সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ ৭:২০ অপরাহ্ণ

ভয়ঙ্কর গ্যাং কালচার কিশোরেরা এই অপরাধের শিকার

কিশোর কিলোরীদের চালচলন জীবনযাত্রা নিয়ে এখন বিশেষ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অথচ কৈশোর মানবজীবনের বাঁক ফেরার বিশেষ কালপর্ব। এ সময় কিশোর-কিশোরীরা থাকে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ। এই বয়োঃসন্ধিকাল থেকে তারা যেমন ভয়ঙ্কর পথে বাঁক নিতে পারে, তেমনি মহৎ কিছুর সূচনাও করতে পারে। তবে সেটি কেবল তার নিজের ওপরেই নির্ভর করে না, এক্ষেত্রে পরিবার, অভিভাবক, শিক্ষকমণ্ডলী, সমাজ থাকে নেপথ্য চালিকাশক্তি। ভাল নির্দেশনা পেলে এবং তাতে সে প্রভাবিত হলে জীবন ইতিবাচক ভবিষ্যতের দিকে গতি নেয়। বিপরীত হলে তা ভয়ঙ্কর কানাগলির বিপদাপন্ন অন্ধকার জগতের দিকে ধাবিত হয়।

 

 

দেশে সাম্প্রতিককালে ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত পেয়েছে কিশোরদের একটি অংশ। নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে কিশোরদের ছোট ছোট দলের। কিশোরেরা দল গড়ছে অদ্ভূত সব নামে এবং প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাংয়ের ওপর চড়াও হচ্ছে। প্রতিটি কিশোর গ্যাংই কোন না কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে তাদের যথোচিত শাস্তিও দেয়া যাচ্ছে না। কিশোর অপরাধীদের একটি বড় অংশের ভেতর সম্ভাবনা রয়েছে বড় হয়ে মারাত্মক অপরাধী হওয়ার। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের হুমকিস্বরূপ। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায় দেখা যায়, দেশে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। রাজধানীসহ সারাদেশে হাজার হাজার গ্রæপ। সেগুলোর নামেরও নানা বাহার-নাইন স্টার, ডিস্কো বয়েজ, বিগ বস ইত্যাদি। অধিকাংশই কিশোর বয়সী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ বেকার, বখাটে। আবার বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার বস্তিবাসী কিশোরও রয়েছে। এসব গ্রæপের আবার গ্যাং লিডারও আছে, যারা অপেক্ষাকৃত অল্প শিক্ষিত এবং মস্তান শ্রেণীর। তাঁদের দ্বারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে মারামারি, হানাহানি, প্রতিশোধ স্পৃহা লেগেই থাকে। বিগত পনেরো বছরে ১০৬ জন কিশোর খুন হওয়ার তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। তবে গ্রæপ ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবেও কিশোররা খুনোখুনি করছে।

বাংলাদেশে কিশোরদের হিরোইজমের মধ্য দিয়ে গ্যাং কালচার শুরু হলেও এখন ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। মূলত কিশোর বয়সে একটা হিরোইজম চিন্তা-ভাবনা থেকেই গ্যাং কালচার গড়ে উঠেছে। দিনকে দিন আশঙ্কাজনক হারে দেশজুড়ে- হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। কিশোর অপরাধের নৃশংসতার মাত্রা তাদের মূল্যবোধ ও মানবিকতাবোধকে নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। প্রতিটি এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠছে আলাদা আলাদা কিশোর গ্যাং। কোনো কোনো এলাকায় একাধিক গ্রæপ গড়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, নিজেদের অবস্থান জানান দিতে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা স্ট্যাটাস দেয়। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমুতে তারা একে অপরের সঙ্গে ভাববিনিময় করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবারিত সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাঁরা নেতিবাচক অবস্থানও তৈরী করছে। এই বিষয় নিয়ে অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে। পারিবারিক ও সামাজিক কারণ ছাড়াও শিক্ষাগত কিছু কারণও কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার জন্য দায়ী। পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায় নি¤œ আয়ের পরিবারের কিশোররা নানা কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে হতাশায় ভোগে। এসব কিশোরই এক সময় মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এরা মাদকের টাকা যোগাড় করতে এক সময় মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এরা মাদকের টাকা যোগাড় করতে এক সময় ছিনতাই, মাদক বিক্রিসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাÐে জড়িয়ে পড়ে। নেশা করে পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন মোড়ে বসে তরুণী ও কিশোরীদের ইভটিজিং করে। পাড়া-মহল্লায় নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে একসঙ্গে অনেক কিশোর জোটবদ্ধ হয়। অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যই উচ্চৈ শব্দে মোটরসাইকেল চালিয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াতে পছন্দ করে।

দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়। কিশোর গ্যাং পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য রীতিমত হুমকি। এক সময় কিশোর অপরাধীরাই বড় বড় অপরাধী হয়ে মারাত্মক সব অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। কোন কোন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যের দুর্ধর্ষ জঙ্গী হয়ে ওঠাও বিচিত্র নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ কিশোর গ্যাংয়ের নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হচ্ছেন। একজন সাধারণ মানুষও অনেক সময় তাদের হাত থেকে রেহাই পান না।

কিশোর গ্যাংয়ের একটি বড় অংশ আসে পথশিশুদের পরিবার থেকে, পরিস্থিতির শিকার হয়ে। পথশিশুদের পরিবার থেকে, পরিস্থিতির শিকার হয়ে। পথশিশু শব্দটিই এক অসহায়ত্বের নাম। তাঁদের জন্মই যেন আজন্ম পাপ। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির পানে, আমরা এখন উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার স্বপ্ন দেখি। অথচ এই দেশেই বঞ্চিত পথশিশুরা এখনো স্বপ্ন দেখে এক বেলা পেট ভরে খাওয়ার। যে বয়সে তাঁদের বগলের নিচে বই খাতা থাকার কথা, সে বয়সে তারা জীবিকার সন্ধানে ময়লা আবর্জনার স্তূপে ঘুরে। তাঁরা ব্যস্ত সড়কের ফুটপাতে ক্লান্ত দেহে পড়ে থাকে গুটিশুটি মেরে। রোদ বৃষ্টি তাঁদের নিয়তির সাথে মিশে গেছে। শিশু বয়সেই তারা জীবিকার সন্ধানে অল্প টাকায় ভারী কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। ফলে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। শিশু বয়সেই তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ না পাওয়ায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাÐে। চুরি, রাহাজানি, ছিনতাই ও মাদকের মতো মরণ নেশায় তারা জড়িয়ে পড়ে। বাবা-মা, আপনজনদের ভালোবাসা না পাওয়া তাদের মধ্যে এক ধরনের একাকিত্ব ও হতাশার সৃষ্টি হয়। একাকিত্ব আর হতাশায় তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠে। যা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। কিশোর গ্যাং কালচারকে সমৃদ্ধ করে। বারবাড়ন্ত করে। গ্রæপ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাÐে জড়িত হয়ে পরার জন্য শুধু মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ফেসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাদিকে দোষ দেয়া যাবে না। শুধু থানা-পুলিশ দিয়েও হবে না। এক্ষেত্রে সবিশেষ গুরুদায়িত্ব রয়েছে সমাজ, পরিবার ও অভিভাবকদের, বিশেষ করে মা-বাবা, ভাই-বোনের। খেলাধুলা কিংবা পার্টির ছলে ছেলেটি কোথায় যায়, কি করে, কাদের সঙ্গে মেশে তা নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে। পাড়া-মহল্লার মুরব্বিরাও এক্ষেত্রে দেখভাল করতে পারেন। যথাযথ ভালবাসা দিয়ে সন্তানদের বোঝালে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারে। কিশোরদের সংস্কৃতিচর্চা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সন্তানের নরম গালে চুমুর আলপনা পৃথিবীর সব সুখ-শান্তি ও বেদনা কাব্যের চিত্রকল্প। সন্তান স্বর্গের উপমা। জান্নাতের প্রজাপতি। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, হৃদয় নিংড়ানো আলতো আদর তাকে সৎপথের সন্ধান দেয়।

সুসন্তান পরকালের সঞ্চয়পত্র। অনন্তকাল যাত্রার নির্ভরযোগ্য পুঁজি। পিতামাতার অমূল্য সম্পদ। তাদের সম্ভাবনা ও শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ পরিবেশেই তাদরে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাঁরাই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এইসব নীতিবাক্য শুনতে এবং ভাবতে বেশ ভাল লাগে। কিন্তু আমাদের এই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নির্ভরশীল করতে সঠিক পরিকল্পনায় এগুতে হবে। শিক্ষাই হলো এর মূল ভিত্তি। বিশেষ করে কর্মসংস্থানমুখী সমসাময়িক বাস্তভিত্তিক শিক্ষা।

শিক্ষা জাতি গঠনের মূল স্তম্ভ। আবার শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড ও বলা হয়ে থাকে। এসব বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নাই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রধান বৈষম্য হলেও আরও কিছু বৈষম্য জ্বলন্ত। জলজ্যান্ত। দূর করতে শিক্ষা বৈষম্য। আধুনিক যুগের ইতিহাস আলোচনা-পর্যালোচনা করলে দেখা যা, যুগে যুগে দেশে দেশে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, এর মূলে রয়েছে শিক্ষা। আমাদের সেদিকেই তী² নজর নিক্ষেপ করতে হবে।

কিশোর গ্যাং উত্তরণের ক্ষেত্রেও একই কথা। একই আবেগ। কিশোর অপরাধ কেবল দরিদ্র বস্তিবাসীর মধ্যে সীমিত নয়। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তেও এর বিস্তার। বিশেষত ১৪-১৮ বছর বয়সীরা। শিক্ষা লাভের সময়টা। গ্যাং কালচার পরিত্রাণের জন্য, এই অপতৎপরতা রোধ করতে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন তদারকির পাশাপাশি সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়তে হবে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিরোধ নয় কেবল, প্রতিকারে মনোনিবেশ ঘটাতে হবে।খন রঞ্জন রায় সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply