বিশেষ প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্মিত ২৭৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই খালের মুখে রেগুলেটরের ভিমে ফাটল, পানি প্রতিরোধের জন্য বসানো ব্লক ভেঙ্গে গেছে অনেক জায়গায়। সরেজমিনে দেখতে গিয়েও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। অর্থসংকটে স্থবিরতা বিরাজ করছে চলমান কাজের। তবে নিম্নমানের বিষয়টি অস্বীকার করে ঠিকাদারের পক্ষে সাফাই গাইছেন প্রকল্প পরিচালক রাজিব দাশ। এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

স্থানীয়দের সাথে কথা বললে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কর্মকর্তা রাজিব দাশ ও ঠিকাদার মিলে কাজে চরম অনিয়ম করছে। প্রকল্পে নতুন ও মানসম্পন্ন ইট এবং বালুসহ অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান করছে তার উল্টো। বিভিন্ন স্থান থেকে পুরোনো ভবনের পচাঁ ইট, পলেস্তরা, রাবিশ ও মাটি ব্যবহার করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। এসব নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের ফলে কাংখিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে জনসাধারণ। আর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে বরাবরই উদাসিন। বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছেন প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা প্রকৌশলী রাজিব দাশ। তার সাথে ঠিকাদারের সাথে কোন অনৈতিক লেনদেনের সম্পর্ক আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। এদিকে দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে এখনো পর্যন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স।

এলাকাবাসী জানান, ‘প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ও ঠিকাদাররা যোগসাজশে বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়েছে মূলত সরকারি অর্থ লোপাট করার জন্য। প্রকল্প নেওয়ার আগেই প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় নির্ধারিত থাকে। সেই অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয় না কেন? তিন থেকে চারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হবে কেন? এর কারণ হচ্ছে প্রকল্পে অনিয়ম আর হরিলুট করা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্পে নিয়োজিত এক কর্মকর্তা জানান , ‘নানা জটিলতায় কাজ চলছে ধীরগতিতে, ২৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ১৭০ একর জমি একোয়ার করেছে সিডিএি। এরমধ্যে ৮০ শতাংশ জমি সরকারি মালিকানাধিন বন্দরের। বাকী ২০ শতাংশ (৩৪ একর) জমির মধ্যে এই পর্যন্ত ৮০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বাকিগুলো একোয়ারের প্রক্রিয়া চলমান। ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ কাম সড়ক প্রকল্পটির নিচের অংশে ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট প্রস্থ এবং ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতা হবে। ফলে এটি শহর রক্ষা বাঁধ হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এখানে নির্মাণ সামগ্রী থেকে শুরু করে বালি, সিমেন্ট, লোহা, কংক্রিট সবকিছুতে নিদিষ্ট গ্রেডের চেয়ে নিচুমানের বা গ্রেডের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। যার ফলে পিডি সংশিষ্টতায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান শত শত কোটি টাকা দূর্নীতি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল একনেক সভায় এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। শুরুতে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২০ সালে শেষ করার কথা ছিল। পরে সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুনে শেষ করার কথা থাকলেও আবারও সময় বাড়ানোর আবেদনের ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু বর্তমানে ২০২৬ সালের জুন মাস শেষের দিকে হলেও এখন পর্যন্ত শতভাগ কাজ শেষ করতে পারেনি। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পে ব্যয় ৪৬৯ কোটি টাকা বেড়ে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে প্রকল্প পরিচালক রাজিব দাশ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিলে আবারো ব্যয় বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দফতরে দৌড়ঝাঁপ করার পায়তারা করছে। ইতিমধ্যে প্রকল্প পরিচালক রাজিব দাশ শুধুমাত্র এই একটি প্রকল্প থেকে ৫ শতাংশ হারে কমিশন বানিজ্যের মাধ্যমে শত কোটি টাকার উপর অবৈধ আয় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগেও ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আবদুস সালামের ঘনিষ্ঠজন থাকার কারণে তাকে বড় বড় প্রকল্পগুলোর পিডি করা হয়েছিলো। সেইসব প্রকল্প থেকেও বড় অংকের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার, বিভিন্ন ডেভলপারের সাথে পার্টনারে ব্যবসা, বনিক গ্রুপকে টাকা লগ্নিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক রাজিব দাশের কাছে বিস্তারিত জানতে ফোন করা হলে তিনি প্রতিবেদককে জানান, ‘ আপনি নিউজ করেন, এই পর্যন্ত নিউজ করে কেউ আমার কিছু করতে পারেনি। তাই আপনার ইচ্ছা হলে আপনার মতো নিউজ করেন। এতে আমার কোন ক্ষতি নেই।’

 

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ