গত ১৭ মাসে সারাদেশে মবের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৮০ জন। অতীতে থাকলেও সর্বশেষ দেড় বছরে মব সন্ত্রাসে নিহত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে কয়েক গুণ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ব্যক্তিগত কারণে ঘটেছে এসব ঘটনা। সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো গণমাধ্যম, ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানও আক্রান্ত হয়েছে। এ সবের হাত থেকে রেহাই পাননি বাউল, নিরীহ মানুষ, শারীরিক প্রতিবন্ধীও।
সরকারের পক্ষ থেকে মব সন্ত্রাসের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি থাকলেও ঠেকানো যায়নি এ অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মব ঠেকাতে উদ্যোগ নিলেও খুব বেশি কার্যকর হয়নি মাঠপর্যায়ে।
পুলিশের কঠোর ও সতর্কতার পরেও মব সৃষ্টি করে বেশকিছু নৃশংসতম অপরাধ সংঘটনের ঘটনা দেখা যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে মব সন্ত্রাসে ২৮০ জন নিহত হয়েছে। এসবঅপরাধ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে বক্তব্যও দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা।
কোনো ঘটনার পূর্বাপর না ভেবে এক শ্রেণির জনতা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে করণীয় কী। কখনো না বুঝেই ছুটছে ঘটনার পেছনে। আইন তুলে নিচ্ছে নিজেদের হাতে। যার ফলাফল হত্যা, হেনস্তা কিংবা লাঞ্ছনা। সংক্ষেপে যাকে বলা হচ্ছে ‘মবসন্ত্রাস’। কখনো উচ্ছৃঙ্খল জনতা, কখনো তৌহিদি জনতার নামে সংঘটিত হচ্ছে এ অপরাধ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আ.লীগ সরকার পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্বের প্রথম পাঁচ মাসে মবের শিকার হয়ে নিহত হন ৯৬ জন। সরকারের ১৭ মাসে (২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) মবের শিকার হয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে ২৮০ জনকে। ২০২৪ সালের আগস্টে মবের শিকার হয়ে নিহত হন ২১, সেপ্টেম্বরে ২৮, অক্টোবরে ১৯, নভেম্বরে ১৪ ও ডিসেম্বরে ১৪ জন।
দেশের আইন অনুযায়ী, অপরাধী হলেও ব্যক্তিকে মারধর বা পিটিয়ে হত্যার সুযোগ নেই। যারা আইন হাতে তুলে নেবেন, তারাও অপরাধী। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পিটিয়ে মানুষ হত্যায় অনেক ক্ষেত্রে জড়িতদের ধরতে পুলিশের তৎপরতা কম। সরকার মৌখিকভাবে কঠোর অবস্থান নিলেও মাঠপর্যায়ে তা ঠেকাতে পারছে না।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত বছরের আগস্টে বলেন, সরকারের দুটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে মব সন্ত্রাস ও ঢালাও মামলা। মব সন্ত্রাস দমন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, পুলিশ মোরাল ছিল না। যে পুলিশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিপক্ষ ছিল, সেই পুলিশ যখন দেখে গণঅভ্যুত্থানের দাবিদার বলে কিছু মহল মব করছে, তখন সেটা দমন করতে পারেনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত বৈশ্বিক ঘোষণা অনুযায়ী, মব-সহিংসতার কারণে মানবাধিকারের বড় লঙ্ঘন হয়। ঘোষণার ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের অধীনে সবার সমতার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
২০২৫ সালের ৪ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মবের প্রতিটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে সরকার বদ্ধপরিকর। কেউ যাতে আইন নিজ হাতে তুলে না নেয়, সে জন্য সবাইকে সতর্ক করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা সংঘটনের পরপরই জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ায় বা প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় অপরাধীদের শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগে। তবে এসব কারণে কোনো ঘটনাই তদন্তের আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে না।
২০২৫ সালের ১৭ জুলাই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের গুলশানের বাসায় মব সৃষ্টি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় সদস্য আবদুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান ওরফে রিয়াদসহ কয়েকজন এ টাকা নিয়ে দ্বিতীয় দফায় আরও ৫০ লাখ চাঁদা আনতে গেলে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়াও মোহাম্মদপুর এলাকার পরিস্থিতি বেশি খারাপ ছিল। সেখান বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে লুটপাটের অভিযোগও আছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীসময়ে আইন হাতে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ আক্রমণ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে, যা এ পর্যন্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এমন ঘটনা সবশেষ ঘটে রংপুরের তারাগঞ্জে। ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট সেখানে ভ্যানচোর সন্দেহে দুই নিরপরাধ রূপলাল দাস ও প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক প্রদীপ লাল গুপিটুনিতে নিহত হন। হত্যার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ গেলেও মবের ভয়ে তাদের উদ্ধার না করে ফিরে যায়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মব সহিংসতায় অন্তত ১৮৪ জন নিহত হন। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৭৮ ও চট্টগ্রামে নিহত হন ৩২ জন। এছাড়া ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মব সন্ত্রাসের কারণে নিহত হন ১৬. ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন, মার্চে ২০, এপ্রিলে ১৮. মে মাসে ১৩, জুনে ১১. জুলাই মাসে মব সন্ত্রাসের কারণে নিহত হন ১৪, আগস্টে ২১. সেপ্টেম্বরে ২৮, অক্টোবরে ১৩ ও নভেম্বরে মব সন্ত্রাসের কারণে নিহত হন ১৯ জন। নিহতদের মধ্যে ঢাকার বেশি।
আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করা জরুরি। একই সঙ্গে এ আইনি প্রক্রিয়ায় যেন অযথা দীর্ঘসূত্রতা না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা জানিয়েছেন ৬১ শতাংশ মানুষ, যাদের মধ্যে পুরুষ ৫৬ আর ৬৬ শতাংশ নারী। পোশাকের জন্য রাস্তাঘাটে হয়রানি নিয়ে উৎকণ্ঠিত ৬৭শতাংশ মানুষ। তাদের ৬৩ শতাংশ পুরুষ আর ৭১ শতাংশ নারী।
২০২৫ সালে তৌহিদি জনতার নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এমনকি কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধমতের মানুষকে নানাভাবে হেনস্তা করার ঘটনাও ঘটেছে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানট ভবনে একই দিনে হামলা চালিয়ে আগুন দেয় তৌহিদি জনতা। কারওয়ান বাজারে হেনস্তার শিকার হন সিনিয়র সাংবাদিক নূরুল কবীর। এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষিক্রয়তা ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা যায়।
বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়া পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। মব সৃষ্টি করে তাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহের ভালুকায়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পোশাক কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে (২৭) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসময় কারখানার সামনে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেয় লোকজন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাউল, মরমি শিল্পী, লোকসংগীতশিল্পী, মঞ্চ ও যাত্রাশিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মীদের ওপরও ধারাবাহিক হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বাউলদের ওপর হামলার পাশাপাশি মাজার ভাঙার অনেক ঘটনাও ঘটেছে।
২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় তসলিমা বেগম রেণু নামে এক নারী হত্যার ঘটনা নিশ্চয় মানুষ এখনো ভোলেনি। ২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবেবরাতের রাতে ঢাকার অদূরে সাভারের আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
এছাড়া ২০১১ সালের ২৭ জুলাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কাঁকড়া এলাকায় ডাকাত সাজিয়ে কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও এখনো নাড়া দেয়।
ইউটিউবার হিরো আলম ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই ঢাকা ১৭ আসনের উপ-নির্বাচনের সময় হামলার শিকার হন। সুত্র বাংলাদেশ বুলেটিন

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ