টানা বৃষ্টির প্রভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টির পাশাপাশি দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। গত কয়েক দশকের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায় বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে গুদামজাত ভোগ্যপণ্য নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েক কোটি টাকার পণ্য এরই মধ্যে নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
বৃষ্টিপাতের কারণে গতকাল সকাল থেকে খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পানি উঠে যায়। এ সময় সিটি করপোরেশনের সংস্কার করা সড়কে প্রায় তিন ফুট পরিমাণ পানি ওঠে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পানিও বাড়তে থাকে। দুপুরে জোয়ারের পানি প্রবেশের পর থেকে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি আরো বাড়তে থাকে। বেলা ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্মরণকালের সর্বোচ্চ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় এক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় নিরুপায় হয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানের পণ্য পানিতে ডুবে যাওয়া প্রত্যক্ষ করা ছাড়া উপায় ছিল না বলে তারা জানিয়েছেন।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. আজিজুল হক জানান, সকাল থেকে টানা বৃষ্টিপাতে খাতুনগঞ্জের মূল সড়ক তলিয়ে যায়। এ সময় বাজারের বিভিন্ন আড়ত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে পানি ঢুকে পড়ে। জলাবদ্ধতায় পণ্য নষ্ট হওয়া ঠেকাতে ব্যবসায়ীরা আগেই নিজেদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধক ওয়াল নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু গতকালের জোয়ারের পানি প্রতিরোধ দেয়াল উপচে ভেতরে প্রবেশ করে। বৃষ্টি থাকায় এবং দ্রুত পানি বাড়ায় ব্যবসায়ীরা মজুদ মালামাল সরিয়ে নিতে পারেননি। পরে জলাবদ্ধতা কমলেও প্রতিরোধক দেয়ালের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পানি আটকে থাকে।
এ বিষয়ে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগির আহমেদ বলেন, গত কয়েক দশকের মধ্যে আজ (রোববার) খাতুনগঞ্জে সর্বোচ্চ পরিমাণ পানি উঠেছে। এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে কয়েক কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি বের করতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে। টানা বৃষ্টির কারণে গভীর রাতেও পানি ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ভিজে যাওয়া পণ্য না সরিয়ে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা ছাড়া ব্যবসায়ীদের উপায় নেই বলে দাবি করেন তিনি।
ব্যবসায়ী নেতারা জানান, জলাবদ্ধতা নিরসন ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ার-ভাটা থেকে খাতুনগঞ্জকে রক্ষা করতে বিভিন্ন সময়ে দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকারি কোনো সংস্থাই প্রকৃত অর্থে খাতুনগঞ্জের অবকাঠামো উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে এগিয়ে আসেনি। চাক্তাই খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিনই জোয়ারের পানিতে খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তবে টানা বৃষ্টিপাত ও অমাবস্যা-পূর্ণিমার সময় জোয়ারের কারণে বাজারে পানি প্রবেশ করে সবচেয়ে বেশি। এজন্য স্লুইস গেট নির্মাণ, খাল সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা।
গতকালের বৃষ্টি-জোয়ারে খাতুনগঞ্জের চাক্তাই, আছদগঞ্জ, শুঁটকিপট্টি, চামড়া গুদাম, চালপট্টি, ভাঙাপুল, মধ্যম চাক্তাই, নতুন চাক্তাই, হামিদ উল্লাহ মার্কেট, আমির মার্কেট, বক্সিরহাট এলাকায় কোমর সমান পানি ওঠে। এ সময় গুদাম-আড়ত ও দোকানের মালামাল বাঁচাতে ব্যবসায়ীরা শ্রমিকদের দিয়ে সেগুলো সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু খুব দ্রুত আড়তে-গুদামে পানি প্রবেশ করায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজেদের মালামাল ভিজে যাওয়া রোধ করতে পারেননি। বিভিন্ন আড়তের স্তূপের নিচের দিকের একটি বা দুটি বস্তার ভোগ্যপণ্য তখনই ভিজে যায়। আড়তগুলোয় দু-তিন ফুট পানি প্রবেশ করায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত বন্ধ ছিল। দুপুরের পর পানি কমে গেলেও অনেক ব্যবসায়ী ভিজে যাওয়া পণ্য সরানোর উদ্যোগ নেননি। গভীর রাতের জোয়ারের পানি আবারো প্রবেশ করবে— এ আশঙ্কায় তারা পণ্যগুলো আগের মতোই রেখে দিয়েছেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, ২০০৫ সালে প্রথম খাতুনগঞ্জে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে ভোগ্যপণ্য নষ্ট হয়। এর পর ২০০৭ সালেও বর্ষা মৌসুমে পানি ঢুকে বাজারে কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়। এর পর ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানি প্রবেশের কারণে ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। মূলত চট্টগ্রাম শহরের ২২টি খাল ভরাট ও চাক্তাই খাল দখল হয়ে যাওয়ায় নগরীর অভ্যন্তরীণ পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা দাবি করেছেন, এরই মধ্যে সরকার খাতুনগঞ্জ ও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব থাকায় জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নিয়ে তারা সন্দিহান। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে মনিটরিং সেল গঠন, কর্ণফুলী নদী ড্রেজিং, বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ ও নতুন তিনটি খাল খননের প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী খাতুনগঞ্জে ব্যবসায়িক জোন বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৮৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে সবচেয়ে বেশি পানি প্রবেশ করে খাতুনগঞ্জের শুঁটকিপট্টি এলাকায়। তুলনামূলক নিচু এলাকা হওয়ায় শুঁটকিপট্টির শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। এতে শুঁটকি ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন গুদামে মজুদ অন্যান্য পণ্যও নষ্ট হয়। টানা বৃষ্টিতে আবারো পানি প্রবেশ করার আশঙ্কায় দুপুরের পর থেকেই ব্যবসায়ীরা বিকল্প স্থানে কিছু কিছু শুকনা পণ্য সরিয়ে নেন বলে জানিয়েছেন।



