১৫ জুন ২০২৪ / ১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ / রাত ৪:০১/ শনিবার
জুন ১৫, ২০২৪ ৪:০১ পূর্বাহ্ণ

সৃষ্টিশীল নাসির হোসেন জীবন মৃত্যুতেই জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে নিল

     

মোঃ আসিফ ইকবাল

নাসির হোসেন জীবন মৃত্যুকেই আপন মনে করল। নিষ্ঠুর মন মানসিকতা আর মানুষের অভিনয়কে তিনি অনেক আগে থেকেই জীবনের পরতে পরতে বুঝে গিয়েছিলেন। কঠিনতম অসুস্থ হওয়া স্বত্তে¡ও জীবন জীবিকার সন্ধ্যানে জীবন মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন জীবিকার তাগিদে। কারণ যতক্ষণ বেঁচে ছিল ততক্ষণতো অন্নসহ অন্যান্য কিছুরও প্রয়োজন ছিল। তাই নিজের কঠিন রোগকে তিনি বুঝতে দেননি অনেক এবং গুরুতর অসুস্থ। একটু গভীরভাবে অনুধাবন করলে আপনারা সকলেই বুঝবেন এ সমাজ যার পকেট ভরা তাকেই আমরা সকলেই দিতে চাই কিন্তু দারিদ্র মানুষকে আমরা বিশালভাবে কেউ সাহায্য করতে চাইনা। জীবনের অসুস্থতায় হয়ত অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল কিন্তু আতœসম্মান আর পরিবারের ঐত্যিহ্য রক্ষায় জীবন চিকিৎসার জন্য কারো কাছে মুখ বিক্রি বা নত স্বীকার করেন নি। কারণ কেউ কেউ এটাকে মিথ্যা মনে করত। আবার কেউ কেউ সহযোগিতা করত তার প্রত্যাশার ১০০ ভাগের ৫ ভাগ। হয়ত জীবন হিসেব করে দেখেছে মানুষ চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার কথা বললে প্রকৃত সহযোগিতা পাবেন না বা ক্ষেত্রবিশেষে চরম অপমান উপহার পাবে। আবার জীবন এটাও ভেবে নিয়েছেন তার চিকিৎসার জন্য কেউ যেন তার পরিবারকে ছোট করে না দেখে। তাকে যেন ভুল না বুঝে। কারণ তার প্রতিটি অনুষ্ঠান করতে গিয়ে অনুষ্ঠানের খরচ আর তাঁর ম্যাগাজিনন সামগ্রিক ব্যয় সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিবারই খিমসিম ও নানা অপমানের তীক্ত অভিজ্ঞতা পেয়েছে। তারপরেও অনুষ্ঠানের সফলতা আর বিনোদনের রঙ প্রকাশের পরে হয়ত তৃপ্তির আনন্দে নিজেকে খুশি করতে চেয়েছে। কিন্তু দিনশেষে জীবন কারো বাবা, কারো স্ত্রী, কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো আতœীয় কারো নেতা, কারো অভিভাবক। এসব অতি প্রয়োজনীয় রক্ত ও সামাজিক সম্পর্কের জন্য একজন মানুষ হিসেবে জীবনের নানান দায়িত্ব এবং কর্তব্যে নিয়োজিত ছিলেন। আর দায়িত্ব পালনে আর্থিক বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই অর্থের কাছে জীবন তার জীবনকে হারিয়ে দিল। কিন্তু আত্মসম্মানে জীবন হেরে যান নি। মনে মনে মৃত্যুকে জীবনের পরম সম্মানি প্রাপ্তি মনে করেছেন। কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন বা কারো কটু কথা শুনতে জীবন মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। জীবন অন্য মহৎ প্রাণ শিল্পী ও আপনজনদেন স্মরণসভায় প্রতিনিয়তই দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবিত শিল্পীদের সঙ্গীতসহ অন্যান্য বিষয়ে বিশালভাবে তুলে ধরার চেষ্ঠা করেছেন। হয়ত জীবন আরেকটু সময় পায়নি না হয় নিজের জীবনের সামগ্রিক কাহিনী বিনোদনের রঙ এর ১টি সংখ্যা অন্তত সাজাতেন। যেমন করে বিনোদনের রঙ এর প্রতিটি সাংস্কৃতিক পর্বে জীবন নিজেও কয়েকটি গান করতেন অবলীলায়। গত ১৮ অক্টোবর তার জীবনের তার বিনোদনের রঙ এর শেষ প্রোগামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কন্ঠশিল্পী প্রবাল চৌধুরী ও বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের অন্যতম ব্যান্ড সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণানুষ্ঠানে জীবন প্রায় ৩টি গান করেছিলেন। পুরো অনুষ্ঠান আয়োজকের পাশাপাশি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছিলেন। এমনকি ঐদিন পৃর্ণিমা দিদির সাথে একটি সুন্দর গানে দ্বৈত পরিবেশনা করেছিলেন। ঐ সময়ে জীবন চুড়ান্ত অসুস্থ ছিলেন। সবকিছুর পরেও জীবন নিজের শেষ সময়টুকু শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, মানুষ ও সৃষ্টির সাথে থেকেই কাজ করে গিয়েছেন। মৃত্যুর অগ্রিম আগমনী বার্তা জেনেও শরীরকে কষ্ট দিয়েছেন।
মনকে জাগরিত করতে চেয়েছিলেন। মানুষ একবিন্দু যেন না বুঝুক জীবন সত্যিকার অসুস্থ সেটাই হয়ত জীবন মনে মনে চেয়েছিলেন। মানুষ তাকে টাকার জন্য কাজ করতেছে ভাবুক সেটাই কৌশলী মনে আমাদেরকে ভাবতে দিয়েছিলেন। বাস্তবে জীবন জীবনের থেকে চুড়ান্ত বিদায়ের ট্রেনের অপেক্ষা করেছিলেন। একজন সহজ সরল শিল্প, সংস্কৃত সাহিত্য মনষ্ক সৃষ্টিশীল জীবন আমাদের কাছ থেকে কোন সম্মান না নিয়েই চলে গেল। সে জানত এ সমাজ জীবিত অবস্থায় প্রকৃত গুণীজনকে তেমন সম্মান দেয়না। মৃত্যুর পর হয়ত কেউ চাইলে ১ বা ২ টি ছোট্ট শোকসভা হতে পারে এটুকু। অথচ এ সমাজে প্রতিদিনই কোন না কোন মাধ্যমে অনেকেই ক্রেস্ট পেয়ে সংবর্ধিত হয়। যে সমস্ত সংবর্ধনার একটি বৃহত্তর অংশ একটি সুকৌশলী স্বার্থ আদায়। জীবন আজ সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে দ্রতই এ পৃথিবী থেকে চলে গেল। কোন রকম চিকিৎসা ছাড়া। কারণ সে কারো সহযোগিতা নিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে করুনার জীবন কামনা করেনি। সে আতœসম্মানের মৃত্যুটাকেই সারাজীবন সৎ হয়ে থাকার চিকিৎসা মনে করেছে। নাসির হোসেন জীবন সম্পাদিত বিনোদনের রঙ এর প্রতিটি সংখ্যায় শিল্পীদের প্রাধান্য দিত। প্রতিটি ঈদ সংখ্যা আপ্রাণভাবে বের করার চেষ্ঠা করত। চেষ্ঠা করত চট্টগ্রামের শিল্পী, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে জাতীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো গাড়ী চালিয়েছেন কখনো বাইক, কখনো রাইডিং শেয়ার করেছেন কখেেনা চাকরি করেছেন, কখনো ক্ষুদ্র ব্যবসাও করেছেন। তবুএ শিল্প সংস্কৃতি, নাটক, চলচ্চিত্র থেকে তাকে দুরে রাখা সম্ভব হয়নি। প্রচুর অর্থকষ্টের মাঝেও মানুষকে ঠকাতেন। কম্পিউটারসহ যে সমস্ত দোকানে কাজ করতেন তাদের সব পাওনাও যথাসময়ে পরিশোধ করতে চেষ্ঠা করতেন। সবার সাথেই ভালো ব্যবহার আর বন্ধুত্বপুর্ণ আচরণ প্রদর্শন করতেন। চেহারায় কালো হলেও মানসিকতায় জীবন ছিল অসাধারণ ও সুন্দর মনের বৈচিত্র্যময়। চেষ্ঠা করেছেন কখনো মঞ্চ নাটকের মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরতে, কখনো বিনোদনের পাতায় দেশের অনেক গুণী ও নতুন উদীয়মান শিল্পীদের জীবনকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কখনো চলচ্চিত্র কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। কখনো নাটকেও কাজ করেছেন। কখনো সাংবাদিকতাও করেছেন। সর্বোপরি একটি মাসিক বিনোদন ম্যাগাজিন বিনোদনের রঙ প্রকাশনা ও সম্পাদনা করেছেন। সবমিলে জীবন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সৃষ্টির সাথে, শিল্পের সাথে, আলোর সাথে, বাঙালী সংস্কৃতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। নিজের অসুস্থতাকে শিল্পে রুপ দিয়েছেন। কারো করুণার রুপে পুনঃজীবনে ফিরে অবজ্ঞা আর প্রতিদানের জীবনে নিজেকে জড়াতে চাননি। নিজেকে একজন নিঃস্বার্থ সৃষ্টিশীল সুন্দর মনের মানুষ সকলের শ্রদ্ধা ও স্নেহের প্রিয় জীবন হয়ে মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকতে চেয়েছে জীবন। একজন সৃষ্টিশীল আর মেধাবী লেখক, বিনোদন সাংবাদিক, দক্ষ সংগঠক নাসির হোসেন জীবনকে অনেক ছোটখাট অনুষ্ঠানেও আমরা তেমন অতিথি করেনি। কারণ আমরা এখন অতিথি সিলেকশনের চেয়ারগুলো হয়ত টাকাওয়ালা, হয়ত ক্ষমতাওলা, হয়ত অন্য স্বার্থসিদ্ধির জন্যই বরাদ্দ করি। জীবনের মত একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে মঞ্চের এককোণায় আমরা কখনো বসাতে চাইনি বা প্রয়োজন মনে করেনি। কারণ সমাজটা এখন অর্থবৃত্ত ছাড়া তেমন চিন্তা করতে চাইনা। ব্যক্তিগতভাবে চট্টগ্রাম সাহিত্য পাঠচক্র একটি অনুষ্ঠান প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র অনুষ্ঠানে জীবনকে প্রধান অতিথি করতে পেরেছিলাম এটাই ক্ষণিক শান্তনা। না হয় সকল পরিচিত সংগঠনই তেমনভাবে জীবনের সৃষ্টিশীলতাকে তেমন স্বীকৃতি দেয়নি। যে জীবনের হাত ধরে প্রায় ৫০০ এর অধিক মানুষ সংবর্ধিত হয়েছে সেই জীবন কয়টি সংগঠন থেকে সংবর্ধনা স্মারক পেয়েছেন। জীবন তার জীবনের শেষ প্রোগামটি মোহনা টেলিভিশনের ১৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেই সারাদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে কাটিয়ে দিল। আর এই অনুষ্ঠানেই জীবন তাঁর জীবনের শেষ পুরষ্কার মোহনা টেলিভিশন চট্টগ্রাম ব্যুরো ইনচার্জ আলী আহমদ শাহীনের হাত থেকে শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক সংগঠক সম্মাননা গ্রহণ করলেন। যে সংবর্ধনায় অন্তত আমাদের অন্যান্য সংগঠকদের কিছুটা হলেও দায়মুক্তি হল। অভিমানী জীবন তার অভিমানী কান্নাটা আমাদের স্বার্থপর মানুষদের বুঝতে না দিয়ে অনেকটা হেসে হেসে নিজের বিদায় সংবর্ধনা, নিজের বিদায় অনুষ্ঠান নিজেই করে মহা বিদায় নিল। ভালো থাকবেন জীবন ভাই। আপনার সৃষ্টিশীল শিল্প ও সংস্কৃতি আপনাকে মনে করতে আমাদের বাধ্য করবে। আপনার সুন্দর মন মানসিকতা কখনোই হারিয়ে যাবেনা। জীবনকে মহান আল্লাহ সমস্ত গুণাহ মাফ করে জান্নাতের মেহমান করুক এটিই কামনা। লেখায় ভুল ত্রæটি বা কারো হৃদয়ে আঘাত লাগলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।।

লেখকঃ মোঃ আসিফ ইকবাল
কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক

About The Author

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply