বাংলাদেশ, শনিবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং, ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ।

চট্টগ্রামে সুফি কনফারেন্স

গত ২২ ফেব্রুয়ারি  বৃহস্পতিবার বিকেল ৩.৩০টায় জামালখানস্থ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সুলতান আহমদ মিলনায়তনে চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র ও সুফি ফতেহ আলী ওয়সী (রহ.) স্মৃতি পরিষদের যৌথ উদ্যোগে বাংলার গৌরব, ঊনবিংশ শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ সুফিসাধক, চট্টগ্রামের কৃতিপুরুষ, প্রখ্যাত সুফিব্যক্তিত্ব, ফারসি ভাষার খ্যাতিমান কবি, রসুলনোমা শাহসুফি হযরত ফতেহ আলী ওয়সী (রহ.) স্মরণে সুফি কনফারেন্স ২০১৮ চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের প্রাক্তন সভাপতি, জাতীয় দরগাহ মাজার সংস্কার সংরক্ষন কমিটির চেয়ারম্যান শাহসুফি মাওলানা রেজাউল করিম তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত কনফারেন্সে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মুসলিম মনীষা স্মৃতি পরিষদের সভাপতি, বিশিষ্ট লেখক-গবেষক আলহাজ্ব আহমদুল ইসলাম চৌধুরী। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওয়সী মেমোরিয়াল এসোসিয়েশন পশ্চিমবঙ্গ ভারত শাখার সেক্রেটারী জেনারেল, বিশিষ্ট সুফি গবেষক ড. শেখ আহমদ আলী (মু.জি.আ)। সুফি কনফারেন্সে “ঊনবিংশ শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ সুফিসাধক রসুলনোমা সুফি ফতেহ আলী ওয়াসী (রহ.)” এর জীবনকর্মের উপর প্রবন্ধ পাঠ করেন চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি সোহেল মো. ফখরুদ-দীন। কনফারেন্সে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পশ্চিমবঙ্গ ভারত থেকে আগত বিশিষ্ট লেখক মোহাম্মদ আলতাফ উদ্দিন মণ্ডল, সুরেশ্বরী দরবার শরীফের পীর সাহেব সৈয়দ শাহ নুরে আকতার হোসাইন আহম্মদী নুরী, সুফি গবেষক-ইতিহাসবিদ ড. সেলিম জাহাঙ্গীর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শাহ আলম, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের মহাসচিব লেখক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, প্রবীন ইসলামী চিন্তবিদ উপাধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল ওদুদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান আইনবিদ ড. খান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, বিশিষ্ট লেখক গবেষক মাওলানা জহুরুল আনোয়ার, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখক অধ্যাপক নঈম কাদের, সুন্নি জগৎ এর প্রধান সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুর হোসেন, ইতিহাসবিদ এবিএম ফয়েজ উল্লাহ, মাওলানা মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, হাকিম আলহাজ্ব মাহমুদ উল্লাহ, প্রাবন্ধিক সিদ্দিকুল ইসলাম, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইউনুছ কুতুবী, অধ্যক্ষ শিহাব উদ্দিন চৌধুরী, মাওলানা মহিউদ্দিন, মোঃ আনোয়ার হোসেন, মোঃ ওসমান জাহাঙ্গীর, সোহেল তাজ, সাফাত বিন সানাউল্লাহ, মোহাম্মদ আবদুর রহিম, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক দিদারুল আলম, মোঃ রহিম উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শাহনুর আলম প্রমূখ। কনফারেন্সে বক্তারা বলেছেন, যুগশ্রেষ্ঠ রসুলনোমা সুফি ফতেহ আলী ওয়াসী (রহ.) ছিলেন একজন প্রখ্যাত সুফি ও কামেল ব্যক্তিত্ব এবং রসুলপ্রেমী। তাঁর পুরোটা জীবনই ছিল ইসলামের আলোকে গড়া। তিনি পবিত্র কোরআন হাদিস চর্চার মাধ্যমে অন্ধকারে নিমজ্জিত জাতিকে আলোকিত পথের সন্ধান দিয়েছেন। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে ভারতবর্ষ ও সমগ্র পৃথিবীব্যাপী ইসলামের সত্য বাণীকে মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছেন। সুফিবাদ বিকাশে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর প্রয়াণের দুইশত বছর অতিবাহিত হতে চললেও তাঁর লেখা ঐতিহাসিক দিওয়ানে ওয়সীর মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক নবী মুহাম্মদ (স.) এর আদর্শ বাণীগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দিওয়ানী ওয়সী রসুল প্রেমের জ্বলন্ত প্রমাণ। তাঁর লেখা কসিদাগুলো বাংলা, ইংরেজি, উর্দুতে আরও বেশি বেশি প্রচার প্রসার ঘটাতে পারলে সুফিবাদ বিকশিত হবে। কনফারেন্সে বক্তারা আরো বলেছেন, সুফিবাদ বা সুফিদর্শন একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন। আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা এর মুখ্য বিষয়। সুফিবাদের একমাত্র মূল বিষয়টি হল, আপন নফসের সঙ্গে, নিজ প্রাণের সাথে, নিজের জীবাত্মার সাথে পরমাত্মা আল্লাহ যে শয়তানটিকে আমাদের পরীক্ষা করার জন্য দেওয়া হয়েছে তার সাথে জিহাদ করে তার থেকে মুক্ত হয়ে এ জড় জগত থেকে মুক্তি পাওয়া। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হল এই দর্শনের মর্মকথা। পরম সত্তা মহান আল্লাহকে জানার আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যামে জানার প্রচেষ্টাই সুফি দর্শন বা সুফিবাদ। আল্লামা ইমাম গাজ্জালি (র.) এর মতে, আল্লাহর ব্যতীত অপর মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে পবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সুফিবাদ। সুফ অর্থ পশম আর তাসাওউফের অর্থ পশমী বস্ত্র পরিধানের অভ্যাস। অতঃপর মরমীতত্ত্বের সাধনায় কারও জীবনকে নিয়োজিত করার কাজকে বলা হয় তাসাওউফ। যিনি নিজেকে এইরূপ সাধনায় সমর্পিত করেন ইসলামের পরিভাষায় তিনি সুফি নামে অভিহিত হন। ইসলামি পরিভাষায় সুফিবাদকে তাসাওউফ বলা হয়, যার অর্থ আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ লাভ করা যায়। যেহেতু আল্লাহ নিরাকার, তাই তাঁর মধ্যে ফানা হওয়ার জন্য নিরাকার শক্তির প্রতি প্রেমই একমাত্র মাধ্যম। তাসাওউফ দর্শন অনুযায়ী এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বা আল্লাহ-প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। সেই পথ হলো ফানা ফিশ্শাইখ, ফানা ফিররাসুল ও ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন। তখন সুফির অন্তরে সার্বক্ষণিক শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে। বক্তারা বলেন, সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে কল্বকে কলুষমুক্ত করে আল্লাহর প্রেমার্জন সুফিবাদের উদ্দেশ্য। যাঁরা তাঁর প্রেমার্জন করেছেন, তাঁদের তরিকা বা পথ অনুসরণ করে ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ অর্জন করাই হলো সুফিদর্শন।

আরো খবর

Leave a Reply