বিশেষ প্রতিনিধি
সম্প্রতি শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরোদেশকে গভীর ভাবে আলোড়িত করেছে।কিন্তু এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীর অবধি বিস্তৃত। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে, মাত্র পাঁচ মাসে সারাদেশে মোট ২৩৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন দুইজন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (ASK) ডকুমেন্টেশন ইউনিটের সংকলিত তথ্যে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে:
ASK-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়টি সবচেয়ে উদ্বেগজনক তা হলো ভুক্তভোগীদের বয়সের হিসাব। ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছে এ বয়সী শিশুর সংখ্যা ৬০, যা মোট ঘটনার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ৬ বছরের কম বয়সী শিশু ভুক্তভোগীর সংখ্যা ২৭। অর্থাৎ, মোট ২৩৯ জনের মধ্যে ৮৭ জনই প্রায় ৩৬ শতাংশ ১২ বছর বা তার কম বয়সী।
১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ৩৪। অর্থাৎ, ১৮ বছরের নিচে ভুক্তভোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১২১ মোট ঘটনার অর্ধেকেরও বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের সংকট মূলত একটি শৈশব-সংকট।
গণধর্ষণ ও মৃত্যু:
মোট ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ৬৮টি গণধর্ষণ। এই ৬৮টি মামলার মধ্যে ৫৪টিতে মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে, ১৪টি ঘটনায় মামলা হয়েছে কিনা তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একক ধর্ষণের ঘটনা ১৭১টি, যার মধ্যে ১৩৮টিতে মামলা হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২৩টি এর মধ্যে শিশু ৪ জন, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ১০ জন। ধর্ষণের চেষ্টার পর হত্যার ঘটনাও ঘটেছে ৩টি। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটির পেছনে একটি পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প।
পথেঘাটে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা:
ASK-এর যৌন হয়রানি (স্টকার কর্তৃক) সংক্রান্ত আলাদা তথ্যচিত্রে দেখা যাচ্ছে, একই পাঁচ মাসে মোট ৭৭ জন এই ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬০ জনই নারী।
পিছুনেওয়ালার হামলায় সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৬ জন নারী। আহত হয়েছেন আরও ১৪ জন, যাদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ সম্ভবত প্রতিবাদ করতে গিয়ে বা পরিচিত হওয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন ৪ জন পুরুষ, যৌন হয়রানির পর নিহত হয়েছেন একজন নারী ও একজন পুরুষ।
একজন নারী যৌন হয়রানির কারণে আত্মহত্যা করেছেন বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই তথ্যটি বিচ্ছিন্ন নয়; ধর্ষণের তালিকায়ও দুজনের আত্মহত্যার কথা আছে। যৌন নির্যাতনের পর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে মানুষ মৃত্যুকে বেছে নিচ্ছেন এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি গভীর প্রশ্নচিহ্ন।
সব অপরাধের মামলা হয় না:
ধর্ষণের ২৩৯টি ঘটনার মধ্যে ১৯২টিতে মামলা হয়েছে এই হার আশাব্যঞ্জক মনে হলেও ৪৫টি ঘটনায় মামলা হয়েছে কিনা তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার সামাজিক লজ্জা, প্রতিশোধের ভয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মুখ খুলতে সাহস পান না। ধর্ষণের চেষ্টার ৮৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ৫৪টিতে মামলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলা দায়েরের সংখ্যা দিয়ে বিচার পাওয়ার হার পরিমাপ করা যায় না। দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ততদিনে সাক্ষী সরে যান, ভুক্তভোগী পরিবার চাপে পড়েন, আসামিপক্ষ মীমাংসার প্রস্তাব দেয়।
প্রতিকার নয় প্রতিরোধই শ্রেয়:
নৈতিক অবনতির ফলে এই দেশে sexual Violence জনিত অপরাধ এর মাত্রা অনেক বেশি। বিশেষ করে সর্বত্র সার্ভিলেন্স এবং নিরাপত্তা জনিত কারনেও দেশে এইসব অপরাধ হয়ে চলেছে। বিগত বছর এর সাথেই তুলনা করলে অবস্থার উন্নতি নয় বরং অবনতি ঘটেছে। যার জন্য মানুষের মাঝে অসহায়ত্ব ও উদ্বেগ এর গভীর ছাপ স্পষ্ট প্রতীয়মান। তাই অতি শীঘ্রই কোনো প্রতিরোধমূলক জরুরি পদক্ষেপ নেয়া না হলে পরিস্থিতি বছর এর পর বছর এইভাবে বহাল থাকবে তা শুধু নয় বরং বেড়ে চলবে, হবে ভয়াবহ করুণ দশা। ।



