বাংলাদেশ, সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

৪৩টি সেতু ও ১৩টি কালর্ভাট নির্মান শেষ পর্যায় সড়ক উন্নয়নে দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ি জনপদ

 

শংকর চৌধুরী,খাগড়াছড়ি

অরণ্য আর পাহাড় বেষ্টিত পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ি। ভূ-প্রাকৃতিক কারণে ভিন্নরূপ রয়েছে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থায়। এখানকার অধিকাংশ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ ধরে। পাহাড় ধ্বসসহ নানা কারণে পাহাড়ি সড়কের ভোগান্তিও রয়েছে বেশ। একটা সময় বিভিন্ন স্থানে ছিল বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বেইলী ব্রিজ। পার্বত্যাঞ্চলে ৭০-৮০ দশকে নির্মিত বেইলী ব্রিজগুলো সড়কের আতংক হিসিবে পরিচিত। পাহাড়ি ছড়া বা নদীর উপর নির্মিত এসব বেইলী ব্রিজ ভেঙে প্রায় সময় ঘটতো দুর্ঘটনা। আর বেইলী ব্রিজ দুর্ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ঘটনাও ঘটেছে অনেক। বর্ষায় বেইলী ব্রিজের ভোগান্তি ছিল দ্বিগুণ। এসব পুরনো লক্কর ঝক্কর বেইলী ব্রিজ নিয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘবে খাগড়াছড়ি বাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সরকারের কাছে।

দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এবার স্বপ্নপুরনের পালা। বর্তমান কারের আন্তরিকতায়, ওইসব বেইলী ব্রিজ গুলো ভেঙ্গে পাকা সেতু নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ী জনপদ খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঝুঁকিমুক্ত করতে, বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে একাধিক সড়কে বেইলী ব্রিজের জায়গায় নির্মিত হচ্ছে পাকা সেতু। এতে সড়কে যাতায়াতকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পাকা সেতুতে যান চলাচল করছে। সড়কে দৃশ্যমান উন্নয়নে দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদ। স্বস্তি ফিরেছে পার্বত্যবাসীদের মাঝে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়,সরকারের অর্থায়নে বেইলি ব্রিজের স্থলে পাকা সেতু নির্মিত হওয়ায় দীর্ঘ কয়েক দশকের ভোগান্তি কমেছে।

খাগড়াছড়ি থেকে প্রায় ৩৩ কিলেমিটার দূরে জালিয়াপাড়া থেকে সিন্ধুকছড়ি হয়ে মহালছড়ি পর্যন্ত সংযোগ সড়ক প্রায় ২৪ কি.মি দীর্ঘ সড়কের উন্নয়ন কাজ চলছে। এই সড়কে বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে পাকা সেতু নির্মিত হয়েছে। এই পথে চলাচলকারী চালকরা জানান, সড়ক যোগাযোগে বেইলী ব্রিজ ছিল ভোগান্তির মূল কারণ। সড়কে যাতায়াতে এটি ছিল প্রধান বাধা। একবার বেইলী ব্রিজ ভাঙলে সংস্কারে দীর্ঘদিন সময় লাগত। কিন্তু বর্তমানে অবস্থা পাল্টেছে। দীর্ঘদিন পর হলেও পাকা সেতু নির্মিত হওয়ায় বর্তমানে সড়ক যোগাযোগ নিরাপদ হয়েছে।কলেজ ও স্কুল পড়ুয়া কয়েকজন যুবক জানান, সিন্ধুকছড়ি বাজার থেকে জালিয়াপাড়া যেতে এই সড়কটি একমাত্র যোগাযোগের পথ। সড়কের একাধিক স্থানে বেইলী ব্রিজে পারাপার হতে হত। নড়বড়ে এসব ব্রিজে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটত। এই সড়কে বিভিন্ন স্থানে বেইলী ব্রিজের জায়গায় পাকা সেতু নির্মিত হয়েছে।

কেবল জালিয়াপাড়া কিংবা সিন্ধুকছড়ি সড়কেই নয় পাকা সেতু নির্মাণের কাজ চলছে জালিয়াপাড়া রামগড় সড়কেও। রাজধানী ঢাকার সাথে খাগড়াছড়ি জেলার যোগাযোগের জন্য এটি একমাত্র সড়ক। প্রতিদিন যাত্রীবাহী যানবাহনের পাশাপাশি শত শত মালবাহী ট্রাকসহ নানা যানবাহন এই পথে যাতায়াত করে। অতীতে একাধিকবার এই সড়কে বেইলী ব্রিজ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। মালবাহী ট্রাকের চালক মোঃ কামাল হোসেন বলেন, ‘এই সড়কে গাড়ি চালাচ্ছি প্রায় ১৫ বছর। সড়কের একাধিক স্থানে ছড়ার উপর থাকা বেইলি ব্রিজ এরকম আতংক ছিল। বিশেষত মাল বোঝাই অবস্থায় চলাচল করতে গেলেই ব্রিজে পাটাতন খুলে গিয়ে কিংবা ব্রিজের রেলিং ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটত। তিনি জানান, দীর্ঘদিন পর হলেও সরকার এসব ঝুঁকিপূর্ন স্থানে পাকা সেতু নির্মাণ করায় আতংক দূর হয়েছে।

সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) এর অর্থায়নে সড়ক উন্নয়ন ও ব্রিজ গুলোর নির্মাণ কাজ করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এস অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা-মেসার্স সেলিম এন্ড ব্রাদার্স (জেভি)। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী এস অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা ও মো. সেলিম জানান, পাহাড়ি এলাকায় কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ন। করোনা পরিস্থিতি এবং ভারি বৃষ্টির কারণে কাজের কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। তবে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতেও নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। এই অর্থ বছরে মেয়াদের মধ্যেই নির্মাণ কাজ শেষ হবে।

খাগড়াছড়ি সড়ক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) সবুজ চাকমা বলেন, উন্নয়ন খাতে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন সড়কে পিসি গার্ডার সেতু, আর.সি.সি. সেতা এবং আর.সি.সি বক্স কালভার্ট নির্মান প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২শ ১৪ কোটি ৪৭ লাখ ব্যয়ে, ৭টি প্যাকেজে ৪৩টি ব্রিজ ও ১৩টি কালভার্ট নির্মান কাজ শেষ পর্যায়। ৯৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে জালিয়াপাড়া থেকে সিন্ধুকছড়ি হয়ে মহালছড়ি পর্যন্ত সংযোগ সড়ক প্রায় ২৪ কি.মি দীর্ঘ সড়কের উন্নয়ন কাজ চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহীনি। এছাড়া অনুন্নয়ন খাতে, ২০১৯/২০২০ অর্থবছরে ৭৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২টি প্যাকেজের মাধ্যমে ৪৯ কিলোমিটার পি.এম.পি (সড়ক) মেরামত কাজ চলমান।

খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর ছড়া এবং নদী রয়েছে। আশি বা নব্বই দশকে এসব ছড়া বা নদীর ওপর নির্মিত হয় একাধীক বেইলি ব্রিজ। ঝুঁকিপূর্ন প্রায় সবকটি বেইলি ব্রিজ ভেঙে নতুন করে পাকা সেতু এবং কালভার্ট নির্মান করা হচ্ছে। এখনো ১০টির মত বেইলি ব্রিজ রয়েছে। সেগুলিও ভেঙে স্থায়ী সেতু নির্মান প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রতিটি সড়ক ১২ ফুট থেকে ১৮ ফুটে প্রশস্ত করণ এবং সড়ক টেকসই করতে মজবুত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গ্রহণে বর্তমান সরকারের নির্দেশনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতায়, জেলা সড়ক উন্নয়ন নামে ১টি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রায় ৫শ কোটি টাকার (জোনাল ডিপিপি) প্রকল্পটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনে প্রক্রিয়াধীন। প্রকল্পটির অনুমোদন হলে পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজার জাতে সুবিধা হবে এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান আরো উন্নত হবে”।

খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় প্রায় ৪’শ কিলোমিটার সড়কে ৭৬টি বেইলি ব্রিজ ছিল। কিন্ত সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় জনগুরর্ত্বপূর্ণ স্থানে এখন পাকা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে পাহাড়ি সড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুরক্ষিত এবং এই জেলা বাসীর দুর্ভোগ লাঘব হবে। “জোনাল ডিপিপি প্রকল্পটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন দিলে, সড়ক উন্নয়নে আরো বেশি দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠবে খাগড়াছড়ির প্রতিটি পাহাড়ি জনপদ”। জেলা বাসীর এমনটাই অভিমত।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply