এপ্রিল ১০, ২০২১ ৫:৫০ অপরাহ্ণ

জননেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত : শ্রেষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান এবং না বলা কিছু কথা

আল-হেলাল
“আমি এমন একটি শাসনতন্ত্র চেয়েছিলাম যা দেশের দুই অংশের পক্ষেই সমানভাবে গ্রহনযোগ্য হবে। আমি এমন শাসনতন্ত্র চাইনি যা দেশের এ অংশের স্বার্থের উদগ্র তাগিদে অন্য অংশের স্বার্থের পরিপন্থী হবে। আমি সত্যিই এমন একটি শাসনতন্ত্রের জন্য উদগ্রীব হয়ে থেকেছিলাম যার ফলে পরোক্ষ নির্বাচনের যুগের অবসান হবে। জনগনের কাছে অবাঞ্চিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে থাকার আমলের হাত থেকে আমরা রেহাই পাবো। আমি যতশীঘ্র সম্ভব দেশে একটি সাধারন নির্বাচন চেয়েছিলাম। আমি বলতে চেয়েছিলাম সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠান আর জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পার্লামেন্ট গঠিত হওয়ার পরই দেশে গণতন্ত্রের প্রতিষ্টা হওয়া সম্ভব। তার একমুহুর্ত আগেও নয়”। ১৯৫৬ সালের ৩১ শে জানুয়ারী করাচিতে তদানীন্তন গণ পরিষদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শাসনতন্ত্র বিলের উপর বক্তৃতা দানকালে উপরোক্ত কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছরের ব্যবধানে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো পাকিস্তানের জনকদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব গণতন্ত্রের মানসপুত্র অভিবক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা পার্লামেন্টারী রাজনীতির প্রবক্তা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গাইড লাইনগুলো অনুসরণ না করায় এক পাকিস্তানের অখন্ডতা ঠিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে এদেশে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন,৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন,৬৬ র ৬ দফা আন্দোলন,৬৯ এর গণ অভ্যুথ্থান,৭০ এর নির্বাচন ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রনয়ণের মধ্যে দিয়ে মহান নেতা সোহরাওয়ার্দীর স্বপ্ন যারা পূরন করে কিংবদন্তী হয়ে আছেন তাদের মধ্যে একজন অন্যতম সংবিধান প্রণেতার নাম সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রæয়ারি সংসদীয় রাজনীতির এই দিকপালের মহাপ্রয়াণ ঘটে। আজ তাঁর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী।
ভারতের সংবিধান প্রণেতা অম্ভিতকার ছাড়াও ১৯৩৭ সালে বৃটিশ শাসিত অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তুলসী রঞ্জন গোস্বামী,শরৎচন্দ্র বসু ও সরদার বাহাদুর খান গংদেরকে সেরা পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে জ্ঞান গরীমা বিদ্যা বুদ্ধি অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত পূর্বসুরীতো বটেই বর্তমান সময়ে সমসাময়িক বিশ্বের সকল পার্লামেন্টারিয়ানদের মধ্যে সেরাদের সেরা হয়ে স্বমহিমায় জাতীয় সংসদে প্রতিভার স্বাক্ষর অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। ৮ম বারের নির্বাচিত এরকম একজন পার্লামেন্টারিয়ানের অস্তিত্ব বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসতো বটেই বরং দনিয়ার কোথায়ও নেই। মূলত এ কারনেই তিনি বিশ্ব শ্রেষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান। একজন বিশ্ববরেণ্য পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এর কাছেও একসময় তার ব্যপ্তি সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের পর বর্তমান ক্ষমতাসীন দল সরকার গঠন করলে ঐ নির্বাচনে মাত্র ৫০৫ ভোটে তাঁকে পরাজিত হতে হয়। মাত্র কয়েকটা দিন সংসদ অধিবেশনে তাঁর অনুপস্থিতি থাকলেও ঐসময়ে তাকে দলের নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যদেরকে সংসদের রীতিনীতি কার্যপ্রনালী ও বিধিবিধান সম্পর্কে ক্লাস প্রদান করতে দেখা গেছে। নির্বাচিত পার্লামেন্টারিয়ানদের গুরু হওয়ার সৌভাগ্যও তার ভাগ্যে জুটিছিলো। প্রকৃতির আনুক‚ল্যে হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচুঙ ও আজমেরীগঞ্জ) আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শরীফ উদ্দিন মাস্টারের মৃত্যুজনিত কারনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তিনি ঐ বছরই জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বন্যেরা যেমন বনে সুন্দর শিশুরা যেমন মাতৃকোলে তেমনি সুরঞ্জিত সুন্দর পার্লামেন্টে। তাঁকে বাদ দিয়ে সংসদের অধিবেশন যেন কল্পনাতীত।
জনাব সুরঞ্জিতের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি বই লেখার জন্য স্থানীয় দিরাই উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি আলতাব উদ্দিন ও সাংবাদিক নেসারুল হক খোকনসহ তাঁর অগনিত ভক্ত ও অনুরক্তরা আমাকে অনুরোধ জানালে ২০১১ সালের ২৩ ডিসেম্বর “জননেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত : শ্রেষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান” নামে আমার সম্পাদনায় ১৬ পৃষ্টার একটি আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশিত হয়। গভির সমুদ্র সম্পর্কে লেখনীর মারফতে যেমন সবকিছু তুলে ধরা সম্ভব হয়না তেমনি সুরঞ্জিত সেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের খতিয়ান দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বাসস প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান তালুকদার,আমি ও যুগান্তর পত্রিকার সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার নেসারুল হক খোকন যেহেতু আমাদের সাংবাদিকতা জীবনের একটি বেশীর ভাগ সময় তাঁর সাথে অতিবাহিত করেছি সেহেতু এ কাজটি আমাকেই করতে হয়েছে। তাই শত ব্যস্ততার মধ্যে এ কাজটিকে আমি আমার আন্তরিকতার সাথে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছিলাম। যতদূর জানতে পেরেছি সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এলাকার সকল শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে দুখু সেন নামে পরিচিত। বন্ধু বান্ধবরা তাকে মা বাবার দেয়া এ ডাকনামেই ডাকতেন। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে তার সমর্থনে দিরাই বাজারে সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায় আসেন তৎকালীন বিরোধী দলের ন্যাপের নেত্রী বাংলার অগ্নিকন্যা বর্তমান মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। ঐ সময়ের নির্বাচনী প্রচারপত্রে প্রার্থী হিসেবে তার নামটি দুখু সেন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হাওরাঞ্চলে পাক ওয়াটার ওয়েজ লঞ্চযোগে গণ সংযোগে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ সময় দিরাই শাল্লা জামালগঞ্জ আসনে জাতীয় পরিষদে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে সাবেক মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ও প্রাদেশিক পরিষদে সাবেক মন্ত্রী অক্ষয় কুমার দাসকে দিরাই বাজারের নির্বাচনী সভামঞ্চে প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। জাতীয় পরিষদে সামাদ আজাদের প্রতিদ্ব›িদ্ব ছিলেন ন্যাপের গুলজার আহমদ ও পিডিপির গোলাম জিলানী চৌধুরী অন্যদিকে প্রাদেশিক পরিষদে মন্ত্রী অক্ষয় কুমার দাসের বিপরীতে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন ন্যাপের সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত,পিডিপির আব্দুল খালেক চেয়ারম্যান,কমিউনিষ্ট পার্টির কমরেড প্রসুণ কান্তি রায় বরুন রায়। ঐ সময় দিরাই শাল্লা নির্বাচনী এলাকায় সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের শতকরা হার ছিল ৩০%। প্রাদেশিক পরিষদে মাত্র একজন প্রার্থী মুসলমান ধর্মাবলম্বী এবং প্রতিদ্ব›িদ্ব ৩ জনই হিন্দু ধমাবলম্বী। এরপরও নির্বাচনে বিপুল ভোটে অপেক্ষাকৃত ৩ জনপ্রিয় প্রার্থীকে হারিয়ে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত প্রথমবার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য পদে নির্বাচিত হন। সারা বাংলাদেশে ঐসময় একমাত্র বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের পার্লামেন্টে সংবিধান রচনায় উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করেন।
সুরঞ্জিত সেন এর পিতা ডাঃ দেবেন্দ্র নাথ সেন গুপ্ত ছিলেন একজন শিক্ষিত মার্জিত রুচিশীল ভদ্রলোক। যিনি চিকিৎসায় আর্ত মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। আপন সন্তানের ন্যায় পরের ছেলেদেরকেও আদর যত্নের মাধ্যমে আপন করে নেয়ার বাস্তব ঘটনায় তাঁর মমতাময়ী মাতা শ্রীমতি সুমতিবালা সেন গুপ্ত এর প্রশংসায় পঞ্চমুখর এলাকার সকল মানুষ। ফরিদপুরের কন্যা হওয়া স্বত্তেও তার সুযোগ্য সহধর্মীনি ড. জয়া সেন গুপ্ত আন্তরিক আত্মীয়তা ও আপ্যায়নে নির্বাচনী এলাকার জনগনের পাশাপাশি বৃহত্তর সিলেটবাসীর মনে শ্রদ্ধার আসন করে নিয়েছেন। তাদের একমাত্র পুত্র সৌমেন সেন গুপ্ত কানাডা থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চতর ডিগ্রীধারী সুশিক্ষিত যুবক। সেন পরিবারের একমাত্র পুত্রবধূ রাখী মৈত্রী ভৌমিক কিশোরগঞ্জের কন্যা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়,পিতা মাতার মৃত্যুর পর সুরঞ্জিত সেনের আপন সহোদর ও একমাত্র বোন এলাকার অন্যান্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পদাংক অনুসরণ করে কলকাতায় চলে যান। কিন্তু মা মাটি ও মমত্ববোধের প্রতি অসম্ভব মোহে মোহিত সুরঞ্জিত থেকে যান পিতৃগৃহে।
দুখু সেনের পূর্ণ ও সার্টিফিকেট নাম সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। দিরাই শাল্লা নির্বাচনী এলাকার এই কৃতি সন্তানের প্রকৃত জন্ম তারিখ ও সাল হচ্ছে ১৯৩৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী। লেখাপড়ায় ব্যাক অব স্টাডি হওয়ায় তার জন্ম তারিখ সাল পরিবর্তনক্রমে উল্লেখ করা হয় ১৯৪৫ সালের ৫ই মে তারিখে। তিনি জন্মগ্রহন করেন তার পিতার কর্মস্থল জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তাঁর পিতা তৎকালীন জামালগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর তৃতীয় শ্রেণির সরকারী কর্মচারী ছিলেন। দিরাই উপজেলা সদরের আনোয়ারপুর নয়াহাটি গ্রাম হচ্ছে তার স্থায়ী নিবাস। তিনি ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন স্থানীয় দিরাই আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি,সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি,সিলেটের এমসি কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে এমএ পাশ করেন। সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে আইন পাশ করে তিনি ১৯৭৩ সালে সুর্প্রীম কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। ক্ষমতাসীন পাক সরকারের আমলে সুনামগঞ্জ কলেজে কনজারভেটিভ প্রগ্রেসিভ পার্টির একক আধিপত্য ছিল। এ দলের আধিপত্য ভেঙ্গে দিয়ে সুশীল দত্ত,গুলজার আহমদ,কাজল দাস,গোলাম রব্বানী,সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও আলী ইউনুছ প্রমুখ প্রতিভাবান ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়নের মজবুত ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকাবস্থায় ১৯৬৯ সালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারী দলের নেতাকর্মীরা দিরাই উপজেলা সদরে তার উপর সন্ত্রাসী হামলা করে। এর প্রতিবাদে দিরাই বাজারে এক বিশাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি গোলাম রব্বানীসহ মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। এ প্রতিবাদ সভাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জীবনের প্রথম রাজনৈতিক সভামঞ্চের বক্তৃতায় স্থানীয় জনগন ও প্রকৃতির আশীর্বাদ কুড়িয়ে নেন তিনি। অন্যায়ের প্রতিবাদী ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। “দুখু সেন জিন্দাবাদ,দুখু তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে” শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় ভাটির জনপদ। দিরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল কদ্দুছ বলেন,তিনি আমাদের ৪ বছরের সিনিয়র ছাত্র ছিলেন। এমসি কলেজে হিন্দু হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতেন তিনি। এসময় কলেজ ক্যাম্পাসে আয়োজিত গান কবিতা নাটকসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্টানগুলোর মধ্যমনি ছিলেন তিনি। সেসময় দিরাই থানার ধনাঢ্য অভিজাত ঘরের শিক্ষিত ছাত্র যুবকেরা নাটক যাত্রা ও গানের অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ করতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নাটক বিশেষ করে সিরাজউদ্দোল্লাহ ও মোহনলাল চরিত্রে অভিনয় করে তাকে সুনাম অর্জন করতে দেখেছেন অনেকে। সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস আওয়ামীলীগ নেতা বেলায়েত হোসেন বলেন,কলেজে অধ্যয়নকালে সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রতি অসম্ভব আগ্রহ ছিল তার। তৎকালীন তুখোড় বক্তা বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক গবেষক প্রকাশক সাংবাদিক আব্দুল আই হাছন পছন্দ স্যারের নেতৃত্বে মহকুমা সদরে যতগুলো নাটক ও সাংস্কৃতিক আড্ডা অনুষ্ঠিত হতো সবগুলো আড্ডার প্রাণ ছিলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। বিভিন্ন যাত্রা নাটকের সংলাপ তিনি এত বিশুদ্ধভাবে উচ্চারন করতেন যা শোনার জন্য শ্রোতা দর্শকরা ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গুনতো। ১৯৬৫-৬৬ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় জগন্নাথ হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। রাজনৈতিক মঞ্চে বক্তৃতা দানকালে কখনও তাকে কোন কাগজপত্রের সাহায্য নিতে হয়নি। পররাষ্ট্র নীতিসহ যেকোন কঠিন বিষয়ের উপর দাড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তৃতা দেন তিনি। গ্রাম গঞ্জের মানুষ তার জনসভার কথা শুনলেই বগলে ছাতা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেটে থানা সদরে এসে তার বক্তৃতা শুনতেন। তিনি জীবনে অসংখ্য বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু কখনও ভাবাবেগ বা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হননি। তাছাড়া যা তিনি করতে পারবেন না বলে মনে করতেন এইরুপ মিথ্যা ওয়াদাও তিনি কখনও করেননি। আজ পর্যন্ত তার সম্পূর্ণ বক্তৃতা বিবৃতি ঘেটে কেউ দেখাতে পারেননি তিনি বিরোধী দলে থাকাকালে যে প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন ক্ষমতায় এসে তা ভ‚লে গেছেন। মডেল মানুষ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের জীবন হতে ভবিষ্যত প্রজন্মের নেতাকর্মীদের শিক্ষা গ্রহনের যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। সংসদের নির্বাচনের পূর্বে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে গণ সংযোগ এর পাশাপাশি হাটেবাজারে ছোট ছোট সভা করে সর্বশেষ নির্বাচনী সমাবেশ করতেন থানা সদরে। জনসভাগুলোতে তিল ধারনের কোন ঠাই থাকতোনা। মানুষের উপস্থিতি হতো বেশী। হৈ হুল্লোড় উত্তেজনা শ্লোগান এর কমতি হতোনা কোথায়ও। যেই মাইকে তাঁর নাম ঘোষনা হতো তখনই দাড়িয়ে থাকা সমবেত জনতা মুহুর্তের মধ্যে বসে যেতো। মিশেলী অথচ সকলের বোধগম্য আশ্চর্য্য সাবলীল গতিশীল মিস্টি কথায় বক্তৃতা দিতেন তিনি। এত লোক থাকলেও কেউ টু শব্দটি করতোনা। বিশাল জনসমুদ্র তাঁর প্রত্যেকটি কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবণ করতো। তাহার বাচনভঙ্গিতে থাকতো যাদু। এমন সরস সুন্দর সাবলীল ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক বক্তৃতা তিনি ছাড়া বাংলাদেশে আর কেউ দিতে পারে বলে দিরাই শাল্লার জনগন কখনও মনে করেননা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের হাজার হাজার মিছিল মিটিং সমাবেশ করতে গিয়ে সমাবেশে লোক শ্রোতা আনার জন্য তাকে কখনও কোন টাকা খরচ করতে হয়নি। কখনও টাকা দিয়ে তাকে ভোট ক্রয় করতে হয়নি। একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া স্বত্তেও তিনি কথায় কথায় ইনশাল্লাহ,শুকুর আলহামদুলিল্লাহ এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনের প্রযোজ্য আয়াতের উদ্বৃত্তি দিয়ে বক্তৃতা করে অনেক সময় সমবেত জনতাকে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিতেন। মুসলমানদের বৈবাহিক অনুষ্ঠান ও ঈদুল আযহার সময় বাড়ী বাড়ীতে পেটপুরে গরুর মাংস ভক্ষণ করতেন। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ও বিপুল কর্মশক্তির অধিকারী এই মানুষটি থামতে জানতেননা। বাধা আসলে আরোও এগিয়ে চলতেন। দীর্ঘ বিশ্রাম বহনকারী আরামপ্রিয়ও ছিলেননা তিনি। কর্মহীন জীবন আর বিলাসের গৌরব কখনও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। জীবনের সংগ্রামে তিনি ফুটাতে চেয়েছিলেন একটি ফুটন্ত গোলাপ। সেবার সাধনায় যে গোলাপ হবে উজ্জল,শত কাটার লাঞ্চনা সহ্য করেও জন্মগত অধিকার আদায়ের বাসনায় সেটি হবে আলোকিত এরকম একটি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিময় সমাজ গঠনই ছিল তার অঙ্গীকার। ঈর্ষনীয় দৈহিক সৌন্দর্যের গঠন আর অগাধ মানসিক শক্তির অধিকারী এই নেতাকে ভাটি অঞ্চলের মানুষ অমিততেজী সিংহপুরুষ হিসেবেই জানেন।
প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে তিনি অন্যতম। দেশের গণমানুষ তাকে এক নামে চেনে ও জানে। আত্মিক অনুভ‚তির মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকার সাধারন মানুষের হাসি-কান্না,চাওয়া-পাওয়া ও আশা আকাঙ্কার কথা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারতেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের মূল আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য দেশের আপামর জনসাধারনের মধ্যে সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির চিন্তাধারার জীবন জোয়ার সৃষ্টি এবং পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থাকে সুসংহত করে সার্থক গণতন্ত্রের পথে পরিচালনার কাজে তিনি সর্বদাই নিয়োজিত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে সংবিধানের বুকে কুঠারাঘাত করে খুনী মোস্তাকসহ সামরিক সরকাররা ক্ষমতা দখল করে তাঁকে নীতিচ্যুত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। উপ-রাষ্ট্রপতি,উপ-প্রধানমন্ত্রী.স্পীকার ও আইনমন্ত্রীর প্রস্তাব দিয়েও তাকে সামরিক সরকারগুলো নীতিচ্যুত করতে পারেনি। মূলধারার সাথে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছেন সবসময়। দল পরিবর্তন করলেও তিনি কখনও নীতির পরিবর্তন করেননি। নিজেকে বিক্রি করে দেননি স্বৈরাচারী রাজনীতির মন্ত্রীত্ব গ্রহন বা অন্য কোন লোভলালসার কাছে।
তিনি একজন চারন রাজনীতিবিদ। বড় বড় রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তৃতা করা,রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে সাক্ষাৎ,আলোচনা এবং স্বীয় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক বিস্তৃতির ব্যপারে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে সফর এর মধ্যে দিয়ে তিনি সীমাহীনভাবে নিয়োজিত ছিলেন। আইনজীবী হিসেবেও অসাধারন প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। যার পক্ষ সমর্থন করতেন তার স্বার্থ রক্ষার তাগিদে আদালত কক্ষে তিনি আইনের যে,ক্ষুরধার বাকযুদ্ধ পরিচালনা করতেন তা সত্যিই ছিল বিস্ময়কর। আইনের নির্ধারিত গন্ডীর মধ্যে নিজেকে সীমিত রেখেও তিনি যে বজ্রভাষায় বক্তৃতা করতেন তাতে গোটা আদালত কক্ষে এক অদ্ভুত আলোড়নের সৃষ্টি হতো বলে তার সমসাময়িক আইনজীবীরা জানান। তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক ফাকিবাজী বা লুকোচুরি বলতেও কিছু ছিলনা। তিনি যা ভাবতেন এবং যা সত্য ও যুক্তিসঙ্গত মনে করতেন তা অকপটে বলার সৎসাহস তার ছিল। মাওলানা ভাসানীর মতো দেশে হক কথা বলার রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ও অন্যতম। প্রয়োজনে নিজ দলের বিরুদ্ধেও ন্যায় কথা বলতে তিনি দ্বিধাবোধ করেননি।
আজীবন শ্রোতের প্রতিক‚লে রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ একাধিকবারের বিরোধী দলীয় এমপি সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত একজন উন্নয়নকামী রাজনীতিবিদও বটে। হাওর অধ্যুষিত বিশাল নির্বাচনী এলাকায় বিদ্যুতায়ণ,পাকা সড়ক যোগাযোগ স্থাপন,স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং মসজিদ মাদ্রাসা মন্দির ছাড়াও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনেক উন্নয়নের নজীরও রেখে গেছেন তিনি। সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক নামকরা নেতাদের সাথে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছেন। কিন্তু জয় পরাজয়ের খেলায় কাউকেই প্রতিপক্ষ হিসেবে গ্রহন করেননি। সকলকেই আপন করে নিয়েছেন। ১৯৭০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাওরাঞ্চলে নির্বাচনী সফরে এসে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের মনোনিত ২ জন প্রার্থী যথাক্রমে আব্দুস সামাদ আজাদ ও অক্ষয় কুমার দাশের পক্ষে ভোট চান দিরাই শাল্লা জামালগঞ্জবাসীর কাছে। এই জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনা ও জানার পরও তিনি সেদিন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকদের নিয়ে। ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী গোলাম জিলানী চৌধুরীর সাথে প্রবল প্রতিদ্ব›িদ্বতার পর নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে শেষ পর্যন্ত মামলা মোকদ্দমার দীর্ঘ ঝামেলা পোহাতে হয় থাকে। এরপরও সিনিয়র গোলাম জিলানীর প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন আজীবন। একই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের মনোনিত প্রার্থী ছিলেন জামালগঞ্জের ফেনারবাক গ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা আলী আমজাদ চৌধুরী। তাঁর প্রতিও সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তিনি। জনাব আলী আমজাদ চৌধুরীর ছেলে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতা বিপ্লব শাহরিয়ার যথার্থই বলেছেন, “কালনী নদীর বুকে স্কুল পালানো বালকের দল হয়তো এখনো অবাধ্য সাঁতারে মগ্ন হয়, কালো জলের উজানে বেয়ে যাওয়া হয়তো কোনও এক জীবন মাঝির বৈঠার টানে কেঁপে উঠে নদীর তীর। উজান ধলের অন্ধকার রাতের পথ হারানো কোনও এক বাউলের ভেসে আসা অস্পষ্ট সুরের সাথে, দূর দিগন্তে আকাশের পানে তাকিয়ে থাকা উঁচু তাল গাছ নীরব স্মৃতির স্মারক হয়ে দখিনা বাতাসে হয়তো কাউকে খোঁজে বেড়ায়, কালিয়া গোটা হাওরের আফালের ঢেউয়ের সাথে সমান্তরালে বেড়ে উঠা কেউরালি আর ঝারমুনি ফুলেরা এখনো হয়তো কারো আলিঙ্গনের আশায় হাত বাড়িয়ে থাকে। পোতাবাড়ির পাশে কাচারি ঘরের বারান্দায় রাত কাটানো নরেন কাকার কানে এখনো ভেসে আসে দুখু সেনের দরাজ গলার ডাক। হয়তো এখনো জাতীয় সংসদের নবীন সদস্যরা খোঁজে বেড়ায় একজন অভিজ্ঞ শিক্ষগুরুকে। আমি সবসময় খুঁজি আমার দেখা প্রথম রাজনীতির নায়ককে। কি লম্বা বাবরী চুল। পাঞ্জাবী পড়া। হাতের নীচে শালের ভাঁজ। বুকের বাম অংশে ফুলের কারুকাজ। সিনেমার নায়কের মতো হেঁটে আসা। সময়টা ১৯৭৯ সাল। শ্যামারচর বাজারে আব্বার নির্বাচনী মিটিং। ৭ মার্চের ভাষনটি আব্বা আমাকে মুখস্থ করিয়েছিলেন ছোটবেলাতেই। তাই আব্বার যতো মিটিং এ যেতাম সবাই আমাকে মাইক ধরিয়ে দিতো ভাষনটি শুনার জন্যে। সেই দিন বাজারে সুরঞ্জিত সেন কাকা আগেই এসেছিলেন। হয়তো দূরে বসে শুনছিলেন। হঠাৎ দেখি উপস্থিত লোকজন একজন উঁচু মানুষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর তিনি আমাদের মঞ্চের দিকেই আসছেন। এসেই আমাকে আদর করে বললেন, তোমাকে আশীর্বাদ করতে এলাম। উপস্থিত সবাই তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছেন। আব্বা বললেন, সালাম করো। আমি পায়ে ধরে সালাম করলাম। একসময় তিনি আব্বাকে বললেন, আমি থাকলে তোমার মিটিং হবে না। তুমি মিটিং করো। আমি চলে যাই। কি সৌহার্দ্য। কি উদারতা। প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীর মঞ্চে চলে এসেছেন। কি মনোবল আর রাজনৈতিক শিষ্ঠাচার! ৯১ সালের মাঝামাঝি। সংসদের লিফটে উঠছি। লিফটের ভিতরে জায়গা হচ্ছে না। আমি ছোট, আর দর্শনার্থী। বাকিরা সবাই এমপি এবং সংসদের কর্মকর্তা। আমি নেমে যাচ্ছিলাম। তিনি তখন একজন কর্মকর্তাকে বললেন, ও আমার সাথে যাবে। আপনারা একজন পরে আসুন। কর্মকর্তা নামলেন। সংগী কর্মকর্তার মনে হয় একটু মন খারাপ হলো। তিনিও নামতে চাইলেন। বললেন, স্যার আপনারা যান। আমরা বরং পরেই আসি। সুরঞ্জিত কাকা তখন কর্মকর্তাকে হেসে বললেন, আরে আপনারা সব নেমে গেলে আমরা স্মার্টনেস শিখমু কই থাইক্ক্যা? এই দেখুন, আপনি কালা রং এর জুতা আর চকোলেট কালারের বেল্ট পড়ছেন। কি সুন্দর লাগতাছে। কর্মকর্তা তখন বললেন, সরি স্যার তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছি। তাই একটু ভুল হয়ে গেছে। সুরঞ্জিত কাকা, হেসে বললেন, রক্ষা হইলো। আপনি যে বুঝতে পারছেন। লিফট থেকে নেমে, আমাদের অন্য একজন এমপি সাহেব বললেন, দাদা, দুই রঙের জুতা ও বেল্ট অইলে সমস্যা কি? কাকা বললেন, তুমি তো আধা সরকারি আধা বিরোধী। তোমার লাইগ্যা সমস্যা নাই। কিন্তু যারা স্মার্ট অফিসার তারা জুতার কালারের সাথে মিলাইয়াই বেল্ট পরবে। এটাই নর্মস অব ফ্যশান। রাজনীতির এই ফ্যাশানবল স্মার্ট মানুষটিকে হয়তো কালনী নদীর জলের ঢেউ এখনো খোঁজে ফিরে। খোঁজবে অনন্ত কাল। যতদিল কালনী নদীতে জল থাকে ”।
সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সংসদীয় রাজনীতির প্রিয় গণমানুষের একজন প্রাণের শাসক। আন্তরিকতা দিয়ে তিনি অন্যের মনকে কাছে টেনে নিতেন। একাজে আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য কারো সাহায্য তাকে কখনও নিতে হয়নি। নিজেদের ক্ষমতা গদিকে টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানী করার প্রবণতার ঘোর বিরোধীও তিনি। বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্টে প্রবর্তিত সকল কালাকানুনের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তিনি। ন্যায়নীতি,ন্যায়বিচার,আইনের অনুশাসন,মানবতা ও মানবীয় মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরিচালনার পক্ষপাতি ছিলেন সবসময়। মূলত একারনেই সার্বজনীন গণতন্ত্র,আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর নিরলস সাধনা প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
পন্ডিত ঈম্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ন্যায় তিনিও একজন প্রচারবিমুখ দানশীল মানুষ। ৮ম বারের এমপি হিসেবে সৎপথে থেকে সাধ্যমতো আয়ের সাথে সাথে দান করেছেন বদান্যতার সাথে। তাঁর নিকট যুক্তসঙ্গত সাহায্য চাইতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছে এরকম লোক কমই পাওয়া যাবে। তিনি কোন সময় তার নীরব দানের কথা অন্য কারও নিকট প্রকাশ করতেননা। আবার কাজ করে দিয়েছেন এরকম কম লোকই আছেন যারা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া নিবাসী প্রখ্যাত সাধক কবি,ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলনের বিপ্লবী নায়ক,ভাষা সৈনিক,মুক্তিযুদ্ধের মহান সংগঠক, ৫৪ র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ৭০ এর নির্বাচনে স্বাধীনতার প্রতীক নৌকা ও জাতির জনকের পক্ষে গণসঙ্গীত পরিবেশনকারী নিবেদিত প্রয়াত মরমী কবি গানের স¤্রাট কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন) জীবনের শেষ গানে প্রিয় মানুষ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেয়েছেন,
“ভালমন্দ সব করে মালিকে দয়ার আছে কে।।
কেউরে ফকির কেউরে বাদশাহী কেউ ভক্তে পায় শাহানশাহী
কেউতো আল্লাহর রাহে চলছে দুনিয়াতে।।
কেউর পড়নে শাড়ি ছিড়া কেউর পড়নে ছিরা ত্যানা
জাত বাচেনা সম্মান কেমনে ঢাকে।।
কেউ ঘুমাইতে পায়না ছাটি সর্বদায় বিছানা মাটি
বালিশ বানায় নিজের হাত দুইটিকে।।
কেউ থাকে কুড়ে ঘরে কেউ থাকে তেতালার উপরে
জাক মারতাছে দিয়া লেপ তোষকে।।
গিয়া ঢাকা শহরেতে পড়লাম টাকার সংকঠেতে
মনের দুঃখ কইলাম সেনবাবুকে।
নিয়া বাবুর গাড়িতে ভর্তি করে দেন পিজিতে
অপারেশন করান এই লোকটিকে।।
আমার কত ভাগ্যের জোর আদায় করি খোদার শুকুর
বাঁচাইলেন কঠিন ব্যাধি থেকে।।
কয় কবি কামাল পাশা, অকূলে মুর্শিদ ভরসা
ধনপ্রান বিলাইবো মোর আল্লাকে”।।
সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত একজন সুবক্তা। সংসদীয় দলের প্রতিনিধি দলনেতা হিসেবে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন অর্ধ দুনিয়া। সফল রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সার্বক্ষনিক সুযোগ্য পার্লামেন্টারিয়ান ছাড়াও অনেকের ক্ষেত্রবিশেষে বিরোধীদলের ভরসাস্থল ছিলেন তিনি। উচিত কথায় সকল দলমতের মানুষকে তিনি সহজেই তার প্রতি আকৃষ্ট করতেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যেমন “নেতাকে যেমন দেখিয়াছি শীর্ষক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন,“জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে এত বেশী বিরল চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়াছিলো যে,তাহার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গেলে কয়েক খন্ড পুস্তক রচনার প্রয়োজন”। সুদীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর তাঁহার সংস্পর্শে থাকার ফলে আমার মনের কোনে তাঁহার যে ছবিটি অংকিত হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তাহা কোন সাধারন মানুষের নহে। বরং একজন প্রায় অতি মহা মানবের”। অনুরুপভাবে একজন অনুসারী স্নেহের পাত্র হিসেবে শ্রদ্ধেয় কাকা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপির ক্ষেত্রে আমার বক্তব্যও তাই। আমার ২৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় তাঁহার মধ্যে আমি যে,মানুষটির পরিচয় পেয়েছি তা থেকে বুঝতে পেরেছি একজন অসাধারন অজেয় আলোকিত ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন তিনি।
ভারতের গণপরিষদে কংগ্রেসের বহু সংখ্যক বক্তার সামনে দাড়িয়ে মুসলিম লীগের পক্ষে যেমন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একমাত্র বক্তা ছিলেন তেমনি ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সবকটি অধিবেশনে জাতির জনকের সামনে দাড়িয়ে একমাত্র বিরোধী দলীয় সদস্য হিসেবে সারাদেশ তথা জাতির প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান ও বক্তা হিসেবে গৌরবোজ্জল ভ‚মিকা পালন করেছেন সুনামগঞ্জের প্রাণপুরুষ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপি। সেদিন তিনি বলেছিলেন,৩০ লক্ষ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই সংবিধানের আদর্শ হবে স্বাধীনতা স্বায়ত্বশাসন ও গণতস্ত্র এবং এর মূলনীতি হবে সেই নীতি যে নীতির দ্বারা বাংলাদেশের জনগনই হইবে তাহাদের ভাগ্য নিয়ন্তা।
সাংবিধানিক রাজনীতির পথ ধরে দেশে শোসনহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কাঙ্কিত স্বপ্নকে লালন করে আত্মবিশ্বাস আর ভালবাসায় তিনি যে দীর্ঘ রাজনীতির পথ অতিক্রম করেছেন ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী রোববার ভোরে তার অকাল মৃত্যুতে সেই পথ কতটুকু পিচ্ছিল বা বাধাগ্রস্থ হবে সে প্রশ্ন আজ সকলের।
উল্লেখ্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ১৯৭০ সালে কুড়েঘর প্রতীক নিয়ে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে সুনামগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকার (দিরাই-শাল্লা) প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এমপিএ,১৯৭৯ সালে দোয়াত কলম প্রতীক নিয়ে একতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে, ১৯৮৬ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এনএপি ও ৮ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে, ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রী দলের মনোনয়নে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে নিজ আসন থেকে ৫০৫ ভোটে পরাজিত হলেও পরবর্তীতে হবিগঞ্জ-২ আসন থেকে উপনির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। এই সময় জাতীয় সংসদে ও সরকারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা পদে মন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১,২০০৮ ও ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে নিজ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জীবনে ১০ বার সংসদ নির্বাচনে প্রবল প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে মোট ৮বার তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত এমপি হিসেবে বিশ্বব্যপী সুনাম অর্জন করেন। ২বার তাকে পরাজিত করানো হয় নানা ষড়যন্ত্র ও কুট কৌশলের আশ্রয়ে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশে প্রগতির রাজনীতিতে দূর্দন্ড প্রতাপে বিচরনকারী সপ্তম জাতীয় নেতা। সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য পদে দায়িত্ব পালন ছাড়াও এই দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামীলীগের পার্লামেন্টারী মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যও ছিলেন আমৃত্যু।
১৯৭০ সালের নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তার কাছে বঙ্গবন্ধুর তারবার্তা পৌছলে তিনি স্থানীয়ভাবে দিরাই শাল্লা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে কিছুদিনের মধ্যেই চলে ভারতীয় সীমান্ত টেকেরঘাট ও বালাটে। সেখানে গড়ে তোলেন ৫নং সাবসেক্টর। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার লক্ষে টেকেরঘাট সাবসেক্টর গঠন করে তিনি প্রথমে এই সাবসেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় এক হাজারেরও অধিক ছাত্র যুবককে শসস্ত্র ট্রেনিং দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণ করেন। দেশকে স্বাধীন ও শত্রæমুক্ত করতে নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে রণাঙ্গনে শত্রæর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য লড়াই ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ট নেতৃত্ব দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনী সভায় শাল্লা উপজেলার সভামঞ্চে,পরবর্তীতে দিরাই উপজেলা সদরে ও ঢাকায় আওয়ামীলীগের জনসভায় পর পর তিনবার গ্রেনেড বোমা হামলার শিকার হন তিনি। রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে এক বছরের ব্যবধানে মন্ত্রীত্ব থেকে তাকেঁ সরে যেতে বাধ্য করা এবং তার উপর আনীত অপবাদকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন তার নির্বাচনী এলাকার জনগন। দেশ জাতি ও দলের জন্য তার অপরিসীম ত্যাগ,ভালবাসা ও সক্রিয় অবদান রাখার পরও তাকে সরকার উপযুক্ত মূল্যায়ন করেনি বলে দাবী দিরাই শাল্লাবাসীর।

পরিশেষে এটুকুই বলবো, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত শুধু শুধু একটি নাম নয় একটি ইতিহাস,একটি জীবন্ত কিংবদন্তীর নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সাধনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সততা সাম্য উদার মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রাণপুরুষ। সম্প্রীতির রাজনীতির মডেল মানুষ হিসেবে বাংলার আপামর জনসাধারনকে অন্যায় অত্যাচার,বঞ্চনা বৈষম্য ও শোসন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে দখল করে নিয়েছেন মর্যাদার আসন। পার্লামেন্টারী রাজনীতির গুরু হিসেবে তার সফল অগ্রযাত্রা ছিলো। আন্তর্জাতিক রাজনীতির রোনাল্ডো,জাতীয় রাজনীতির হেডমাস্টার,আঞ্চলিক রাজনীতির চান্সেলর,উন্নয়নের রাজনীতির উজ্জল নক্ষত্র,ইতিবাচক রাজনীতির কিংম্যাকার,অভিজ্ঞতার রাজনীতির সোহরাওয়ার্দী,বিদ্রোহের রাজনীতির ভাসানী,সাহসের রাজনীতির শেরেবাংলা,জনপ্রিয়তার রাজনীতির জাতীয় নেতা, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির রাজা,ভাটি অঞ্চলের রাজনীতির সিংহপুরুষ এবং সর্বশেষ জাতির জনকের আদর্শে অণুপ্রাণিত বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেশপ্রেমিক খাটি বাঙ্গালী রাজনীতিবিদ ইত্যাদি যে বিশেষণে বিশেষায়িত করা হউকনা কেন যোগ্যতার রাজনীতিতে তিনি সবসময়ই তিনি  অনুসরনীয়,অজেয় ও অনুকরনীয়। একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও চারন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সফলতাকে প্রেরনায়,তাঁর আলোয় সকলকে উদ্ভাসিত করতে সর্বোপরী তাকে জানার ও মানার মনোভাবকে সকলের মাঝে তুলে ধরার অভিপ্রায়ে আমি প্রকাশ করেছিলাম,“জননেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত : শ্রেষ্ট পার্লামেন্টেরিয়ান” আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থটি। তিনি যে সংসদে দাড়িয়ে একদিন বলেছিলেন,আজীবন এই সরকারকে মানুষ মনে রাখবে। আমি মনে করি সুরঞ্জিত সেন গুপ্তও আজীবন বাংলার জনগনের হৃদয়ের মনিকোটায় অমর হয়ে থাকবেন। আজ যোগাযোগ মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মুখে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত নাম্বার ওয়ান পার্লামেন্টারিয়ান কথাটি শুনে আমার অসম্ভব ভাল লেগেছে। আমি এ মহাণ নেতার বিদেহী আত্মার শান্তি ও তাঁর শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।

 

 

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply