৯মাসে আয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি  ব্যয় ২ হাজার ৮৭০ কোটি

 

 চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং অন্যান্য খাত থেকে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ আয়ের বিপরীতে সংস্থাটি ব্যয় করেছে ২ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা।

ট্রেন পরিচালন, ইঞ্জিন-কোচ (রোলিংস্টক) মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খাতে এ পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে রেলওয়ে। আয় ও ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অর্থবছরের নয় মাসে রেল সাকল্যে লোকসান করেছে ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। প্রতি ১ টাকা আয় করতে সংস্থাটিকে ব্যয় করতে হয়েছে ১ টাকা ৮৬ পয়সা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে ৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকৃত আয়ে অনেক পিছিয়ে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরও বড় লোকসানের পথে হাঁটছে রেল।

ধারাবাহিক লোকসানের পাশাপাশি রেলের যাত্রীসেবার মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ট্রেনে-স্টেশনে অপরিচ্ছন্নতা, সময়সূচিতে হেরফের, টিকিট কালোবাজারি, আসনবিহীন ও টিকিটবিহীন যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, খাবারের বাড়তি দামসহ ব্যবস্থাপনাগত বিভিন্ন ইস্যু এবং চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন-বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, ইঞ্জিন বিকল, ঘন ঘন লাইনচ্যুতির মতো কারিগরি বিষয়গুলোও যাত্রী ভোগান্তির কারণ হচ্ছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই রেল লোকসান দিয়ে আসছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলের উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ হলেও তা যথাযথভাবে হয়নি। এ কারণে বড় বিনিয়োগের পরও লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না সংস্থাটি।

রেলে বিগত সরকারের করা বিনিয়োগ যথাযথ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের আয় ও ব্যয়ের যে তথ্য আমরা পাচ্ছি, তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট যে বিগত সময়ে রেলে হওয়া বিনিয়োগ খুব একটা কাজে লাগেনি। নতুন নতুন রেলপথ, স্টেশন বানানো হয়েছে। এসব রেলপথ ও স্টেশন পরিচালনার জন্য ব্যয় হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পর্যাপ্তসংখ্যক ট্রেন চলছে না। যেখানে রেলের আয়ের সিংহভাগই আসে যাত্রী পরিবহন থেকে, সেখানে ট্রেন বাড়াতে না পারলে রাজস্ব আয় কোনোদিনই বাড়বে না। ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পর রেলের ইঞ্জিনের সংকট, কোচের সংকট দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে যে ভুল ছিল, তা কোচ-ইঞ্জিনের এ সংকটের চিত্র থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়।’

রেলের উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুধু যাত্রী পরিবহন করে রেলের আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। কাঙ্ক্ষিত আয়ের জন্য পণ্য পরিবহনে সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশজুড়ে রেলের বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে, যার একটা বড় অংশ আবার বেদখলে। এসব জমি দখলমুক্ত করে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা রেলের রাজস্ব আয় বাড়াতে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে।’

চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ১ টাকা আয়ের বিপরীতে ১ টাকা ৮৬ পয়সা ব্যয় হলেও বিগত সময়ের তুলনায় আয়-ব্যয়ের অনুপাত অনেকটা কমে এসেছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিগত বছরে আমরা বিভিন্ন উপলক্ষে কিছু বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করেছি। ঈদে-উৎসবের সময় বাড়তি ট্রেনে বাড়তি কোচ সংযোজন করেছি। ঢাকা-সিলেট রুটের পারাবত, কালশী এক্সপ্রেসের মতো যেসব ট্রেনে যাত্রীর চাহিদা বেশি, সেসব ট্রেনে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়িয়েছি। এর বাইরে পূর্বাঞ্চলের বেশকিছু সেতুতে পন্টেজ চার্জ আরোপ করায় এ অঞ্চলে আমাদের আয় উল্লেখযোগ্য বেড়েছে।’

চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে পূর্বাঞ্চল রেল ভালো করলেও আয়ে পিছিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল। এ সময়ে পূর্বাঞ্চল রেল আয় করেছে ৭৫৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পশ্চিমাঞ্চল রেল থেকে আয় হয়েছে ৪৩২ কোটি টাকা।

পশ্চিমাঞ্চল রেলে আয় কমে যাওয়ার পেছনে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন বন্ধ থাকাকে দায়ী করেছেন রেলের মহা পরিচালক। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমাঞ্চল থেকে মূলত পণ্য পরিবহন খাত থেকে আয় কমেছে। দেড় বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। আগে ভারত থেকে যেখানে প্রতি মাসে ৭০-৯০টা পর্যন্ত ট্রেন আসত, সেখানে বর্তমানে এ সংখ্যা ২৫-৩০-এ নেমে গেছে। পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলের আয়ে।’

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ