বাংলাদেশ, বুধবার, ২৭শে মে, ২০২০ ইং, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ট্রাজেডী : ’৯১ উনত্রিশে এপ্রিল স্মরণে

মাহমুদুল হক আনসারী

উনত্রিশে এপ্রিল ১৯৯১ সাল সেদিন বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপর দিয়ে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক তান্ডবলীলা পারিচালিত হয়েছিল। বাঁশখালী, আনোয়ারা, চকরিয়া, কুতুবদিয়া মহেশখালী, কক্সবাজারের উপর দিয়ে যে টর্নেডো বয়ে গিয়েছিল তার ফলে উক্ত অঞ্চলের শতশত মানুষ মৃত্যু বরণ করেছিল। অসংখ্যা ঘরবাড়ি, ফসলী জমি, লবণ শিল্প, মাছের ঘের, সবুজ বাগান, ধ্বংস লীলায় পরিণত হয়েছিল। একেক পরিবারের সাত থেকে দশ জন পর্যšত নারী-পুরুষ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। কারো পরিবারে সকলেই পানিতে ভেসে না পাওয়ার স্থানে চলে গেছে।লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। ২৮ এপ্রিল রাতেসংঘঠিত এ তান্ডবলীলায় ২৯ এপ্রিল ভোরে দেখা যায় এ এলাকায় ঘর বাড়ি,খালবিল একাকার হয়ে গেছে। ঘূর্নিঝড়ের পূর্বাভাসে যারাসাইক্লোন সেল্টারে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষ আত্মীয় স্বজনরাদেখে ঘর বাড়ি, পশু পাখি, বিলীন হয়ে গেছে। স্বজনদের আহজারীতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। আকাশে বাতাসে লাশের গন্ধ, পথে ঘাটে পানিতে“আশরাফুল মাখলুক” সৃষ্টির সেরা জীবের লাশ পড়ে আছে। মানব দেহের পরিচয়পাওয়া যাচ্ছিল না। শত শত মানুষ ক্ষত বিক্ষত ভাবে লাশ হয়ে খালে বিলে পড়েআছে। লাশ দাফন করার মত শুকনো কবরস্থান ও পাওয়া তখন কঠিন। ঐ অঞ্চলে দুর পাল্লা­র স্থানীয় যাতায়াত তখন বন্ধ, রাস্তা ঘাট ক্ষত বিক্ষত, মানব চিহ্ন বাড়ী ঘর বলতে কিছুই নাই। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মানুষ গুলোর অবস্থা আরো করুণ। খাদ্য পানির অভাবে এক হাহাকার অবস্থার দৃশ্য। মানবতাবাদী মানুষদের
বিচলিত করেছিল। তখন এ খবর রেডিও, টেলিভিশনে, দৈনিক পত্রিকা সমূহে ব্যাপক প্রচারের কারণে এ দুনিয়া ব্যাপী ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
দেশ বিদেশ হতে এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার পরিজনের সাহায্যে এগিয়েআসতে থাকে। সরকার সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, এনজিও
সংগঠনের ক্ষত বিক্ষত এলাকার ঘর বাড়ি,স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির সংস্কারে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। মানুষ তাদের ঘর বাড়ি আবার সংস্কারের উদ্দোগ গ্রহণ করে। সরকারী বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহযোগিতা চলতে থাকে। মানুষ আবার তাদের ভিটাবাড়ীতে ঘরবাড়ী তৈরী করে বসবাস করার সংগ্রামে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ফিরে যেতে চায় তাদের পূর্বের জীবনে। আবার তারা তাদের ব্যবসা বানিজ্য,
চাষাবাদ কর্মজীবন চাঞ্চল্য করে নতুন জীবন আশা করে। তাদের কর্ম যুদ্ধে সহযোগী হিসেবে অসংখ্যা মানবতাবাদী সংগঠন তাদের সহযোগিতায়
এগিয়ে আসে। ফলে তাদের জীবনে ফিরে আসে কিছুটা স্বস্হি। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ পরিবার নিয়ে জীবন যুদ্ধে মেতে উঠে। অসংখ্য স্বজন হারানো
বুকফাটা ব্যাথা বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ গুলো আজকের দিন আসলেই তাদের বুক ফাটা কান্নার আহাজারী এখানো কাঁনে আসে।তাদের আহাজারীতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যায় তখন। স্বজনদের হারিয়ে অনেকই সংজ্ঞাহীন, বাঁকহীন হয়ে নীরব নিথর হয়ে থাকতে দেখা যায়। বছর
ঘুরে ২৯ এপ্রিল আসলে স্মৃতিতে ঐ টর্নেডোর কথা মনে পড়লে এলাকায় এক হৃদয় বিদারক অবস্থার তৈরী হয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এখনো
অরক্ষিত, লবণ, মৎস শিল্পের এ এলাকা সমূহের মানুষগুলো ভাল নেই। তাদের জীবনমান উন্নয়নে রাস্ট্রের যেভাবে কর্মসূচী থাকার কথা ছিল তা এখনো করা হয়নি। উপকূল এলাকার বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ পরিবার পরিজনের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছেনা। এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ আশ্রয় কেন্দ্র নেই।যাতায়াত ব্যবস্থা এখনো অনুন্নত, গ্রামীন অবকাঠামোর উন্নয়নে উপকূলের হাজার হাজার মানুষের রুটি রুজির সঠিক কর্মসূচী বাস্তবায়ন থাকা চাই।তাদের আয় রোজগার যাতায়াত, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদার দাবী পূরণ করা চাই। এ অঞ্চলের শিক্ষা, দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা জন গোষ্ঠীকে আরো এগিয়ে আনার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হবে। খাল-বিল, পাহাড়, পর্বত সংরক্ষণ করতে হবে। ঐতিহাসিক স্থাপনা সমূহ সংরক্ষনের ব্যাবস্থা থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে গ্রাম বাঁচলেই শহর থাকবে, নদী খাল বিল নিয়ে বাংলাদেশ, নদী, খাল বিল, আমাদের রক্ষা করতে হবে। এ খালবিল রক্ষা হলে উপকূলীয় হাজার হাজার অনগ্রসর মানুষদের সুখ দু:খের অংশীদার আমাদের হতে হবে। তাদের উন্নয়নে সমাজ পরিচালকদের দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ব পালন করে ওই সকল উপকূলীয় অরক্ষিত মানুষের রক্ষায় সঠিক পরিকল্পনার
ভিত্তিতে দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসূচী বাস্তাবয়ন করতে হবে। তাদের পরিশ্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। একই ভাবে তাদের সুখ দু:খ ভালবাসায় রাস্ট্রকে
সঠিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূল ও তার মানুষ যেন সু-রক্ষায় থাকে তাই আমাদের চিন্তা করে
সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবেই এদিনের ভয়াবহ বুকফাটা কান্না আহাজারী কিছুটা হলেও থামতে পারে। ওই দিনের নিহত সকল প্রাণ ও আত্মার শান্তি
কামনা করে তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানিয়ে সকলের সুখ শান্তি
প্রত্যাশা করছি।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply