গত দেড় বছরে নদী থেকে ৭৪১টি মরদেহ উদ্ধার, ৩৯১টির পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি

বাংলাদেশের নদীপথ এক সময় শুধু যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হতো। সময়ের পরিক্রমায় এখন এটি অপরাধী চক্রের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। গত দেড় বছরে নদী থেকে মোট ৭৪১টি মরদেহ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে ৩৯১টির পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নৌ পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রতিমাসে গড়ে ৪৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব মরদেহের ৩০ শতাংশের কোনো পরিচয় এখনো মেলেনি। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মরদেহ শনাক্তে সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও জনবল ও লজিস্টিক সঙ্কটের কারণে এসব মরদেহ শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
গত ২৩ আগস্ট বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী কেরাণীগঞ্জের মীরেরবাগ এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় গলায় কালো কাপড় প্যাঁচানো এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের এক ঘণ্টা পরে একই স্থানে ওড়না দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। একই দিনে মাত্র ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে একই নদী থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবক ও যুবতীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নদীতে ৪৪০টি মরদেহ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৯৯টি শনাক্ত হয়েছে, আর ১৪১টির পরিচয় মেলেনি। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে নদীতে ৩০১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯২টি শনাক্ত করা যায়নি।
কেরাণীগঞ্জ মীরেরবাগ এলাকার বাসিন্দা ও নৌকার মাঝি ওয়াদুদ মিয়া বলেন, নদীতে নৌকা চালানোর সময় আমাদের কয়েকজন মাঝি বলেছিল নদীতে লাশ ভাসছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি নৌকা নিয়ে গিয়ে দেখি গলায় কাপড় প্যাঁচানো একজন মহিলার লাশ ভাসছে।
মনে হচ্ছে কেউ শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে মহিলার লাশটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে আরও এক শিশুর লাশ পাওয়া যায়। এমন ঘটনায় মাঝিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকে ভয়ে নৌকা চালানো বন্ধ করে বাসায় চলে যায়।

এ এলাকার বাসিন্দা এমরান মিয়া বলেন, ‘দু’টি লাশ দেখার পর সন্ধ্যায় বুড়িগঙ্গা নদীর বরিশুর এলাকা থেকে একসাথে হাত বাঁধা এক পুরুষ ও নারীর লাশ উদ্ধার হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি লাশ দেখা সত্যিই আতঙ্কজনক। আমরা চাই, যেসব এলাকায় লাশ পাওয়া যায়, পুলিশ প্রশাসন সেসব এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করবে। নদীতে পুলিশের টহল বাড়ানো হলে হয়তো লাশের ঘটনা কমবে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অনেক অপরাধী চক্র অপরাধ গোপন করতে নিরাপদ জায়গা হিসেবে নদীপথ ব্যবহার করছে। মাদক ও মানবপাচার থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি ও হত্যা-সব ধরনের অপরাধেই নদীপথকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। নদীতে ফেলে দেয়া মরদেহ ভেসে উঠলেও অধিকাংশ সময় পরিচয় শনাক্ত করা যায় না, ফলে হত্যাকাণ্ড বা অপরাধের প্রমাণ ধোঁয়াশায় পড়ে।
ঢাকা নদী অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘নদীতে পাওয়া মরদেহের
প্রাথমিক শনাক্তকরণ আমরা পিবিআই ও সিআইডির মাধ্যমে করি। মরদেহ উদ্ধার হওয়া মাত্র আশপাশের থানা ও হেড অফিসের মাধ্যমে নিখোঁজ জিডি খুঁজে পরিবারকে তথ্য দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। দীর্ঘক্ষণ পানিতে থাকা ও পচনের কারণে আঙ্গুলের ছাপ বা চেহারা বিকৃত হয়ে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যেসব মরদেহ শনাক্ত করা যায় না, সেগুলো থেকে ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়। ভবিষ্যতে কেউ শনাক্ত করতে পারলে তা স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘নদীতে মরদেহ ফেলার কারণে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা ও চেহারা বিকৃত হওয়ার কারণে অপরাধীরা নদীকে মরদেহ গুম করার ‘ডাম্পিং স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহার করছে। বেশি লাশ উদ্ধার হয় এমন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সকল বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ