আইনগত পরামর্শ, বিনা খরচে আইনজীবী নিয়োগ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের উদ্যোগ
আসাদুল ইসলাম
______
অর্থের অভাবে যেন কোনো মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। আর্থিকভাবে অসচ্ছল, অসহায় ও বিভিন্ন আর্থসামাজিক কারণে বিচারপ্রাপ্তিতে অসমর্থ মানুষের জন্য বিনামূল্যে আইনগত পরামর্শ, মামলা পরিচালনায় আইনজীবী নিয়োগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার সুযোগ রয়েছে এ দপ্তরে। তবে সেবার ধরন ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।
চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের পিএ মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম পূর্ববাংলা প্রতিবেদককে বলেন, “আইনগত সহায়তা মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করে। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ যেন তাঁর আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যেই সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি জানান, লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে প্রধানত তিন ধরনের সেবা দেওয়া হয়। প্রথমত, বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে বিনামূল্যে পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ। দ্বিতীয়ত, বিরোধের ধরন ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরের মাধ্যমে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ। তৃতীয়ত, নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী বিচারপ্রার্থীদের আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য সরকারি খরচে প্যানেল আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা।
তবে বিনামূল্যে আইনগত পরামর্শ এবং সরকারি খরচে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগের যোগ্যতা এক নয়। বিশেষ করে প্যানেল আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা ও প্রযোজ্য আইনগত শর্ত বিবেচনা করা হয়।
আইনগত সহায়তায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের সাংবিধানিক নীতিকে বাস্তবে কার্যকর করার লক্ষ্যে ২০০০ সালে প্রণীত হয় ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’। এ আইনের আওতায় সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম বলেন, লিগ্যাল এইডের উদ্দেশ্য শুধু অসচ্ছল মানুষের পক্ষে মামলা পরিচালনা করা নয়; বরং বিরোধের ধরন অনুযায়ী দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের পথ তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে আপস-মীমাংসা সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমানো যায়।
আপস-মীমাংসায় গুরুত্ব, সমাধান না হলে আইনি সহায়তা
আদালতে মামলা দায়েরের আগেই উপযুক্ত বিরোধ মধ্যস্থতা বা আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হলে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ভোগান্তি কমতে পারে। একই সঙ্গে আদালতের মামলাজট কমাতেও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব ধরনের বিরোধ আপসযোগ্য নয়। সমঝোতা সম্ভব না হলে কিংবা বিরোধের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজন হলে আইনগত প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
আবেদনের চাপ, জনবল সংকটে সেবা দিতে হিমশিম
চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে সেবা প্রত্যাশীদের আবেদনের চাপ বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অফিসটির পিএ মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম।
পূর্ব বাংলা প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “প্রতি মাসে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০টি আবেদন জমা পড়ে। সে হিসাবে বছরে আবেদনের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার। এত বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর সেবা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের জনবল পর্যাপ্ত নয়। সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রত্যেককে দ্রুত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার যদি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। এর ফলে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত আইনি সহায়তা পাবেন এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিসহ কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে আদালতের মামলাজট কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করি।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়াতে পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে একদিকে যেমন সেবাপ্রার্থীদের অপেক্ষার সময় কমতে পারে, অন্যদিকে তেমনি যোগ্য বিচারপ্রার্থীদের আইনি সহায়তা পাওয়ার পথও আরও সহজ হতে পারে।
কর্মঘণ্টার পরও অফিসের কাজে ব্যস্ত
বিকেল ৫টার পরও চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে দাপ্তরিক কাজ সামলাতে দেখা যায় পিএ মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলামকে। সেবাপ্রার্থীদের আবেদনের চাপ ও সীমিত জনবলের মধ্যে দায়িত্ব পালনে তাঁর এ ব্যস্ততা অফিসটির দৈনন্দিন কর্মচাপের চিত্র তুলে ধরে। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পাচ্ছে।
লিগ্যাল এইড অফিসে সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে পারিবারিক বিরোধ ও জমিজমাসংক্রান্ত সমস্যার মতো বিভিন্ন বিষয় সামনে এসেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের কাছে আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের গুরুত্ব কতটা।
শাশুড়ির অভিযোগের পর লিগ্যাল এইডের দ্বারস্থ পুত্রবধূ
হাটহাজারীর চারিয়া এলাকার এক নারী, যিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি, পারিবারিক বিরোধের জেরে আইনগত সহায়তা চেয়ে লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করেছেন। তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকেন। ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে চলে আসার প্রায় এক মাস পর তাঁর শাশুড়ি হাটহাজারী থানায় অভিযোগ করেন, তিনি ১২ ভরি স্বর্ণ ও এক লাখ টাকা নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে গেছেন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি আইনি সহায়তার জন্য লিগ্যাল এইড অফিসের দ্বারস্থ হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে সুব্রত দাশ, চীফ লিগ্যাল এইড অফিসার(বিচারক), উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেন। চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের পিএ মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম বিচারক সুব্রত দাশের নির্দেশে তিনিও বসে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। পরে ওই নারীর পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য প্যানেল আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।
এ ঘটনা থেকে দেখা যায়, আপস-মীমাংসার উদ্যোগ সফল না হলেও যোগ্য বিচারপ্রার্থীর জন্য আইনগত সহায়তার বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া।
জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে অসহায় হিন্দু পরিবারের আবেদন
অন্যদিকে, বাঁশখালীর এক হিন্দু পরিবারের নারী সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের জমি একটি প্রভাবশালী পক্ষ জোরপূর্বক দখলে রেখেছে বলে তাঁরা অভিযোগ করছেন। অসহায় অবস্থায় ন্যায়বিচারের আশায় তাঁরা চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করেছেন। জমির অধিকার ফিরে পেতে তাঁরা আইনগত সহায়তার মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সাধারণ মানুষের জন্য সেবার সুযোগ
লিগ্যাল এইডের সহায়তা নিতে আগ্রহী ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করে নিজেদের সমস্যার বিবরণ দিতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী আবেদনপত্র, পরিচয়পত্র, আর্থিক অসচ্ছলতার প্রমাণ এবং বিরোধসংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে। আবেদন যাচাইয়ের পর প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী আইনগত পরামর্শ, প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ কিংবা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সামগ্রিকভাবে, চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো যোগ্য ও অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা, ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সহজ করা এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধের দ্রুত সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে ক্ষেত্রে সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সর্বশেষ সংবাদ
- লিগ্যাল নোটিশ
- আমাদের ৫০ বছরের কাজের স্বীকৃতি হলো হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড
- চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বিনামূল্যে আইনি সেবা: অর্থাভাবে যেন বিচারবঞ্চিত না হন কেউ, গুরুত্ব পাচ্ছে আপস-মীমাংসা
- বারবার সতর্কতার পরও উপেক্ষা, এবার ৪০ লাখ টাকা জরিমানা,ইবনে সিনার বিরুদ্ধে চউকের কঠোর ব্যবস্থা
- চট্টগ্রামের কিংবদন্তী সাংবাদিক এস.এম. জামাল উদ্দিন ও লেখক জামাল উদ্দিন এর পরস্পর সৌজন্য সাক্ষাৎ
- ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিরুদ্ধে সিডিএর অভিযান অব্যাহত, ৩ ভবন সিলগালা, ৫ ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন
- চোলাই মদসহ বিভিন্ন মামলায় ডবলমুরিং- এ গ্রেপ্তার ২৭ জন
- দিল্লিতে মমতা ব্যানার্জি আটক
- চট্টগ্রামে দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক চালু
- রোহিঙ্গা সংকট ও সমাধান, কোন পথে ?



