রবিবার ২২শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ৭ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

ক্ষণজন্মা পুরুষ চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সাথে যার সম্পর্ক ছিল মধুর

 

মাটির মানুষ মাটির সাথে মিশে গেলেন। তাঁর কর্মগুলো মানুষের পথ চলার পাথেয় হিসেবে আজীবন পথ দেখাবে। চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমাদের এই চট্টগ্রামের কৃতি পুরুষ জননেতা ইসহাক মিয়া এক স্মরণীয় নাম। তাঁকে আমি নানা বলে সম্বোধন করতাম। তিনিও আমাকে নাতি হিসেবে স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে ১৭টি বছর পথ চলতে সাহস জুগিয়েছেন। আলহাজ্ব ইসহাক মিয়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ছিলেন পাকিস্তান আমলের গণপরিষদের সদস্য এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্যও। দেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তিনি দেশের জন্য অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরবর্তীতে এই দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আদর্শে দেশ গড়তে ইসহাক মিয়া পথ থেকে পথে ব্যাপক কাজ করেছেন। সহজ সরল জীবনের অধিকারী। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তাঁর পৈতৃক বাড়িতেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। আমাদের চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের তিনি উপদেষ্টারূপে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস ঐতিহ্য মূলক আমাদের সকল কর্মকান্ডে ইসহাক মিয়ার উপস্থিতি আমাদেরকে প্রাণীত করেছেন। আসিফ ইকবাল ও আমার সাথে নানার সম্পর্ক ছিল মধুর ও পারিবারিক। নানা এক সপ্তাহে দুই তিনদিন দেখা না হলেই ফোন করতেন। এ রকম মানুষ বর্তমান সমাজে আর আসবে কিনা আমার জানা নেই। আমাদের সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ২৪ জুলাই ২০১৭ ইং সকাল সাড়ে এগারটায় তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। আমার ছোট ভাই শামসুদ্দিন রাজু ফেইজবুকের ইনবক্সে নানার মৃত্যু সংবাদ আমাকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে আফিস ইকবাল একই সংবাদ জানান। ২৫ জুলাই জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে প্রথম জানাজা ও আগ্রাবাদে আরো দুটি জানাজার পর ইসহাক মিয়াকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। একটি সহজ-সরল এবং সৎ পথের রাজনীতিক জীবনের যবনিকা ঘটে। কিন্তু ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। কারণ বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যাঁদের অবদান তাঁরাতো আমাদের মাঝে কর্ম ও ইতিহাস নিয়ে দেশের ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন। তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে খুবই জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। বক্তব্যের মাঝে রসালো কথা বলা ছিল ইসহাক মিয়ার একটি বিশেষ গুণ। তিনি রসালো কথা বার্তার মাধ্যমে মানুষকে মুহিত করে তুলতেন। সাধু-চলিত ও মাঝে মাঝে ইংরেজিতেও বক্তব্য রাখতেন। দেশী-বিদেশী অতিথিদের সাথে তিনি চমৎকার করে ইংরেজীতে কথা বলতেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে ভারতীয় দুতাবাস ও ভারতীয় একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের তাঁর বাড়িতে নিমন্ত্রণ অনুষ্ঠানে যোগদানের সুযোগ হয়েছে আমার। তিনি বিদেশী সাথে তাদের ভাষায় ভালো করে কথা বলতে পারতেন। মাঝে মাঝে পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমাদের নিয়ে হিন্দিতে গানও করতেন। ভারতের এক কালজয়ী সিনেমা পরিচালক ছিলেন ইসহাক মিয়ার বন্ধু। তার আমন্ত্রণে আশির দশকে তিনি দিল্লী ও মুম্বে গমন করেছিলেন। রাজনীতিকভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের রাজনীতিক সহচর ছিলেন। চট্টগ্রামের এমএ আজিজ, জহুর আহমদ, হান্নান, মান্নান এর পরবর্তীতে জননেতা ইসহাক মিয়ার উদ্ভাসিত ছিলেন। প্রতিদিন কোন না কোন সভা সমাবেশে তিনি যোগদান করতেন এবং জোরালোভাবে বক্তব্য রাখতেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তাঁর বক্তব্য কালজয়ী। চট্টগ্রামের এই কালজয়ী রাজনীতিবিদ ইসহাক মিয়া ১৯৩২ সালের ১ মে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল জনার আলী, মাতার নাম তামিজা খাতুন, উত্তর আগ্রাবাদের হাজী পাড়ায় তাঁর পৈতৃক নিবাস। সেখানেই তিনি ছোট থেকে বড় এবং জীবনের শেষ দিন ওখানেই কাটিয়েছেন। ইসহাক মিয়া ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগে যোগদান, ১৯৫৬ সালে আগ্রাবাদ এলাকার কাউন্সিলর নির্বাচিত, ১৯৬২ সালে আগ্রাবদ ওয়ার্ডে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন, ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের অধীনে দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে বিনা প্রতিদন্দীতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, ১৯৬৬ সালে জননেতা এম এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর সাথে ৬ দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, ১৯৭০ সালে পুর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম-৮ নির্বাচনী এলাকায় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এমপি নির্বাচিত হন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, ১৯৭২ সালে মহান জাতীয় সংসদে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত এমপি হিসেবে যোগদান করেন এবং চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দরের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সরকার কর্তৃক প্রশাসক নিযুক্ত হন। এসময় চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন সুইপিং ও নিমজ্জিত জাহাজ উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করন এবং বন্দর চালু করার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন, এসময় তিনি চটগ্রাম সমাজ কল্যান ও শিশু কল্যান পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন, চট্টগ্রাম শহর রেশনশপ বরাদ্ধ কমিটিরও চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও তিনি আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত লাইসেন্স প্রদান মনিটরিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্ব-পরিবারে নিহত হওয়ার পর হত্যার প্রতিবাদে জনমত সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত ছিলেন ইসহাক মিয়া। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ নির্বাচনী এলাকা থেকে আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন, ১৯৮৬ সানে চট্টগ্রাম-৮ নির্বাচনী এলাকা থেকে বাংলদেশ আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তৎকালিন ডেপুটি স্পিকার ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ব্যারিষ্টার সুলতান আহমদকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ নির্বাচনী এলাকায় বাংলদেশ আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন। মোহাম্মদ ইসহাক মিয়া রাজনৈতিক কারনে ১৯৬৫ সালে থেকে গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত সহ বিভিন্নভাবে নিগৃহিত হন এবং ১৯৮৭ সালে ৬ মাস বিনা অপরাধে কারাভোগ করেন। তিনি চট্টগ্রাম শহর আওয়ামীলীগকে জেলার মর্যাদা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে প্রভাবিত করেন। চট্টগ্রাম শহর আওয়ামীলীগ এর সুচনালগ্ন থেকে তিনি মহানগর আওয়ামীলীগের নির্বাহী কমিটিতে সাংগঠনিকভাবে বিভিন্ন পদে অধিষ্টিত ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা পদে আসিন ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে ১৯৭১ সালে পাক হানাদার ও দখলদার বাহিনী তার পৈত্রিক ভিটার বাড়িঘর পুড়ে দেন এবং তাঁর পরিবারের উপর নির্মম অত্যাচার চালান। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন, ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ভুমিকা রাখেন এবং ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা রাখেন, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা আন্দোলনে কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এছাড়াও লাগাতারভাবে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, ১৯৬৮-৬৯ সালে চলমান গণআন্দোলন এবং গণঅভ্যূত্থানে সক্রিয় ছিলেন ইসহাক মিয়া। ১৯৭০ সালে এর নির্বাচনে প্রার্থী এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ, ১৯৭৯ সনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, ১৯৮৩ খ্রি. সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা পালন, ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন, ১৯৯০ এর গন আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন, ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে সক্রিয় ভুমিকা পালন, ১৯৯৬ ও ২০০১ এর নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন, ২০০৭ এর ১/১১ এর সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকার বিরুদ্ধে জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান গ্রহন করে জনমত সৃষ্টি, বন্দী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্ত করার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ও মহাজোটের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারনা সহ প্রার্থীকে জয়ী করার যাবতীয় কলা কৌশল অবলম্বন করেন। ২০১৩ সালে থেকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা পদে বহাল ছিলেন। ২০১৭ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রামের কৃতিপুরুষ আমাদের জননেতা ইসহাক মিয়া কণিকালয়ের পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। পরজীবনে মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর আত্মার শান্তি ও বেহেস্ত নসিব করুক।

Categories: আলোকিত/গুণীজন

Leave A Reply

Cheap Reseller Hosting in Bangladesh