মো. আবদুর রহিম

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ খ্রি. সোমবার ভোর ৪৫ মিনিটে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ৪৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যুবরণ করেন চট্টগ্রাম ৮ আসনে ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিজয়ী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ¦ মোছলেম উদ্দিন আহমদ। ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ-জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈনউদ্দিন খান বাদল নৌকা প্রতীক নির্বাচত হন। তিনি বেশি দিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর ভোর সাড়ে পাঁচটায় ভারতের বেঙ্গালুরুতে নারায়না হৃদয়ালয় ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। একাদশ জাতীয় সংসদের আর মাত্র ৮ মাস মেয়াদ রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। ইতোমধ্যে সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোছলেম উদ্দিন আহমদ মারা যাওয়ায় আসনটি শুণ্য হয়ে যায়। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ খ্রি. সংসদে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোছলেম উদ্দিনের নামে শোক প্রস্তাব উত্থাপন হয়, আলোচনা শেষ শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। আসন শূণ্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে পুন:নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোছলেম উদ্দিন আহমদ এর মৃত্যুর্জনিত কারণে খালি হওয়া এ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর পার্লামেন্টারী বোড প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন। পাশাপাশি অন্যসব রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশ নেবে এমনটাই অত্র নির্বাচনী এলাকাবাসীর প্রত্যাশা। এমতাবস্থায় চট্টগ্রাম-৮ নির্বাচনী এলাকার উপনির্বাচন ঘিরে নানা জল্পনা-কল্পনা, তদবির শুরু হওয়াটাই স্বাভাবিক। চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ দৈনিক পত্রিকা আজাদী ১০ ফেব্রæয়ারি ২০২৩ শুক্রবার প্রথম পাতার দ্বিতীয় ও তৃতীয় কলাম জুড়ে ‘কে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন’ ব্যানার হেড লাইনে ৫ জনের ছবি দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের ছাপানো ৫ জনের ছবির মধ্যে ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ও আবুল কালাম চৌধুরী আওয়ামী পরিবারের কেউ নন।

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মানুষ। আবুল কালাম চৌধুরী সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। তবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন, সিডি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আলহাজ¦ আবদুচ ছালাম ও বোয়ালখালীর সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাবেক রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম এর রাজনীতি, সমাজসেবা সম্পর্কে আমি কম বেশি ভালই জানি। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক সফল মেয়র আলহাজ¦ আ জ ম নাছির উদ্দীন শিক্ষাজীবন থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে নগর ছাত্রলীগে দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে দুই মেয়াদে সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটিতে দুই মেয়াদে সদস্য, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে ২০১৩ সাল থেকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসীন। এছাড়াও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সহ-সভাপতি, পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন এবং চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পদে সহ নানা সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল সংগঠক ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কারখানা পরিচালনা নিয়ে জীবন যাপন করছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার মনোনয়নে ২০১৫ সালে হাতি প্রতীকে মেয়র নির্বাচিত হয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে ৫ বছর সফলভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালনা করেছেন। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের দু’টি ধারার রাজনীতিকে সমন্বয় করে দল পরিচালনায়ও তিনি সফল। অপরদিকে জনাব আবদুচ ছালাম প্রয়াত সফল মেয়র আলহাজ¦ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী হাত ধরে ৯০ এর দশকে আওয়ামী লীগে আসেন। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে দুই মেয়াদে কোষাধ্যক্ষ পদে আসীন আছেন। এই রাজনীতিবিদও জীবনে বহু বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে দেশের স্বনামধন্য শিল্প গ্রুপ ওয়েলগ্রুপ পরিচালনা সহ রাজনীতি, সমাজসেবা করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের টানা ১০ বছর চেয়ারম্যান পদে আসীন ছিলেন জনাব আবদুচ ছালাম। তিনি চট্টগ্রামের উন্নয়ন, রাস্তা সম্প্রসারণ, ফ্লাইওভার নির্মাণ, আউটার রিং রোড নির্মাণ সহ বহু উন্নয়ন কাজে অবদান রেখে গেছেন। তিনি ২০০৮ ও ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম ৮ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেলেও জোটবদ্ধ নির্বাচনের কারণে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এস এম আবুল কালাম সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন। তিনিও তৃণমুল থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে আছেন। তিনি ১৯৮৬ এবং ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেন। সেই দুই নির্বাচনে তিনি বিএনপি’র প্রার্থীর নিকট পরাজিত হন। ২০০৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েও পাননি। ২০১৮ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসএম আবুল কালামকে কুয়েতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেন। এসএম আবুল কালাম আওয়ামী লীগের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হননি। চট্টগ্রাম ৮ নির্বাচনী এলাকাটি দুইভাগে বিভক্ত কর্ণফুলী নদী এলাকাকে দুভাগ করে দিয়েছে। কর্ণফুলী নদীতীর ঘেঁষে বোয়ালখালী উপজেলা এ উপজেলার ১টি ইউনিয়ন রাঙ্গুনীয়ার নির্বাচনী এলাকার সাথে যুক্ত। ফলে বোয়ালখালী উপজেলার ১) কধুরখীল ২) পশ্চিম গোমদণ্ডী ৩) পূর্ব গোমদন্ডী (পৌরসভা সহ) ৪) শাকপুরা ৫) সারোয়াতলী ৬) পোপাদিয়া ৭) চরণদ্বীপ ৮) আমুচিয়া ৯) আহল্লা করলডেঙ্গা ইউনিয়ন সমূহ এবং চট্টগ্রাম মহানগরের ৩নং পাঁচলাইশ, ৪নং চান্দগাঁও, ৫নং মোহরা, ৬নং পূর্বষোলশহর ও ৭নং পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড রয়েছে। চট্টগ্রাম ৮ আসনে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৯৯৮ জন ভোটার আছে। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৯২২ ও মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪ জন। তন্মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলার ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার। সববিবেচনায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৫টি ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা বেশি এবং নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জনাব এসএম আবুল কালাম বোয়ালখালীর উপজেলার স্থায়ী সন্তান। অপরদিকে আলহাজ¦ আ জ ম নাছির উদ্দীন ও আব্দুচ ছালাম চট্টগ্রাম নগরীর স্থায়ী বাসিন্দা। তিনজনের মধ্যে এসএম আবুল কালাম দুইবার চট্টগ্রাম ৮ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করে হেরে যান। জনাব আবদুচ ছালাম দুইবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করার সুযোগ পাননি। অপরদিকে আলহাজ¦ আ জ ম নাছির উদ্দীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কখনো মনোনয়ন চাননি। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের একজন নিবেদিত প্রাণ, নির্যাতিত নেতা। তাকে নিয়ে বহু ষড়যন্ত্র হয়, তাকে জিয়া-এরশাদ দলে নিতে চেয়েছিল এবং লোভ-প্রলোভন দেখিয়েছিল। তাকে কোন লোভ-প্রলোভনে, মিথ্যা-আশ^াসে কাবু করতে পারেনি। পরিনামে তাকে জেল-নির্যাতন, মামলা-হামলার কবলে পড়ে ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়েছে গোপন আস্তানায় জীবন কাটাতে হয়েছে। সর্বশেষ ১/১১ সরকারের আমলেও তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছেন। এ সময়ও তাকে গোপন ঠিকানায় থাকতে হয়েছে। পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের দুঃসময় ১৯৭৫ এর পর ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৫ এ সময়ে জননেতা আ জ ম নাছির উদ্দীন নানাভাবে নির্যাতন, অপদস্ত হয়েছে। তিনি সব প্রতিকূলতা বিশেষ করে নিজ দল ও বিরোধী দল এবং জিয়া, এরশাদ, খালেদা ও ফখরুদ্দিনের শাসন আমলকে মোকাবিলা করেছেন বুদ্ধিমত্তা, কৌশল ও দুরদর্শিতায়। ২০১৩ সালে এসে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ অর্জন এবং ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে মেয়র নির্বাচিত হয়ে অনেকটা সফলতার সাথেই দায়িত্ব পালন করেন। সামনে চট্টগ্রাম ৮ আসনের উপনির্বাচন, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্তমানে আলহাজ¦ আ জ ম নাছির উদ্দীনের সামনে চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো যদি সফলতার সাথে বিচক্ষণতার সাথে এবং দুরদৃষ্টির সাথে সফল হন তাহলেই আ জ ম নাছির উদ্দীন হয়ে ওঠবেন চট্টগ্রামের একজন কিংবদন্তী। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সফল মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন। তিনিও ছাত্রলীগ, আওয়ামী যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, মূলদল আওয়ামী লীগে অবদান রেখে বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির মত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেই তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৯১ এর ২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন এবং ১৯৯৪, ২০০০, ২০০৫-এ মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে টানা ১৭ বছর মেয়র পদে থেকে সফল ভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালনা করেন। জেল, জুলুম, নির্যাতন, কারাগার তাকে দমাতে পারেনি। তিনি আজ মরেও অমর। আসন্ন চট্টগ্রাম ৮ উপ-নির্বাচন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল কিভাবে মোকাবিলা করে সফল হবেন Ñএ পরীক্ষা এখন আলহাজ¦ আ জ ম নাছির উদ্দীনের সামনে। আমার বিশ^াস বিনয়, মিষ্টিভাষা, ধৈর্য্য-সহনশীলতা, আচার-আচরণে তিনি জয়ী হবেন। কারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা সফল রাষ্ট্রনায়ক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতেই সব ক্ষমতা। তিনি আ জ ম নাছির উদ্দীনকে তার দুঃসময়ে পাশে পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে আ জ ম নাছির উদ্দীন ছিলেন জীবন বাজি রাখা একজন নিবেদিত প্রাণনেতা। সব বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা হয়ত তাকে বিমুখ করবেন না। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচন, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ জ ম নাছির উদ্দীন বিজয়ী হবেন এমনটিই নগরবাসীর প্রত্যাশা।

 

সর্বশেষ সংবাদ