ডিসেম্বর ৩, ২০২২ ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ

আত্মসমর্পণকারী ১০১ ইয়াবা কারবারিকে দেড় বছর করে সাজা

কক্সবাজারের টেকনাফে  প্রথম দফায় আত্মসমর্পণকারী ১০১ ইয়াবা কারবারীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। মাদকের মামলায় ১০১ জনের প্রত্যেককে ১ বছর ৬ মাস করে কারাদন্ড এবং ২০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। অস্ত্র মামলায় সকলকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৩ নভেম্বর) দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে কক্সবাজার জেলার জ্যেষ্ঠ জেলাও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় মামলার ১৭ জন আসামী আদালতের কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন।অপর ৮৪ জন আসামী পলাতক হয়ে গরহাজির ছিলেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌসুলি (পাবলিক প্রসিকিউটর-পিপি) ফরিদুল আলম ওইসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, বিচারক দুপুর ১২ টা ২০ মিনিটে রায় পাঠ করা শুরু করেন এবং শেষ করেন  বেলা ১ টা ২৫ মিনিটে।
বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘মামলার বাদী, সাক্ষী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা কেউই আসামীদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে দায়ের করা দু’টি পৃথক মামলার এজাহারে বর্নিত ঘটনা ও অভিযোগের যথাযথ ও সন্দেহাতিতভাবে সত্যতা আদালতে উপস্হাপন করতে পারেননি। রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি ও আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি, তাই আসামীদের দু’টি মামলা থেকে বেকসুর খালাস প্রদান করা যেতে পারে।’
‘কিন্তু আসামীরা যেহেতু ইয়াবার পৃষ্ঠপোষক, গডফাদার, পাচারকারি ও কারবারি হিসাবে আত্মস্বীকৃত তাই তাদের বেকসুর খালাস প্রদান করা হলে সমাজে খারাপ বার্তা যাবে। তাই তাদের কারাদন্ড ও অর্থদন্ড প্রদান করা হলো।’
আদালত পর্যবেক্ষণে আরো বলেন, ‘টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের পরিকল্পনায় অস্ত্র ও ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে আসামীদের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়।’
বিচারক প্রায় এক ঘন্টার বেশি সময় রায় পড়ে শুনানোর সময় বাদী, সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা, আসামী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য, জবানবন্দী ও জেরার বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, ‘টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে যে আত্মসমর্পন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসামীদের রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।’
গত ১৫ নভেম্বর মঙ্গলবার মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সর্বশেষ জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল  ব্যাপকভাবে আলোচিত এই মাদক ও অস্ত্র  মামলার রায় ঘোষণার জন্য বুধবার  দিন ধার্য করেছিলেন।
গত ১৫ নভেম্বর মামলার বিচার কার্য চলাকালীন মোট ১০১ জন আসামীর মধ্যে ১৭ জন আসামী আদালতে হাজির ছিলেন। আদালত ওই ১৭ জনের জামিন বাতিল করে কারাগারে  প্রেরণের আদেশ দেন। ওই দিন আদালতে গরহাজির বাকী  ৮৪ জন আসামীর  জামিন বাতিল করে তাদের সকলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানার আদেশ দেন। গতকাল আদালতে রায় ঘোষণাকালে ওই ৮৪ জন আসামী গরহাজির ছিলেন।
চার বছর আগে বিশেষ অভিযান শুরুর পর কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ২৯৯ জন। পরে আতঙ্কের মুখে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ পাইলট হাইস্কুল মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন ১০২ জন মাদক কারবারি।
১০২ জন আসামীর মধ্যে মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট মোহাম্মদ রাসেল (২৮) নামে এক আসামী অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ  হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, কক্সবাজারের চার জন সংসদ সদস্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ,পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।অনেকদিন প্রস্তুতির পর ওই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি হয়েছিল।
আত্মসমর্পনের দিন ১০২ জনকে আসামী করে টেকনাফ মডেল থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটির বাদী হন টেকনাফ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) শরীফ ইবনে আলম। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয় টেকনাফ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এবিএমএস দোহাকে।মামলা দায়েরের দিনই সকল আসামীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের আদেশে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আত্মসমর্পণের দিন ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে টেকনাফের একটি পরিত্যক্ত চিংড়ি হ্যাচারিতে জড়ো হয়ে ইয়াবা পাচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইয়াবা কারবারিরা। গোপনসূত্রে খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতির কারণে পালাতে না পেরে ইয়াবা কারবারিরা ইয়াবা ও অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন পুলিশের কাছে। পরে একই দিন সকাল ১০ টায় তারা ১০২ জন টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ৩০টি দেশীয় তৈরি বন্দুক, ৭০ টি গুলি ও সাড়ে ৩ লাখ ইয়াবাসহ আত্মসমর্পণ করে।
২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহ এর আদালত ১০১ আসামীর বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।মামলার আসামী মোঃ রাসেল বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্হায় মারা যাওয়ায় তাকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে মামলাটি বিচারের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রেরণ করা হয়। ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল সকল আসামীর উপস্থিতিতে শুনানী শেষে মামলার অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন।
আত্মসমর্পনের পর টানা দেড় বছর সকল আসামী কারাগারে ছিলেন। এরপর জামিনে মুক্ত হয়ে গত চলতি বছরের ১৫ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত আদালতে হাজিরা দিয়ে আসছিলেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং আসামীদের পক্ষে সাক্ষীদের জেরা করা হয়।আসামীদের পক্ষে আদালতে ২ জন সাফাই সাক্ষী প্রদান করেন। যারা সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা হলেন- টেকনাফের বাহারছড়ার শামলাপুর এলাকার বাসিন্দা বাহারছরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আজিজ উদ্দিন এবং টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়ার মৃত মমতাজ উদ্দিনের পুত্র গিয়াস উদ্দিন ভুলু। মামলায় রাষ্ট্র পক্ষে ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং আসামীদের পক্ষে সাক্ষীদের জেরা করা হয়। আলামত প্রদর্শন, রাসায়নিক পরীক্ষা ফলাফল যাচাই, আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াসহ মামলাটি বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আসামীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সাবেক পিপি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ মামলা পরিচালনা করেন।
রায় ঘোষণার পর পিপি ফরিদুল আলম গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘এই রায় একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়।’
আসামী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ দু’টি মামলাতেই আসামীদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারপরও রাষ্ট্রের স্বার্থে আদালতে একটি প্রতীকী রায় ঘোষণা করেছেন। এ রায়ের ভিত্তিতে আসামীদের দোষী বলা যাবেনা।’
আদালতে হাজির থাকা ১৭ জন  আসামী হলেন, নুরুল হুদা মেম্বার (৩৮), শাহ আলম (৩৫), আবদুর রহমান (৩০), ফরিদ আলম (৪২), মাহবুব আলম (৩৪), রশিদ আহমদ খুলু (৫৪), মো: তৈয়ব (৪৬), জাফর আলম (৩৭), মোঃ হাশেম প্রকাশ আংকু (৩৮), আবু তৈয়ব, (৩১), আলী নেওয়াজ (৩১), মোঃ আইয়ুব (৩৫), কামাল হোসেন (২৬), নুরুল বশর প্রকাশ কালাভাই (৪০), আবদুল করিম প্রকাশ করিম মাঝি (৪০), দিল মোহাম্মদ (৩৪) এবং মোঃ সাকের মিয়া প্রকাশ সাকের মাঝি (২৮)।
পলাতক ৮৪ আসামি হলেন, সাবেক এমপি বদির ভাই আব্দুর শুক্কুর, বদির ভাই আমিনুর রহমান ওরফে আব্দুল আমিন, দিদার মিয়া, বদির ভাগনে মো. সাহেদ রহমান নিপু, আব্দুল আমিন, নুরুল আমিন, বদির ভাই শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিক, বদির ভাই ফয়সাল রহমান, এনামুল হক ওরফে এনাম মেম্বার, একরাম হোসেন, ছৈয়দ হোসেন, বদির বেয়াই সাহেদ কামাল ওরফে সাহেদ, মৌলভী বশির আহমদ, আব্দুর রহমান, মোজাম্মেল হক, জোবাইর হোসেন, নুরুল বশর ওরফে কাউন্সিলার নুরশাদ, বদির ফুপাত ভাই কামরুল হাসান রাসেল, বর্তমানে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান ওরফে জিহাদ, মোহাম্মদ শাহ, নুরুল কবির, মারুফ বিন খলিল ওরফে বাবু, মোহাম্মদ ইউনুচ, ছৈয়দ হোসেন ওরফে ছৈয়দু, মোহাম্মদ জামাল ওরফে জামাল মেম্বার, মোহাম্মদ হোছাইন, মো. হাসান আব্দুল্লাহ, রেজাউল করিম ওরফে রেজাউল মেম্বার, মো. আবু তাহের, রমজান আলী, মোহাম্মদ আফছার, হাবিবুর রহমান ওরফে নুর হাবিব, শামসুল আলম ওরফে শামশু মেম্বার, মোহাম্মদ ইসমাঈল, আব্দুল গনি, মোহাম্মদ আলী, জামাল হোসেন, আব্দুল হামিদ, নজরুল ইসলাম, মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে দানু, মোহাম্মদ সিরাজ, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, হোসেন আলী, নুরুল কবির মিঝি, শাহ আজম, জাফর আহমেদ ওরফে জাফর, রোস্তম আলী, নুরুল আলম, শফি উল্লাহ, মো. জহুর আলম, মোহাম্মদ হুসাইন, মোহাম্মদ সিদ্দিক, রবিউল আলম, মঞ্জুর আলী, হামিদ হোসেন, মোহাম্মদ আলম, নুরুল আমিন, বোরহান উদ্দিন, ইমান হোসেন, মোহাম্মদ হারুন, শওকত আলম, হোছাইন আহম্মদ, মোহাম্মদ আইয়ুব, মো. আবু ছৈয়দ, মো. রহিম উল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, মোহাম্মদ সেলিম, নুর মোহাম্মদ, বদির খালাত ভাই মং অং থেইন ওরফে মমচি, মোহাম্মদ হেলাল, বদিউর রহমান ওরফে বদুরান, ছৈয়দ আলী, মোহাম্মদ হাছন, নুরুল আলম, আব্দুল কুদ্দুস, আলী আহম্মেদ, আলমগীর ফয়সাল ওরফে লিটন, জাহাঙ্গীর আলম, নুরুল আলম, সামছুল আলম শামীম, মোহাম্মদ ইউনুচ, নুরুল আফসার ওরফে আফসার উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহজাহান আনছারী।
শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply