বাংলাদেশ, রবিবার, ২৬শে মে, ২০১৯ ইং, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।

আব্দুল জব্বারের বলী খেলা

আবছার উদ্দিন অলি

আব্দুল জব্বারের বলী খেলা এখন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই উৎসব লোকজ সংস্কৃতি, এই উৎসব বাঙালীর, এই উৎসব চট্টগ্রামবাসীর। আমাদের দৃষ্টি কালচার ঐতিহ্যকে লালন পালন করছে বলী খেলা। বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামবাসীর সাথে সবাইকে নিবিঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। ব্যস্ত নগরবাসী অবসর পেলে ছুটে যায় নির্মল আনন্দের খোঁজে ভিন্ন আয়োজনের বিনোদন উপভোগ করতে। সাংস্কৃতিক চর্চায় কিংবা ঐতিহ্যগত ভাবে বলী খেলা এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মল্ল ক্রীড়া চট্টগ্রামে বলী খেলা নামে অভিহিত। এটি চট্টগ্রাম জেলার একটি সুপরিচিত ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ক্রীড়ানুষ্ঠান। দৈহিক শক্তিধর কুস্তিগিররা তখন নন্দিত হতেন এই বলীখেলার মাধ্যমে। এ ধরনের সবচেয়ে বড় বলী খেলা হয় চট্টগ্রাম মহানগরের লালদিঘী ময়দানে। বক্সীর হাটের আবদুল জব্বার সওদাগর এ মেলার প্রতিষ্ঠাতা তাই তাঁর নামানুসারে এ বলীখেলার নাম হয়েছে আবদুর জব্বার বলী খেলা।

১৯২১ সাল থেকে নগরীর বদরপাতি নিবাসী মরহুম আব্দুল জব্বার সওদাগর ১২বৈশাখ লালদিঘীর মাঠে সর্বপ্রথম বলী খেলা অনুষ্ঠান করেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে এ মেলার জন্ম। সুদীর্ঘ ৯৭ বছর যাবৎ চট্টগ্রামে এ মেলা সারা দেশে পরিচিত লাভ করেছে। এ মেলার পুরো ঐতিহ্য আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির এক বিরাট অংশ দখল করে আছে। সেই ধারাবাহিকতায় (১৪১০) ২০০৩ সালের এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ চট্টগ্রামের কোতোয়ালী মোড়, জেল রোড, সিনেমা প্যালেস, আন্দরকিল্লাসহ লালদিঘীর মাঠে বলী খেলা উপলক্ষে বৈশাখী মেলা বসে।

নানামুখি আগ্রাসন আর প্রলোভনের যুগে আমাদের সংস্কৃতির মূল প্রাণ লোকসংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। আমাদের মাটিবর্তী মানুষের শত শত বছর ধরে ধারণ করে আসা এই লোকায়ত সংস্কৃতিকে আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে, কারণ সেইসব চিরায়ত ঐতিহ্য ছাড়া আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের অস্তিত্ব চরম সংকটের মুখে পড়বে। দেশীয় সংস্কৃতির এই নির্যাসকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন এর ব্যাপক প্রচার এবং প্রসার। আমাদের সকলের উচিত প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ নির্যাসকে ছড়িয়ে দেয়া। আমাদের লোকসংস্কৃতির মধ্যেই রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার অসংখ্য উপাদান। দেশের বুকে সাম্প্রদায়িক কুপমন্ডুক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের লোকসংস্কৃতি আমাদের প্রেরণার উৎস। জব্বারের বলী ও বৈশাখী মেলা লোক সংস্কৃতিরই একটি অন্যতম অংশ।

বলী খেলায় প্রাথমিক কয়েকটি ধাপ শেষে ফাইনালে মনোনীত করে বলীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। খেলা শেষে বিজয়ী বলীকে ঢাক ঢোল পিটিয়ে খেলায় ঘুরানো হয় এবং তাদের দেখার জন্য উৎসুক জনতা ভীড় জমায়। বলীদের সুযোগ সুবিধা ও তত্ত্বাবধান না থাকার কারণে এখন সেই আগের মত কুস্তিগীর পাওয়া যায় না। আগের সেই কালু বলী, সামসুবলী, আজিজ বলী, হেমায়েত বলী এখন আর দেখা যায় না। ঐতিহ্যবাহী খেলাটি টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জরুরী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। তা না হলে শুধু মেলাই থাকবে। বলী পাওয়া মুশকিল হবে। ঐতিহ্য হারাবে বৈশাখী মেলা। বলীদের জন্য প্রয়োজন প্রয়াজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা। আব্দুল জব্বার আলী বলী খেলার ১০৯ বছরের ইতিহাস রয়েছে। তাই এই ঐতিহাসিক খেলাটি প্রতি বছর যেন সচল থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে আয়োজক কর্তৃপক্ষকে।

১২ বৈশাখ ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রামবাসী বছরের এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন। ২৪, ২৫ ও ২৬ এপ্রিল এই তিন দিন মেলা চলবে। ১২বৈশাখ ২৫ এপ্রিল জব্বারের বলী খেলা উপলক্ষ্যে নতুন নতুন মালামাল তৈরি করেন। কারিগররা, মেলাতে বিক্রিও ভাল হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার লোকজন এ মেলার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকেন। কারণ একটু ভালো দামে জিনিসগুলো বিক্রি করে একটু বাড়তি পয়সার জন্যে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন কখন জব্বারের বলী খেলা আসবে। দেশের সিলেট, নারায়নগঞ্জ, খুলনা, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, কক্সবাজার, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, বগুড়া, যশোর, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, রাঙামাটি, চাঁদপুর, রাজশাহী ইত্যাদি জেলা থেকে ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে বলীখেলায় চলে আসেন অনেকে। নির্ধারিত সময়ে বেচা-কেনা করে আবার চলে যায়। সেই সুবাধে পাওয়া যায় দুঃ®প্রাপ্য অনেক জিনিস যা অন্য সময়ে অনেক বেশি দাম দিয়েও পাওয়া যায় না। তাইতো আবাল বৃদ্ধ বনিতার কাছে এ মেলার কদর অনেক বেশি। লালদিঘীর দুই পাশে মেলায় পাবেন শীতল পাটি, ব্যাগ, ঝাড়, হাত পাখা, হাঁড়ি, পাতিল, কলসী, কুলা, চালুনী, দা-খুন্তি, কোদাল, বিভিন্ন কারূপণ্য, বাঁশ বেতের তৈরি চেয়ার, তালপাতার পাখা, খাট, পালংক, আয়না, আলনা, ফুলের টব, প্লাষ্টিক ও মাটির তৈরি পুতুল, ব্যাংক, বাঁশী, মুখোশ, টমটমি। এছাড়া চটপটি, ফিরনি, চিংড়ী ভাজা, হালিম, আইসক্রীম, শিশুদের জন্য নানা রঙের বেলুন, বিশাল তরমুজ, বাঙ্গি, শশা, গৃহস্থালী সামগ্রী, মাটির তৈরি রং বেরং পুতুল, খুলনার সুস্বাদু পিঠা, বগুড়ার দই, রাজশাহীর তিলের খাজা, নানা রকম আচার টক, ফুলদানি, ফুলের টপ, সিরামিক সামগ্রী, আম, লিচু দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা চারু কারু শিল্পের প্রদর্শনীর মর্যাদা পেয়েছে।

বৈশাখ মাসে লালদিঘীর বলী খেলা এখন শুধু চট্টগ্রাম নয়, তথা সারাদেশ, সারা বিশ্বে পরিচিত। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে এর ব্যাপকতা পৌঁছে গেছে দেশের আনাচে কানাছে। বলী খেলা আমাদের সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ, করেছে পরিচিত, করেছে সমাদৃত। আমাদের আব্দুল জব্বারের বলী খেলা চট্টগ্রামের গৌরব। এই বলী খেলার জন্য চট্টগ্রামবাসী অপেক্ষা করেন। কেননা এমন এমন জিনিস বলী খেলায় পাওয়া যায়, যা অন্য কোন সময় পাওয়া যায় না। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের সমাহার ঘটে বলী খেলায়। বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা এখন আমাদের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। লালদিঘীর মাঠের বলী খেলা এখন ব্যাপক জনপ্রিয়। এমন একটি সুন্দর সফল আয়োজন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে সমাদৃত করেছে, সম্মানিত করেছে। মেলা আমাদের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। গ্রামে, গঞ্জে, হাটে মাঠে মেলা বসে। আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে মেলার রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান। বৈশাখী মেলা আবহমান বাঙালি জনজীবনে এতটা জনপ্রিয় যে, এটা আর গ্রামেগঞ্জে সীমাবদ্ধ নয়।

দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে বলী খেলার ভূমিকা অপরিসীম। আবারও ফিরে এসেছে জব্বারের বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা। আসুন আমরা সবাই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এই খেলাটিকে উৎসবের রঙে রঙিন করে এগিয়ে নিয়ে যাই।

আরো খবর

Leave a Reply