মাহমুদুল হক আনসারী
জীবন ও মৃত্যু নিয়ে একজন মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ১৮ হাজার সৃষ্টির মধ্যে মানবজাতিকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতি আল্লাহর প্রতিনিধি। প্রতিনিধির মধ্যেই নবী, রাসূল, সাহাবা, তাবে-তাবঈন, খলিফা, ঈমামগণ মহান আল্লাহর সম্মানিত শ্রেষ্ঠ খলিফা। মুহাদ্দিস, মুফতি, পীর-বুজুর্গ ও আওলিয়ায় কেরাম আল্লাহর প্রিয় বান্দা। এই মানুষগুলো মহান আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য তাওহিদ, রিসালাত যারা যার অবস্থান থেকে বিশ^নবী (রহ:) পক্ষ হতে দুনিয়ার মানব জাতির কাছে প্রচার করেন। দুনিয়ার শুরু থেকে আল্লাহর দ্বীন, ধর্ম, তাওহীদ, রিসালাত প্রচারের জন্য আল্লাহ ও তার মনোনীত রাসুলের অনুসারী হিসেবে আল্লাহর ওলিগণ (প্রিয় বান্দা) মানব সমাজে নানাভাবে দ্বীন ও ধর্ম প্রচার করার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আমি এখন যেই মহান ব্যক্তিকে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি তিনি হলে হাফেজ ক্বারী শাহসুফী হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হোসাইন (রহ:)। মাতা গুলবাহার বেগম ও পিতা শেখ মুহাম্মদ ইমাম শরীফের বংশে চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার ১০ নং চাম্বল ইউনিয়নের পশ্চিম চাম্বল মোহাম্মদ আলি মাস্টারের বাড়িতে মা গুলবাহার বেগমের কোলকে আলোকিত করে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ ইংরেজি পৃথিবীতে আগমন করেন। তার আগমনে মাতা-পিতা, দাদা-দাদি, পরিবার পরিজনের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। পুরা এলাকা হাসি-খুশিতে আনন্দে আত্মহারা ছিল। ধীরে ধীরে এই মহান আলেম শাহসুফী হাফেজ মুহাম্মদ হোসাইন বড় হতে লাগলেন। ৮ বছর বয়সে তাকে স্থানীয় চাম্বল দারুল ওলুম আইনুল ইসলাম মাদ্রাসার মকতবে ভর্তি করে দেন তার পিতা মরহুম শেখ ইমাম শরীফ। সেই মকতব থেকে শাহসুফী হোসাইন সাহেব পবিত্র কোরআন শরীফ প্রাথমিক ইসলামিক শিক্ষা অর্জন করেন। এরপর উত্তর চাম্বল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, গণিত ইত্যাদি বিষয়ে লেখাপড়া করেন। ৫ম শ্রেণি পাশ করার পর তাকে চাম্বল দারুল ওলুম আইনুল ইসলাম মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি ১৭ বছর পর্যন্ত পবিত্র কোরআন শরীফ হেফজ করার জন্য ছিলেন। তার মা মহিয়সী নারী গোলবাহার বেগমের প্রচুর ইচ্ছা ছিল প্রিয় সন্তান হাফেজ হোসাইন কোরআনের হাফেজ হন। মহান আল্লাহ তায়ালা মায়ের সেই ইচ্ছা পূরণ করে তার সন্তানকে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হিসেবে প্রহণ করেছেন। তিনি কোরআনের হাফেজ হওয়াতে মাতা-পিতা ও পরিবারের মধ্যে বহু আনন্দ খুশি উৎযাপিত হয়। উল্লেখ্য যে হাফেজ সাহেব দুই বেলা খাওয়া-দাওয়া বাড়িতে এসে খেয়ে যেত। মহিয়সী নারী তার মাতা গোলবাহার বেগম সারাক্ষণ ছেলের চিন্তায় বিভোর থাকতেন। কারণ ছেলে যেনো নির্দিষ্ট সময়ে কোরআনের হাফেজ হয়ে মায়ের আশা পূরণ করতে পারে। তাই মা জননী তার খাওয়া-দাওয়া , আদর যতেœ খুবই মনোযোগী ছিলেন। মাঝে মধ্যে দুষ্টামির প্ররোচনায় পরে মাদ্রাসা ছেড়ে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে পালিয়ে যেত। অনেক খোঁজা-খোঁজি করে তাকে না পেলে তার মতো অস্থির হয়ে এদিক সেদিক খুঁজতে থাকত। যাই হোক চেষ্টা প্রচেষ্টার পর হাফেজ মুহাম্মদ হোসাইন হাফেজে কোরআন হয়ে পিতা মাতাসহ পরিবারের সকলের চেহারা উজ্জ্বল করেছে। এরপর তিনি আলেম হওয়ার জন্য একই মাদ্রাসায় কিতাব বিভাগে ভর্তি হলো। সেখানে থেকে তিনি দাখিল পাশ করার পর চকরিয়া রাজাখালী মাদ্রাসাাতে তিন বছরের মতো লেখাপড়া করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি বাঁশখালীর চাম্বল, জলদি, বড়গুনা এলাকার বড় বড় মসজিদে ইমামতি করেন। এরপর তিনি ইসলামি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম শহরের ওয়াজেদিয়া কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি পাঁচলাইশ বুলিয়াপড়া জামে মসজিদ, বাদামতল জামে মসজিদ, হাটহাজারি থাকার খন্দকিয়া আক্তারুল ওলুম হাফেজিয়া মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক ছিলেন। উল্লেখযোগ্য মসজিদ সমূহের মধ্যে আমান বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, রাউজানের উত্তরসত্তা, গাউসিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা, ফটিকছড়ি ধর্মপুর এমদাদুল ওলুম মাদ্রাসা ও নগরীর বালুচড়া বাইতুল করিম জামে মসজিদে প্রায় ১৫ বছর খতমে তারাবির মাধ্যমে পবিত্র কোরআন শরীফ রমজান মাসে খতম করেছেন। ১৯৯৫ তারিখের দিকে পাকিস্তান করাচিতে চলে যান। সেখানে তিনি অন্ততপক্ষে ১০টি বড় বড় মসজিদে ইমামতি করেন। ২০১৬ সালের দিকে তিনি একেবারেই মাতৃভূমি বাংলাদেশ চলে আসেন। এসে তিনি পারিবারিক নানা কাজে ও ঝামেলায় জড়িয়ে যান। জমি জমা সংক্রান্ত কতিপয় মিথ্যা ও হয়রানি মূলক ভূমিদস্যুদের তারা গেটে পড়েন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নানাভাবে স্থানীয় কতিপয় ভূমিদুস্যদের মিথ্যা মামলার শিকার হন। প্রায় এক যুগের বেশি মামলা, পাল্টা মামলা, নান অভিযোগ, বিচার, সালিশি দরবার বৈঠক হলেও জমির দখল তিনি দেখে যেতে পারেননি। নানা জাতীয় চিন্তা দুশ্চিন্তা ও জমি জমার মিথ্যা মামলায় তিনি জর্জরিত হয়ে পরেছিল। বলা যায় ভূমিখেকো সন্ত্রাসি একটা গ্রæপের নিকট তিনি ও তার পরিবার জিম্মি হয়ে পড়ে। যাই হউক ওইসব নানা ধরনের তার জীবনের চিত্র তুলে ধরতে গেলে অনেক কিছু লেখা যাবে।
মহান এই শাহসুফী হাফেজ হোসাইন জীবনের শেষ দিকে এসে সামাজিক দুষ্টু চক্রের শিকার হয়েছিলেন। বিচারের বাণী নীরবে নিবৃত্তে ক্রন্দন করেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে তাকে জুলুম ও অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি তিনি দুটি বিবাহ করেছিলেন। একজন ফুফাত বোন তার সাথে বেশি দিনের সংষার হয়নি। সংসার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ওই ঘরে একটি মেয়ে সন্তান হয়েছিল। মেয়েটি ডুবে মারা যায়। এরপর তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন। ওই স্থির কাছেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরের স্ত্রীর কোনো ছেলে সন্তান হয়নি। বলা যায় নিঃসন্তান। তবে একটি মেয়ে দত্তক এনে লালন-পালন করেছেন। বর্তমানে ওই স্ত্রী ও পালক মেয়েটি আছে। শাহসুফি হাফেজ সাহেবের ৫ ভাই। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় ৫ ভাইয়ের মধ্যে। তিন ভাই মৃত্যুবরণ করেছেন। লেখক তার ছোট ভাই। অত্যন্ত সহজ সরল ছিলেন তিনি। মানুষকে বেশি বিশ^াস করতেন। অসংখ্য মানুষের নিকট তিনি প্রতারিত হয়েছেন। সহজ ও সরলতার সুযোগ গ্রহণ করে তাকে অনেকেই জীবদ্দশায় কষ্ট দিয়েছে। তার তিনি জীবনে যে সব স্থানে ইসলামের খেদমত করেছে সেই সব এলাকায় মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তাকে স্মরণ করতে দেখা যায়।
মহান এই কোরআনে হাফেজ আলেমে দ্বীন শাহসুফী হাফেজ ক্বারী মাওলানা মুহাম্মদ হোসাইন পরিবার পরিজন ও আত্মীয় স্বজনকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ২০২৩ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর মহান আল্লাহর নিকট জীবন ছেড়ে পরোপারে চলে যান। তার ইন্তেকালে এলাকায় গভীরভাবে শোকের ছায়া নেমে আসে। একই দিন বিকেল ৫টার সময় উত্তর চাম্বল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাটে নামাজে জানাযা শেষ করে নিজস্ব পারিবারিক করবস্থানে পিতাও বড় ভাই মাস্টার মোহাম্মদ আলীর কবরের পাশে তাকে চিরজীবনের জন্য শাহিত করা হয়।
মহান আল্লাহ তাআলা আসমানি কিতাবের মাধ্যমে বলেছেন প্রকৃত আল্লাহর নেককার বান্দাগণ মরেও অমর। পবিত্র কোরআনের হাফেজ ইমাম ও খতীব হিসেবে বর্ণাঢ্য ধর্মীয় জীবনের অধিকারী। মহান আল্লাহ তাআলা তার জীবনের জানা ও অজানা সব গুনাহ মাফ করুন। জান্নাতুল ফেরদৌস দান করে তার সম্মান উচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন, আমীন।



