরু করেছেন, কীভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছে এটি নিয়ে বিস্তর লাইন ধরে ধরে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না করলে মূলত অল্প কথায় বিস্তাারিত বুঝানো কঠিন। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে, ৭ম শতাব্দীতে মালাবার সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে নব্য মুসলিম আরব বণিক এবং ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম ইসলামের আবির্ভাব হয়।
নবী মুহাম্মদ স. দুনিয়ায় আসার (খ্রিষ্টীয় ৫৭০) মাত্র ৫০ বছর পর ৬২০ খ্রিস্টাব্দে লালমনিরহাট জেলার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয় বলে ইদানিং বেশকিছু ইতিহাসবেত্তা তথ্য প্রমাণাদি উপস্থাপন করে জোরালো দাবি করছেন। এতে আরও দেখা যায়, ৬৯০ খ্রিস্টাব্দে দেশের প্রথম মসজিদটিও নির্মিত হয় ওই জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের ‘মজেদের আড়া’ নামক গ্রামে যার নাম ‘সাহাবায়ে কেরাম জামে মসজিদ’। আর ‘রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থ’ এবং ‘রংপুরে দ্বীনি দাওয়াত’ গ্রন্থেও এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্যাদির সন্ধান রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রচলিত ওয়াজ মাহফিলের ইতিহাসও তাহলে বেশ পুরনো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমানে দ্বীনি মাহফিলগুলো তার ঐতিহ্য ও জৌলুশ হারানোর পথে এবং ক্রমে ক্রমে তা মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাচ্ছে। কি কি কারণে মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাচ্ছে তা আজ আলোচনা করবো। (ইনশাআল্লাহ)
পরিশুদ্ধ নিয়তের অভাব : আল্লাহ তায়ালা বান্দার ভালো কাজের বিনিময়ে প্রতিদান ও পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। তবে বিনিময় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়টি নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। কোনো কাজ করার পেছনে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য থাকলে পরিমাণে অল্প হলেও সেটিই তার মুক্তির পাথেয় হিসেবে বিবেচিত হবে। ওয়াজ মাহফিলসহ সব ধরনের ইবাদতে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ স. বলেছেন, ‘তোমার ঈমানকে খাঁটি করো, অল্প আমল নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম : ৪/৩৪১) বর্তমানে মাহফিল সম্পৃক্ত মাহফিল কমিটি, বক্তা, শ্রোতা অধিকাংশেরই পরিশুদ্ধ নিয়তের অভাব। তাই তিন শ্রেণীকেই পরিশুদ্ধ নিয়ত নিয়ে নিম্নোক্ত সমস্যা পরিহার করে ওয়াজ মাহফিল আয়োজন করতে হবে, বক্তাকে ওয়াজ করতে হবে, শ্রোতাকেও ওয়াজ শুনতে হবে।
মাহফিল কমিটির কারণে যেসব সমস্যা
বক্তা নির্বাচনে সমস্যা : সাধারণত মাহফিলগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বক্তাকে কেন্দ্র করে। এজন্য মাহফিলে বক্তা নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বক্তা নির্বাচনে মাহফিল কমিটি বক্তার ইলম, আমল না দেখে বরং দেখে বক্তা ভাইরাল কিনা, বক্তার গলার স্বর কেমন, বক্তা গান গায় কেমন, বক্তা মানুষকে হাসাতে পারে কিনা, বক্তা বিভিন্ন বক্তার কন্ঠ নকল করতে পারে কিনা, বক্তা বিভিন্ন সুরে আজান দিতে পারে কিনা! কোন বক্তা আনলে মাহফিলে মানুষ বেশি হবে এ বিষয়গুলি লক্ষ করে। মুফতি, মুহাদ্দিস, শাইখুল হাদিস, মুহতামিম, প্রিন্সিপাল, প্রবীণ আলেম বক্তাকে প্রধান বক্তা না বানিয়ে বরং বয়সে কম, একাডেমিক যোগ্যতা কম শুধুমাত্র ভাইরাল এজন্যেই তাকে প্রধান বক্তা বানানো হয়। এসব মনোভাব থেকে সরে আসা প্রত্যেক মাহফিল কমিটির প্রয়োজন।
চাঁদা সংগ্রহ : সামাজিক ও ধর্মীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থা ও পরিচালনার জন্য ‘গণচাঁদা’ সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে। প্রচলিত দ্বীনি মাহফিল এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু চাঁদা সংগ্রহ করতে রাস্তার গাড়ি আটকিয়ে, ছোট ছোট বাচ্চাদের দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কালেকশন করানো, মাহফিলের মূল সময়ে প্রধান বক্তাকে মাইক না দিয়ে ২য় বক্তাকে দিয়ে লম্বা সময় কালেকশন করানো, অনেক সময় ব্যক্তির সামর্থ্য ও সাধ্যের বাইরে এমন কিছু দাবি করে, যা তার জন্য কষ্টসাধ্য ও জবরদস্তিমূলক। এমন কাজের অনুমতি ইসলাম দেয় না। এ বিষয়ে গভীর মনোযোগ কাম্য।
বাহুল্যতা : প্রতিটি কাজে মধ্যস্থতা ও পরিমিতবোধ বজায় রাখার নির্দেশনা ইসলামের সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে। বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন ইসলামে নিন্দনীয়। বর্তমানে মাহফিলগুলোকে ঘিরে অর্থের অপচয়, অপ্রয়োজনীয় তোরণ নির্মাণ ও আলোকসজ্জার আয়োজন যেন বিধর্মীদের উৎসব-পার্বণকেও হার মানায়। ইসলাম সৌন্দর্যতা পছন্দ করে, সুন্দরের নির্দেশ দেয়। তবে সেটা হতে হবে নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে নিজস্ব সংস্কৃতির আদলে। মুসলিম সমাজের কোনো কাজ ও সংস্কৃতি যেন ভিন্নধর্মীদের সঙ্গে সাদৃশ্যতা না রাখে। রাসুলুল্লাহ স. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত বলে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ : ৪০৩১)

শেয়ার করুনঃ