মাহমুদুল হক আনসারী
ডাক্তার ও চিকিৎসা বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। রোগীর অভিযোগের শেষ নেই। মানুষের রোগব্যাধী হবে। সেটি প্রাকৃতিক নিয়ম। নানা নিয়ম অনিয়মের কারণে মানবদেহে রোগের সৃষ্টি হয়। সে রোগের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা শাস্ত্র রয়েছে। সমাধানও আছে। ডাক্তার আছে , মেডিকেল ক্লিনিক, কলেজ ও হাসপাতাল ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা হয়েছে। পৃথিবীর উন্নতি অগ্রগতির সাথে বৈজ্ঞানিকভাবে মানবদেহের চিকিৎসার উন্নতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে সরকার প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। নতুন নতুন চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে উঠছে। সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে অসংখ্য মেডিকেল ক্লিনিক আছে। মানুষের মধ্যে নানাভাবে রোগব্যাধী তৈরি হচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন চাল চলন অভ্যাসের কারণে মানবদেহে মরণব্যাধী সহ নিত্যনতুন রোগের সৃষ্টি হয়।
খাদ্য অভ্যাস , জীবন যাপনের নানা অনিয়ম থেকে রোগের সৃষ্টি। খাদ্যের নামে ভেজাল খাদ্য গ্রহণ রোগের অন্যতম কারণ। তবুও মানুষকে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। শারিরীক সক্ষমতা অর্জনের জন্য দেশে উৎপাদিত নানাজাতের খাদ্য সামগ্রী মানবসমাজ শরীরের জন্য গ্রহণ করছে। খাদ্যের মান ও দাম কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে , সেটিও দেখার অনেক সময় সুযোগ হয়না। প্রয়োজনের কারণে ব্যক্তিপরিবার আত্মীয়স্বজনের জন্য খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করে গ্রহণ করতে হয়। এসব ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্যের মান ভেজাল প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ মোটেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা। প্রতিদিন খবরের কাগজ এবং নানা সংবাদ মাধ্যমে ভেজাল খাদ্য বিরোধী অভিযানের সংবাদ পাওয়া যায়। অনেকগুলো ভেজাল খাদ্য উৎপাদন কারখানা মালিক শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অভিযানে তাদেরকে জরিমানাসহ প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করে দেয়ার সংবাদ আছে। তবুও ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ মোটেও রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা।
ফলে রোগব্যাধির নিয়ন্ত্রণ মানবদেহে মোটেও রক্ষা করা যাচ্ছেনা। তাই প্রতিদিন প্রতিটি মুহুর্তে মানবদেহে নানারোগের জটিল কঠিন রোগ তৈরী হচ্ছে। ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। ডাক্তারের নিকট গেলেই বাংলাদেশের চিকিৎসকগণ রোগীর রোগ নির্ণয়ের জন্য বিরাট একটি তালিকা দিয়ে ল্যাবের নিকট যাওয়ার পরামর্শ দেয়। লম্বা পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ করে ভোক্তভোগী রোগী। তার নিকট অর্থ থাকুক বা না থাকুক ধার কর্য করে হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ মত ল্যাবের সব পরীক্ষগুলো শেষ করে ওই ডাক্তারের নিকট পুনরায় যাওয়া হয়। দেখা যায় অনেক সময় আট থেকে দশটি পরীক্ষা করার পরও রোগীর প্রকৃতপক্ষে কোনো রোগই পাওয়া যায়নি। তখন ডাক্তার রোগীকে তার সাধ্যমতো চিকিৎসার একটা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেয়। সেখানে অনেক ধরনের আইটেমের ঔষুধ দেওয়া হয়। দেখা যায় সেই চিকিৎসায় রোগীর দুই পয়সারও লাভ হয়নি। টাকা কিন্তু প্রচুর খরচ হয়েছে। কয়েকমাস ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে যাতায়াত করতে হয়েছে। মোটেও রোগীর কোনো আরোগ্যতা আসেনি। চিন্তায় পড়ে যায় রোগী। তার অসুস্থতা বাড়তে থাকে। দিন দিন সে আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। চিকিৎসা এবং ঔষুধে রোগীর কোনো কল্যাণ সে পাচ্ছেনা। তখন তার মাথায় এসে যায় দেশে হয়ত আমার চিকিৎসা হবেনা। আমাকে দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে চিকিৎসার জন্য যেতে হবে। টাকা লাগবে পাসপোর্ট লাগবে, ভিসা লাগবে সাথে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কাউকে সঙ্গী করে নিতে হবে। বিরাট এক খরচ এবং ভোগান্তির মধ্যে পড়ে গেল সে রোগী। যেভাবেই হোক তাকে অর্থকরি জোগাড় করে দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যেতে হবে কেনো? আমাদের দেশে এতো মেডিকেল কলেজ এতো চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ থাকার পরও কেনো জনগণ রোগের সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেনা? সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চিকিৎসকরা জনগণের টেক্সের অর্থে পড়ালেখা করে ডাক্তার হয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করে কলেজ থেকে বের হয়ে সে সঠিক রোগের চিকিৎসা প্রায় বুঝেনা। তাহলে এসব মেডিকেলে চিকিৎসকের নামে কী তৈরি হচ্ছে। অনেকগুলো কথা। এতগুলো কথা বলা লিখা মোটেও আমি সমুচিত হবে বলে মনে করছিনা। মনের দুঃখে রোগীদের নানা যন্ত্রণা এবং ভোগান্তির কথা শুনে লেখাটি লিখতে হচ্ছে।
সরকারী হাসপাতাল গুলোতে যেসব ডাক্তার কর্মরত রয়েছেন তাদের বেশিরভাগ ডাক্তারের রোগীর প্রতি ব্যবহার মোটেও সন্তোষজনক নয়। মনে হয় তারাই রাজা, তারাই মালিক। আর রোগী একজন প্রজা তাদের কর্মচারী। ভালো ব্যবহার আচার আচরণ কোথাও চোখে পড়েনা। সঠিক সময়ে চেম্বারে আসেনা। যে কয়জন ডাক্তার কর্মচারী হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ আছেন , এসে কয়েক ঘন্টা পর সরকারী চেম্বার ত্যাগ করে উদাও হয়ে যায়। ইচ্ছেমতো চেম্বারে আসা এবং চলে যাওয়ার প্রবণতা নিয়মিতভাবে চোখে পড়ার মত। এ হলো সরকারী চিকিৎসা সেন্টারের পরিস্থিতি। এরপর যেসব রোগীরা কিছু চিকিৎসা পায় তাও মাথাব্যথা পেট ব্যাথা গ্যাষ্টিক জাতীয় রোগের জন্য কিছু চিকিৎসা আর মেডিসিন সহজভাবে নাগালের মধ্যে পাওয়া যায়। এর বাইরে জটিল রোগের চিকিৎসা মোটেও সরকারী হাসপাতাল গুলোতে সহজভাবে রোগীরা পাচ্ছেনা। বাইরে চেম্বারে গিয়ে প্রাইভেট ফি দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে সরকারী সেই ডাক্তারদেরকে দেখাতে হয়। সেখানেও অনেক ভোগান্তির পর রোগী চিকিৎসা না পেয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে চলে যায়।
এগুলো অবশ্যই আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। চিকিৎসাকে সহজ এবং সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তারদের মানবিক হওয়ার কঠোরভাবে অনুরোধ করছি। চিকিৎসা খাত একটি মানবিক এবং অত্যন্ত জরুরী সেক্টর। অপরাপর সেক্টরের মতো চিকিৎসা খাতকে হিসেব করা যাবেনা। চিকিৎসা এবং এ খাতের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের মানবিক দৃষ্টির মধ্যে রোগের চিকিৎসা করতে হবে। রোগীর সামর্থ্য ক্ষমতা দেখে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। জটিল কঠিন রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকারী বরাদ্দ থাকা চাই। কিছু বরাদ্দ থাকলেও সেটি অপ্রতুল। এটিকে আরো ব্যাপকভাবে করার দাবি জানাচ্ছি। ডাক্তারদের মানবদরদী রোগীপ্রেমিক হওয়ার উদাত্ত আহŸান জানাচ্ছি। সরকারী চিকিৎসা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত দেখতে চাই। বেসরকারী চিকিৎসা খাতের গলা কাটা অর্থ আদায় বন্ধ করতে হবে। তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের ক্লিনিক ও ল্যাব পরিচালনার কর্মসূচী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ঠিক করে দিতে হবে। এর বাইরে ইচ্ছেমতো অর্থ আদায় করা রোগীদের ভোগান্তির মধ্যে ফেলে ইচ্ছেমতো অর্থ আদায় বন্ধ করতে হবে। সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তি এবং রোগ নির্ণয় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থ রোগের জন্য বাইরে পাচার অনেকটা বন্ধ হবে। আসুন চিকিৎসা প্রাপ্তির জন্য দেশের বাইরে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করি এবং চিকিৎসাকে রোগীদের নাগালের মধ্যে রাখি।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ