বিশ্বে এ পর্যন্ত জানাজা বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে ১৯৬৯ সালে ভারতের মাদ্রাজ রাজ্যের (বর্তমান তামিলনাড়ু) মুখ্যমন্ত্রী সি. এন. আন্নাদুরাইয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। পুলিশি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়, প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এতে অংশ নিয়েছিল। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এটিকে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমাবেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ১৯৮৯ সালে  ইরানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজা। তাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ এবং যা সর্বোচ্চ আনুপাতিক উপস্থিতির রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত। ১৮৫২ সালের ১৮ই নভেম্বর লন্ডনে আর্থার ওয়েলেসলি, প্রথম ডিউক অব ওয়েলিংটনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রায় ১৫ লাখ দর্শক শোভাযাত্রার পথে সমবেত হয় হরস গার্ডস প্যারেড থেকে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল পর্যন্ত। সমকালীন পর্যবেক্ষক ও পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, টানা বৃষ্টির মধ্যেও ঘন জনসমাগম রাস্তার দু’পাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এই উপস্থিতি ওয়াটারলু যুুদ্ধে (১৮১৫) নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ওয়েলিংটনের বিজয়ের প্রতি জনগণের গভীর শ্রদ্ধাবোধকে প্রতিফলিত করে।

১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের হত্যাকাণ্ডের পর তার রাজকীয় শেষযাত্রা ও প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে কফিনবাহী ট্রেনটি ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ড পর্যন্ত ১৬৫৪ মাইল পথ অতিক্রম করে। নানা শহরে আয়োজিত আনুষ্ঠানিকতা মিলিয়ে মোট প্রায় ৭০ লাখ মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। শুধু নিউ ইয়র্ক সিটিতেই ২৪ ঘণ্টার প্রদর্শনীতে প্রায় ৩ লাখ মানুষ কফিনের পাশ দিয়ে হেঁটে যান, আর ফিলাডেলফিয়ায় দেখা যায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শোকসন্তপ্ত মানুষের উপস্থিতি। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ।
১৮৮৫ সালের ১লা জুন প্যারিসে ভিক্টর হুগোর রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফ থেকে পন্থেয়ন পর্যন্ত শোভাযাত্রায় ২০ লাখের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন। রোমান্টিক সাহিত্যিক ও রিপাবলিকান মতাদর্শের প্রবক্তা হিসেবে হুগোর সাংস্কৃতিক মর্যাদাই এই স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অংশগ্রহণের উৎস।
১৯২৫ সালের ২রা এপ্রিল বেইজিংয়ে চীনের প্রতিষ্ঠাতা সান ইয়াত-সেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মার্চ থেকে শুরু এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৭,৬৮,৯০০ শোকসন্তপ্ত মানুষ তার মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। ১৯৪৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি মহাত্মা গান্ধীর দাহক্রিয়ায় নয়াদিল্লির বীর্লা হাউস থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত পাঁচ মাইল দীর্ঘ শোভাযাত্রার দু’পাশে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ অংশ নেন।

১৯৫২ সালের ৯ই আগস্ট বুয়েন্স আয়ার্সে এভা পেরনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শোভাযাত্রায় ধারাবাহিক কয়েকদিনে ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ অংশ নেন বলে জানা যায়। রাস্তা জুড়ে ভিড় জমে, শ্রমিকরা তার কফিন বহন করে। এমন আবেগঘন দৃশ্য তখনকার শহরের স্বাভাবিক জীবনকে থামিয়ে দেয়।
তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী এবং জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা এম. জি. রামচন্দ্রন (এমজিআর)-এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ১৯৮৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এতে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হন। শোভাযাত্রা শহরতলি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। উপস্থিত ছিল ৩০ থেকে ৫০ লাখের মতো মানুষ। তীব্র শোকের আবেগ পরবর্তীতে দাঙ্গায় রূপ নেয় এবং বহু সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ৩রা নভেম্বর ১৯৮৪ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ উপস্থিত ছিল। তারা ৬ মাইল দীর্ঘ শোভাযাত্রাপথ জুড়ে সমবেত হন।

পোপ জনপল দ্বিতীয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ৮ই এপ্রিল ২০০৫ সালে ভ্যাটিকান সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়। ইতালির সিভিল প্রোটেকশন ডিপার্টমেন্টের হিসাব অনুযায়ী রোমে ৩০ লাখেরও বেশি তীর্থযাত্রী সমবেত হন। সিস্টেমেটিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে ঘণ্টায় প্রায় ২১,০০০ জন প্রবেশের হার ধরে এই অনুমান করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, ১৩ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ সালে ভারতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মাদার তেরেসার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ১৫,০০০ জন। শোভাযাত্রাপথে সম্মান জানাতে আরও কয়েক হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান।
ইরানের তেহরানে ৫ থেকে ৬ই জুন ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষ বিদায়ের শোভাযাত্রা ও  দাফন অনুষ্ঠানে মিছিল ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণসমাবেশ। ইরানি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী এতে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২ লাখ। এই পরিসংখ্যানকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসও স্বীকৃতি দেয়। (তথ্যসূত্র গ্রোকিপেডিয়া)

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ