লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া 

 

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো; অপরাধী শাস্তি পাবে, কিন্তু নিরপরাধ ব্যক্তি কোনোভাবেই হয়রানির শিকার হবে না। আধুনিক বিচারব্যবস্থার মূল দর্শনই হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি বিষয় হলো ‘অজ্ঞাত আসামি’ বা ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ অন্তর্ভুক্ত করে মামলা দায়েরের প্রচলন। আইনগতভাবে এর একটি যৌক্তিক ভিত্তি থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে এটি বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগ, ভোগান্তি এবং নাগরিক অধিকার হরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure)-এর আওতায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলে তদন্তের স্বার্থে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে। বিশেষত দাঙ্গা, সহিংস বিক্ষোভ, নাশকতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনায় এই বিধান তদন্তকারী সংস্থাকে অপরাধী শনাক্তকরণের একটি প্রয়োজনীয় সুযোগ প্রদান করে। কারণ অনেক সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ করা তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয় না। 

তবে সমস্যার সূচনা হয় তখন, যখন এই ব্যতিক্রমধর্মী আইনি বিধানটি প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে একটি নিয়মিত প্রশাসনিক চর্চায় পরিণত হয়। রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন, জনসমাবেশ কিংবা সংঘর্ষের ঘটনার পর দায়ের হওয়া বহু মামলায় দেখা যায়, কয়েকজন নামীয় আসামির পাশাপাশি শত শত কিংবা হাজার হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ফলে মামলার প্রকৃত পরিধি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে এবং তদন্তের ক্ষমতা প্রায় সীমাহীনভাবে বিস্তৃত হয়ে যায়। 

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিক। কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক, ছাত্র, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কিংবা ঘটনাস্থলের আশপাশে উপস্থিত সাধারণ মানুষও অনেক সময় নিজেকে সম্ভাব্য আসামি হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য হন। মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও পরবর্তীতে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার আশঙ্কা থেকে যায়। এর ফলে সমাজে এক ধরনের নীরব ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। 

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জীবন রক্ষার সাংবিধানিক গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি জানেন না তিনি কোনো মামলার সম্ভাব্য আসামি কি না, কিংবা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তদন্তের আওতায় আসার ঝুঁকিতে থাকেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে; তার সাংবিধানিক নিরাপত্তা কতটুকু কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রয়েছে? 

অজ্ঞাত আসামির মামলার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা। মানবাধিকার কর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থ করা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলে তদন্তের নামে পরবর্তীতে তাকে মামলার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। 

 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ