বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা

ইরান, চীন, ভারত ও আফগানিস্তানের চাপে পাকিস্তান নানা ধরনের নিরাপত্তা ইস্যুতে জটিল পরিবেশে বাস করছে। ঘোষিত পরমাণু অস্ত্র আছে, এমন ৯টি দেশের একটি হিসেবে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার ও ডকট্রিন অনুমিত হুমকির সাথে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। কয়েক দশক ধরে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হিসেবে পাকিস্তান এখন নিজস্ব ধরনের পরমাণু ত্রয়ী নির্মাণ করার প্রয়াস চালাচ্ছে, তার পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডারকে খাপ খাওয়াতে সামর্থ্যপূর্ণ ও বিপর্যয়কর প্রতিশোধমূলক হামলায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে চাচ্ছে।

পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচি শুরু হয়েছে ভারতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনায় ১৯৫০-এর দশকে। প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলীর একটি মন্তব্য বিখ্যাত হয়ে আছে: ভারত যদি পরমাণু বোমা বানায়, তবে আমরা ঘাস খেয়ে থাকব, এমনকি না খেয়েও থাকব, কিন্তু আমরাও পরমাণু বোমা বানাব।

১৯৭১ সালে ভারতের কাছে পরাজয়ের পর পরমাণু কর্মসূচি অনেক বেশি অগ্রাধিকার পায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করে, এই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর পাকিস্তান তার পরমাণু কর্মসূচি ত্বরান্বিত করে। ভারত ১৯৭৪ সালে ‘স্মাইলিং বৌদ্ধ’ নামে তার প্রথম বোমা পরীক্ষা করে। এর ফলে উপমহাদেশ পরমাণুকরণের পথ ধরে।

পাকিস্তান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও প্লুটুনিয়াম তৈরির গতি বাড়িয়ে দেয়। এই কাজে সহায়তা করেন পাশ্চাত্য থেকে দেশে ফেরা বিজ্ঞানী আবদুল কাদের খান।

পাকিস্তান ঠিক কবে তার পরমাণু বোমা তৈরি করেছে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলীর মেয়ে বেনজির ভুট্টো দাবি করেছেন যে তার বাবা তাকে বলেছেন যে প্রথম বোমা তৈরি হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। পাকিস্তান পরমাণু জ্বালানি কমিশনের এক সদস্য বলেন, তা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। বোমাটির সুপ্ত পরীক্ষা চালানো হয়েছিল ১৯৮৩ সালে।

বেনজির ভুট্টো পরে দাবি করেছিলেন যে ১৯৯৮ সালে ভারত তিন দিনের ব্যবধানে ছয়টি বোমা পরীক্ষার আগে পাকিস্তান তার বোমাগুলোকে অসংযোজিত অবস্থায় রেখে দিয়েছিল। ভারতের পরীক্ষার তিন সপ্তাহ আগে পাকিস্তান মাত্র এক দিনেই ৫টি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। প্রথমটি ছিল ২৫ থেকে ৩০ কিলোটনের, দ্বিতীয়টি ১২ কিলোটনের এবং বাকিগুলো সাব-কিলোটনের। এগুলো ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বোমা।

পাকিস্তান ষষ্ট ও শেষ পরীক্ষাটি চালিয়েছিল ১২ কিলোটনের বোমা দিয়ে। এটা করা হয়েছিল ভিন্ন পরীক্ষা রেঞ্জে। মার্কিন বিমান বাহিনীর পরমাণু শনাক্তকরণ বিমান ‘কনস্ট্যান্ট ফোনিক্স’ এ তথ্য জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি ছিল প্লুটুনিয়াম সমৃদ্ধ বোমা। পাকিস্তানের বোমাগুলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ হওয়ায় এবং একটি প্লুটুনিয়াম হওয়ায় অনেকে মনে করেন, এটি আসলে ছিল উত্তর কোরিয়ার বোমা। উল্লেখ্য, এ কে খানের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই উত্তর কোরিয়া পরমাণু প্রযুক্তি হাসিল করেছিল। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার ক্রমাগত বাড়ছেই। ১৯৯৮ সালে তাদের হাতে ছিল ৫ থেকে ২৫টি বোমা। বর্তমানে পাকিস্তানের অস্ত্র ভাণ্ডারে আছে ১১০ থেকে ১৩০টি পরমাণু বোমা। ২০১৫ সালে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস এবং স্টিমসন সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী পাকিস্তান বছরে ২০টি বোমা বানানোর সামর্থ্য রাখে। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে পাকিস্তান অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পরমাণু অস্ত্রধারীতে পরিণত হবে। তবে অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাকিস্তানের হাতে অদূর ভবিষ্যতে কেবল ৪০ থেকে ৫০টি পরমাণু বোমা থাকতে পারে।

পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র রয়েছে সামরিক বাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক প্লানস ডিভিশনের হাতে। এগুলো মূলত মজুত রয়েছে পাঞ্জাব প্রদেশে। অস্ত্রগুলোর পাহারায় রয়েছে ১০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা। পাকিস্তান দাবি করে আসছে যে একেবারে শেষ মুহূর্তে যথাযথ কোডের মাধ্যমেই বোমাগুলো প্রয়োগের জন্য তৈরী করা হবে। ফলে দুর্বৃত্তদের হাতে তা পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে অনেক শক্তিশালী ভারতকে নিবৃত্ত করার ওপর ভিত্তি করেই পাকিস্তানের পরমাণু ডকট্রিন তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা বাড়লে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়বে। প্রতিবেশী ভারত বা চীনের মতো পাকিস্তানের ‘প্রথম ব্যবহার নয়’ ধরনের কোনো মতবাদ নেই। তারা মনে করে, তাদের এই অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। বিশেষ করে প্রচলিত অস্ত্রে ভারত সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার কারণে তারা স্বল্প মাত্রায় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের পক্ষপাতী।

পাকিস্তান এখন ত্রিমুখী পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ পদ্ধতি উদ্ভাবন করছে। অর্থাৎ স্থল, আকাশ ও সাগর পথে এই অস্ত্র ব্যবহার করতে চায় তারা। আমেরিকার তৈরী এফ-১৬এ জঙ্গি বিমান ও ১৯৯৫ সালে ফ্রান্সের সরবরাহ করা মিরেজ বিমান সংস্কার করে তারা আকাশপথে পরমাণু বোমা ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করেছে। ভারতের বিভিন্ন নগরী ও অন্যান্য টার্গেটে আঘাত হানার জন্য এসব বিমান ব্যবহার করতে চায় পাকিস্তান।

স্থলভিত্তিক আক্রমণের জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের সহায়তা নেয়ার পরিকল্পনা আছে পাকিস্তানের। তারা এই লক্ষ্যে চীন ও উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সংস্করণের হাতাফ (হাতাফ ৩, ১৮০ মাইল; হাতাফ ৪, ৪৬৬ মাইল; হাতাফ ৫, ৭৬৬ মাইল; তাতাফ ৬, ১২৪২ মাইল) ক্ষেপণাস্ত্র তারা এ কাজে ব্যবহার করতে চায়। আর শাহিন ৩ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে পারে ১৭০৮ মাইল দূরে।

সাগর পথে এই অস্ত্র প্রয়োগ করা হবে বাবর শ্রেণির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। রণতরীতে এই ক্ষেপণাস্ত্র বাসিয়ে ভারতের টার্গেটে আঘাত হানতে চায় পাকিস্তান। গত জানুয়ারিতে বাবর ৩ তারা পরীক্ষা করেছে সাবমেরিন থেকে।

স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান এমন পরমাণু সক্ষমতা গড়ে তুলছে যা পরমাণু অস্ত্রের ভয়ই দেখাবে না, তারা লড়াইও করতে পারবে। পাকিস্তান ও ভারত যেভাবে পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতায় মত্ত রয়েছে, তা স্নায়ুযুদ্ধের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে উপমহাদেশে একটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি খুবই প্রয়োজন। সূত্র:ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট

আরো খবর

Leave a Reply

Close