সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ ৪:১১ পূর্বাহ্ণ

আনোয়ারা ও কর্ণফুুলীতে দুটি স্থাপনায় শোভা পাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের দোসর ফজলুল কাদের চৌধুরীর নাম ! মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ

জসীম উদ্দিন

 

 

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পরেও চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলিতে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্হাপনায় শোভা পাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের দোসর কুখ্যাত রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর নাম।

এই কারনে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্হানীয় মুক্তিযোদ্ধারা সহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত সর্বসাধারন। জানা গেছে, ‘ফজলুল কাদের চৌধুরী ফাউন্ডেশন’ এর নিজস্ব অর্থায়নে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে এসব স্হাপনাগুলো নির্মান করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ বর্তমানে টানা তিনবার রাষ্টীয় ক্ষমতায়। অথচ আনোয়ারা উপজেলার চাতরী গ্রামে ও কর্নফুলির দৌলতপুরের পিএবি সড়কে দুটি স্হাপনায় রাজাকারের নামে নামফলক বিদ্যমান রয়েছে  । সারাদেশে রাজাকারের নামে থাকা সড়ক, বিভিন্ন স্হাপনা ও অবকাঠামোর নামফলক বাতিল ও অপসারণে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও এগুলোর পরিবর্তনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন বা স্হানীয় জনপ্রতিনিধি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষক, সাংবাদিক জামাল উদ্দিন রচিত “আনোয়ারা একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ” বই থেকে জানা যায়, চাতরী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের চৌধুরী ও মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন রাজাকারদের সাথে মোকাবিলা করতে আধুনিক মানের অস্ত্রের সন্ধানে একাত্তর সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছুটে যান শহরে। জেল রোডের রুপসা বোর্ডিংএ অবস্থান করে বিশ্বস্ত পরিচিত কয়েকজনের সাথে দেখা করেন। কিন্তু তাদের গতিবিধি নজরে পড়ে কয়েকজন রাজাকারের। একদিন বিকেলে এ দু’জন হোটেলে বিশ্রাম নেবেন, এমনই মুহূর্তে একদল সশস্ত্র রাজাকার দু’জনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান মুসলিম লীগ নেতা রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর গুডহীলস্হ নির্যাতন সেলে। ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে এ দু’জন মুক্তিযোদ্ধার উপর শুরু হয় দৈহিক নির্যাতন। এক টানা পনেরো দিন অমানুষিক নির্যাতন শেষে বিনা চিকিৎসায় ছেড়ে দেয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের চৌধুরী ও মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিনকে। দু’জনের সমস্ত শরীরে কাটা দাগ, মাংস পচন ধরেছিল। লোমহর্ষক এই নির্যাতনের ঘটনা আনোয়ারার মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি।
এ প্রসঙ্গে আনোয়ারা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, একাত্তরের মে মাসে মুসলিমলীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর গুডহীলস্হ টর্সার সেলে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের চৌধুরী ও মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। চাতরী গ্রামে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানের দোসর রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর নামে থাকা প্রাইমারি স্কুলটি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও সহযোদ্ধা প্রয়াত আবদুল কাদের চৌধুরীর নামে নামকরণ করা হোক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও আনোয়ারার জনপদে স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে একাধিক সড়ক ও বিভিন্ন স্হাপনা থাকা খুবই দুঃখজনক। এসব স্হাপনা ও সড়কের নামফলক থেকে ঘৃণিত রাজাকারদের নাম মুছে দিয়ে স্হানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণের দাবী জানান মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান।
কর্নফুলি উপজেলার দৌলতপুরস্হ পিএবি সড়কে নির্মিত মুসলিমলীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর নামে থাকা যাত্রী ছাউনির বিষয়ে জানতে চাইলে কর্নফুলি উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ফারুক চৌধুরী বলেন, যাত্রী ছাউনিটি ভাঙ্গার দায়িত্ব নিয়েছিলেন কোরিয়ান ইপিজেড কতৃপক্ষ । কিন্তু এখনো ভাঙ্গা হয়নি। কেইপিজেড কতৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে কয়েকদিনের মধ্যে ঘৃণিত রাজাকারের নামে থাকা যাত্রী ছাউনিটি দ্রুত ভেঙে ফেলা হবে।
আনোয়ারা উপজেলার চাতরী গ্রামে অবস্থিত মুসলিমলীগ নেতা রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর নামে থাকা প্রাইমারি স্কুলটির নাম পরিবর্তন হবে কি-না জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জোবায়ের আহমদ বলেন, স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে আনোয়ারায় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্হাপনা বা সড়ক থাকতে পারবে না। ধাপে ধাপে সব স্হাপনা ও সড়ক থেকে রাজাকারদের নাম মুছে ফেলা হবে। জানতে পেরেছি, চাতরী গ্রামে অবস্থিত প্রাইমারি স্কুলটি রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর নামে নামকরণ । ঘৃণিত এই নামটি মুছে দিয়ে স্হানীয় প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের চৌধুরীর নামে নামকরণের জন্য গতবছর রেজুলেশন পাস করে প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে ।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পরেও আনোয়ারা ও কর্নফুলিতে রাজাকার, আলবদর ও আল-শামসদের নামে একাধিক সড়ক ও বিভিন্ন স্হাপনা থাকা ইতিহাসের জন্য কলঙ্কজনক মনে করছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ও গবেষকরা। তারা বলেছেন, বাঙালী হিসেবে এসব আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক ।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply