বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আমরা যেন রবীন্দ্র-নজরুলকে ছাড়িয়ে না যাই

আবুল বাশার মানিক
মাতৃপ্রতিম মাতৃভাষা বাংলার বড় দুর্দিন যাচ্ছে।“স্বাচ্ছন্দ্যে বই কেনা” শিরোনাম, পৃ: ২৪, কালের কন্ঠ, ২৩/১২/২০১২। স্বচ্ছন্দ বিশেষণ, স্বাচ্ছন্দ্য বিশেষ্য। কথাটি হবে “স্বচ্ছন্দে বই কেনা”। …… মার্কিন গোয়েন্দারা লাদেনের সেই বার্তা বাহককে দীর্ঘদিন ধরে খুঁছতেছিল। পৃ: ১৯, ইত্তেফাক, ০৩/০৫/২০১১। “খুঁজতেছিল” কোন ক্রিয়ারূপ নেই। কথাটি হবে খুঁজছিল। “……….. সে চিলাহাটি রাজশাহীগামী বরেন্দ্র ট্রেনে কাটা পড়ে আত্মহত্যা করেন” , পৃ: ৫, ইনকিলাব, ০৫/০৬/২০১১। সর্বনাম ‘সে’ এর স্থলে হবে তিনি।
এক সময় আমরা ঢাকা বেতারে প্রমিত বাংলার এবং আঞ্চলিক বাংলার নাটক আদি শুনতাম। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, মধু মালা, নিরুদ্দেশ যাত্রা, যে নদী এখনো কাঁদে প্রভৃতি নাটক গুলোয় কি সুন্দর প্রমিত বাংলার ব্যবহার! এখন টিভি নাটক গুলোর যে গুলোতে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোতেই ব্যর্থতার ছাপ। ‘ভিতরে আসেন, বসেন’ এ জাতীয় বাক্য প্রায়ই শুনা যায়। বাক্যটির অনুজ্ঞা সূচক প্রমিত রূপ হবে ভেতরে আসুন, বসুন। চাব, চাব না প্রভৃতি ক্রিয়া রূপ শুনা যায়। চাহিব এর চলতি রূপ চাইব, চাহিব না এর চলতি রূপ চাইব না। চাব, চাব না এরূপ কোন ক্রিয়ারূপ নেই। আসুন, বসুন, বলুন এ অনুজ্ঞা গুলো যেন আমরা ভুলেই যাচ্ছি। নবম দশম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে ‘মানুষ মুহম্মদ’ প্রবন্ধের এক জায়গায় লেখা আছে ‘ছাগীদুগ্ধ’। পরবর্তী সংস্করণেও দেখা গেল ‘ছাগীদুগ্ধ’ই ছাপা হয়েছে। কথাটি হবে ‘ছাগদুগ্ধ’। ভুল শেখালে শিক্ষার্থীরা ভুলই শিখে। ‘খাঁটি গরুর দুধ’ পরিবর্তন করে লেখা হয়েছে ‘গরুর খাঁটি দুধ’। অথচ ‘গরুর দুধ’ একটি সমাসবদ্ধ পদ (৬ষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)। কে জানে, কেন এসব পরিবর্তন ! আঞ্চলিক ভাষায় নাটক আদি নিয়ে আমাদের কোন আপত্তি নেই।
বাংলা একাডেমীর বাংলা বানান অভিধান তৃতীয় সংস্করণ ২০১২, চৌদ্দ পৃষ্ঠার ভূমিকায় এর প্রকাশক ও সম্পাদক জনাব জামিল চৌধুরী লিখেছেন-“সংস্কৃত তীর শব্দের অর্থ কূল বা তট এবং ফারসি ভাষায় এই শব্দটির অর্থ বাণ বা শর। বাণ অর্থে ‘তীর’ এর উৎস ফারসি হওয়ায় শব্দটির দীর্ঘস্বর বর্জন করে ‘তীর’ থেকে ‘তির’ করা হয়েছে”। সংস্কৃত শব্দ না হওয়ায় “পন্থী এবং দেশী” এই শব্দ দুটিকে “পন্থি” এবং “দেশি” লিখতে বলা হয়েছে। বইটির কেথাও ঢালাও ভাবে দীর্ঘস্বর বর্জনের কথা বলা হয়নি। বইটির ভেতরে প্রদত্ত শব্দাবলীতে যথারীতি হ্রস্বস্বর ও দীর্ঘস্বর ব্যবহৃত হয়েছে। প্রমিত উচ্চারণ সহ বইটি একটি চমৎকার বই। অথচ এক শ্রেণীর লোক বলছে যে বাংলা একাডেমী এখন দীর্ঘস্বর উঠিয়ে দিয়েছে। কথাটি আদৌ সত্য নয়।
দেশি বিদেশি শব্দের দীর্ঘস্বর বর্জনের নির্দেশনার সাথে আমরাও বহুলাংশে একমত। শুধু দু’একটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ভিন্নমত পোষণ করছি। বলা বাহুল্য “তীর হারা এ ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে”, এবং “তীর বেঁধা পাখী মোর” পঙক্তি দুটির মমার্থ বুঝতে আমাদের কোন সমস্যা নেই। বরং কোন্ শব্দটি দেশি, কোন্টি বিদেশি, কোন্টি তৎসম, কোনটি তদ্ভব এত কিছু নির্ণয় করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। উল্লেখিত বইটির ৮৮৬নং পৃষ্ঠায় ২.০১ ই, ঈ, উ, ঊ অনুচ্ছেদে বিধৃত গাড়ি থেকে ঊনচল্লিশ পর্যন্ত ৬১ টি শব্দ আছে। তন্মেধ্যে ‘পুজো’ ও ‘ইমান’ ছাড়া সবগুলো শব্দই ঠিক আছে। ‘পুজো’কে পূজো লেখাই সঙ্গত মনে করি। সঙ্গত কারণে নবী, ঈদ, ঈমান, ঈসা (আ:), শরীফ, পীর এ কয়টি শব্দ ও দীর্ঘস্বরে লেখা সমীচীন হবে। উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি জড়িত।
‘ঈগল’ শব্দটির মাঝে আমাদের শিশুরা ঈগল পাখির সাযুজ্য খুঁজে পায়।- শব্দটি ইংরেজী হলেও এর দীর্ঘস্বর বজায় রাখা উচিত। উল্লেখ্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেখানে নিয়ম থাকে, সেখানে নিয়মের ব্যতিক্রমও থাকে।
অধিকতর জানান দেয়ার সুবিধার্থে উক্ত অভিধানটির ৮৮৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত অবশিষ্ট ৫৭ টি শব্দ নিন্মে প্রদত্ত হলঃ
“চুরি, দাড়ি, বাড়ি, ভারি, শাড়ি, তরকারি, বোমাবাজি, দাবি, হাতি, বেশি, খুশি, হিজরি, আরবি, ফারসি, ফরাসি, বাঙালি, ইংরেজি, জাপানি, জার্মানি, ইরানি, হিন্দি, সিন্ধি, ফিরিঙ্গি, সিঙ্গি, ছুরি, টুপি, সরকারি, মালি, পাগলামি, পাগলি, দিঘি, কেরামতি, রেশমি, পশমি, পাখি, ফরিয়াদি, আসামি, বে-আইনি, ছড়ি, কুমির, নানি, দাদি, বিবি, মামি, চাচি, মাসি, পিসি, দিদি, বুড়ি, ছুঁড়ি, নিচু, নিচে, চুন, পুব, ভুখা, মুলা উনিশ”।
আজকাল সাধু ও চলতি রীতির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নন বলে প্রতীয়মান হয়। সাধু রীতির চর্চা ভীষণ ভাবে কমিয়ে দেয়ায় শিক্ষার্থীরা এখন এর পার্থক্য বুঝতে পারে না। পত্র পত্রিকার মধ্যে বর্তমানে শুধু দৈনিক ইত্তেফাকের মূল্যবান সম্পাদকীয় কলাম গুলো সাধু ভাষায় লেখা হচ্ছে। এর বাইরে সাধুরীতির ব্যবহার তেমন চোখে পড়েনা। মাধ্যমিক বাংলা ২য় পত্রের ব্যাকরণ অংশ যে দিন থেকে নৈর্ব্যক্তিক (৫০ মার্ক) করা হয়েছে, সে দিন থেকে বলা যায়, বাংলা ব্যকরণ শেখা বন্ধ হয়ে গেছে।
‘৪০০ জন দুঃস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়’। -এ জাতীয় বাক্য প্রায়শই চোখে পড়ছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর বাঙ্গালা ব্যাকরণ বইয়ের ২০১ পৃষ্ঠায় স্পষ্টতই বলেছেন- “সংখ্যা বাচক বিশেষণের সহিত বিশেষ্যে বহুবচনের কোন চিহ্ন থাকে না”। অতএব কথাটি হবে ৪০০ জন দুঃস্থের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়।
তারিখ বাচক শব্দে বা সংখ্যায় ১লা, ২রা, ৩রা, ৪ঠা, ৫ই ইত্যাদি আমাদের মজ্জাগত। ১লা বৈশাখ (পহেলা বৈশাখ) আমাদের ঐতিহ্যগত। ১ বৈশাখ (এক বৈশাখ) তা নয়।
‘কি’ এবং ‘কী’ শব্দ দুটি নিয়ে আমরা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সংস্কৃত প্রশ্নবোধক ‘কিং’ শব্দটি থেকে বাংলা ‘কি’। উদাহরণ ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’। পদ কত প্রকার কি কি? চিরন্তন এই ‘কি’ নিয়ে হালে এক বিভ্রান্তিকর অবস্থা চলছে। বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য আমরা রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের এ বাক্যাাংশটি লক্ষ্য করতে পারি, “কোনদিন সে মাখনকে জলেই ফেলে দেয়, কি মাথাই ফাটায়, কি কী একটা দুর্ঘটনা ঘটায়”, একই গল্পে- “ইহার মধ্যে সহসা একটি তেরো বৎসরের অপরিচিত অশিক্ষিত পাড়াগেঁয়ে ছেলে ছাড়িয়া দিলে কিরূপ একটা বিপ্লবের সম্ভাবনা উপস্থিত হয়,” প্রমথ চৌধুরী তাঁর বই পড়া প্রবন্ধে লিখেছেন- “আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই, এমনকি এক্ষেত্রে দাতা কর্ণেরও অভাব নেই।
এ ছাড়া “কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী” “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, কি অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী”, “একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে”। এতগুলো উদ্ধৃতির মধ্যে আমরা শুধু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের “কি কী একটা দুর্ঘটনা ঘটায়” বাক্যাংশে দীর্ঘস্বর যুক্ত একটি ‘কী’ পাই যা সর্বনামবোধক। বাকী সবগুলোই প্রশ্ন বিস্ময়, আবেগ প্রভৃতিসূচক। অতএব উত্তর হ্যাঁ বা না হলে ‘কি’ অন্যথায় ‘কী’ এ ধারণাটি সঠিক নয়। স্পষ্ট সর্বনাম ছাড়া সকল ‘কি’ই‘কি’ হবে, যেমন- আপনার দেশের নাম কি ? বা আপনার ব্যাগের ভেতরে কী, জানতে পারি কি ? বা ডাক্তার রোগীকে জিজ্ঞাসা করিলেন-“আপনি আজ সকালে কী খেয়েছেন, দয়া করে বলবেন কি ? ইত্যাদি।
বস্তুত বাংলা ভাষা ব্যবহারে যে নৈরাজ্যকর অবস্থা দেখা দিয়েছে, এ অবস্থায় বাংলা একাডেমীর “বাংলা বানান অভিধান” প্রকাশ একটি মহতী উদ্যোগ। কিন্তু তাঁদের দীর্ঘস্বর ব্যবহার সম্পর্কিত সিদ্ধান্তটি শত বছরের চর্চিত বাংলা ভাষা ব্যবহারে সমগ্র দেশব্যাপী এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
এ সম্পর্কে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক অনু হোসেন লিখেছেন “ এ বিষয়ে বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্র নাথ যে পথে চলেছেন সে পথ থেকে বের হওয়া পশ্চাদপসারণ” (ইত্তেফাক ১৩.৪.২০১২)। একই বিষয়ে বদরুদ্দিন ওমর লিখেছেন- “এখন বাংলা ভাষার যে ক্ষতি হচ্ছে, এটাতো পাকিস্তানিরাও করতে পারেনি” (ইত্তেফাক ২৩.৯.২০১১)।
জনাব অনু হোসেন ঐ লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “মৃত্যুশোক” প্রবন্ধ থেকে দুটি বাক্য উদ্ধৃত্ত করেছেন- “ইতিমধ্যে বাড়িতে পরে পরে কয়েকটি মৃত্যু ঘটনা ঘটিল। ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। “ব্যাকরণগত ভাবে ইতোমধ্যে এবং ইতঃপূর্বে শুদ্ধ হলেও বহুল ব্যবহার জনিত কারনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জোরালোভাবে ‘ইতিমধ্যে’ এবং ‘ইতিপূর্বে’কেই সমর্থন করেছেন। আমাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে এমনকি আগ বাড়িয়ে ইতোপূর্বে লিখতে ও দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথকে ডিঙানো আমাদের উচিত হবে কি ? প্রসঙ্গত, ভাষার ব্যাকরণ ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত নিয়ে কৌতুক চলে না, বৈদ্যুতিক দুরদর্শনের একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে বারংবার তা করা হয়েছে। এতে আমাদের ভাষা ও সঙ্গীতের খুব ক্ষতি হয়ে গেছে।
অধুনা লিঙ্গ ব্যবহারেও কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরো জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। ইংরেজীPresident এবং Chairman শব্দ দুটির বাংলা করা হয়েছে রাষ্ট্রপতি এবং সভাপতি। যেহেতু ‘পতি’ শব্দটি পুরুষ বাচক, সেহেতু এর স্ত্রীবাচক শব্দ সভানেত্রী। বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ শব্দটি ব্যবহার করছে। বিএনপি Chairman শব্দটির স্থলে দলীয় প্রধানকে Chairperson বলছে। দুটি দলেরই প্রধান ব্যক্তি মহিলা হওয়ায় সভানেত্রী বা চেয়ারপার্সন পদবী দুটির ব্যবহার যৌক্তিক। বাংলা ভাষায় সভাপতির লিঙ্গান্তরে সভানেত্রীর ব্যবহার আছে। কিন্তু ইংরেজী Chairman শব্দটির ইংরেজী কোন লিঙ্গান্তর নেই।
আমাদের সংবিধানে President শব্দটির বাংলা রাষ্ট্রপতি। প্রকান্তরে এ পদটাকে রাষ্ট্রনায়কও বলা হয়। পতি এবং নায়ক এ শব্দ দুটি পুরুষ বাচক। কোন একদিন হয়তো প্রেসিডেন্ট হবেন মহিলা। তখন তাঁকে আমরা সর্বাবস্থায় প্রেসিডেন্ট বলাই সমীচীন হবে। অন্যথায় আমাদের ভাষাগত সমস্যা হয়। স্মর্তব্য, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এ শব্দটি এবং জাতীয় বহু ইংরেজী শব্দ বহুপূর্বেই বাংলা ভাষায় আত্তীকৃত। ইংরেজী Justice শব্দটিও অনুরূপ, এ ক্ষেত্রেও একই সুপারিশ প্রযোজ্য। অনুরূপ ভাবে চেয়ার কে চেয়ার, স্পিকার কে স্পিকার বলাই সঙ্গত ও শ্রুতিমধুর। ইংরেজী Minister , MP শব্দ দুটির বাংলা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য। মন্ত্রী, কবি, দার্শনিক প্রভৃতি শব্দের লিঙ্গান্তর নেই। কিন্তু সদস্য শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ সদস্যা। অতএব মহিলাদের ক্ষেত্রে কথাটি হবে সদস্যা।
শিক্ষামন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত শিক্ষা নির্দেশিকা ২০১০ বা তৎপূর্বের নির্দেশিকা সমূহে দেখা যায় স্কুল কলেজ সমূহের জন্য পদগুলোর পদবী প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, ইত্যাদি। বর্তমানে বহু স্কুল কলেজের প্রধানই মহিলা। প্রতিষ্ঠান প্রধান মহিলা হলে শিক্ষার্থীরা একটি দরাখাস্ত লিখতে কি মাননীয় প্রধান শিক্ষক লিখবে, না মাননীয়া প্রধান শিক্ষায়িত্রী লিখবে, একটা বিভ্রান্তিতে ভোগে। পদবী গুলো যদি এমন হত, প্রধান শিক্ষক/শিক্ষয়িত্রী বা শিক্ষিকা, অধ্যক্ষ/অধ্যক্ষা, সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা, প্রভাষক/প্রভাষিকা, অধ্যাপক/অধ্যাপিকা তা হলে এ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতনা। এখন এ বিভ্রান্তি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা যে মাকে লিখতাম মাননীয়া/শ্রদ্ধেয়া/পূজনীয়া, মা, আমাদের উত্তরসুরীরা তা ভুলতে বসেছে। শিক্ষার্থী প্রত্যক্ষভাবে জানে তার স্কুলের প্রধান মহিলা; কিন্তু সে লিখছে মাননীয় প্রধান শিক্ষক, এতে আমাদের ভাষায় লিঙ্গের যে ব্যবহার আছে, তার প্রতি অবজ্ঞা করা হচ্ছে। স্ত্রী লিঙ্গ ও যে সম্মানসূচক তা অস্বীকার করা হচ্ছে। সর্বোপরি ভাষা ব্যবহারে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নিলে এ বিভ্রান্তি দূর হয়। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায়, এ লেখা লিঙ্গ বৈষম্য সৃষ্টিকর নয়; বরং লিঙ্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আকুতি।
মূল ব্যাপর হল স্কুল পর্যায়ে এখন আর বাংলা শেখার ভাল ব্যবস্থা নেই। বাংলা জানা শিক্ষকের অভাব প্রকট। মাধ্যমিক শ্রেণিতে বাংলা ২য় পত্রে ব্যাকরণ ৫০ মার্ক নৈব্যক্তিক। পরীক্ষার সময় এমনকি এসএসসি পরীক্ষার সময়ও শিক্ষার্থীদের অধিকাংশইএ পাশ ও পাশ দেখে পরীক্ষা বৈতরণী পার হয়ে যায়। এক সময়ে সঠিক বাংলা ইংরেজী না জানলে ডিগ্রি পাশ করা যেতনা। -এখন যায়। আর তাদের অনেকই এখন স্কুল-কলেজ সমূহে প্রবেশ করেছেন। যিনি নিজে স্কুল জীবনে বাংলা ভাষা শেখেননি, তিনি বৃদ্ধ হওয়া পর্যন্ত আর কখনো শিখতে পারবেন না। স্কুল জীবনে যদি শিক্ষার্থী পদ, বচন, লিঙ্গ, রীতি, কারক, বিভক্তি, নত্ববিধান, ষত্ববিধান, সন্ধি, সমাস, বাগধারা, এক কথায় প্রকাশ প্রবাদ প্রবচন এ গুলো না শিখে, তাহলে বাকী জীবনে আর এত কিছু শেখার সুযোগ হয়না। দীর্ঘ দু দশকেরও বেশী সময় ধরে এসব না জেনেও সিংহ ভাগ শিক্ষার্থী পরীক্ষা পাশ করে চলে যাচ্ছে। তাই বিজ্ঞজনেরা বলেন শিক্ষায় পাশের হার বেড়েছে, কিন্তু মানোন্নয়ন হয়নি। ভাষা তথা বাংলা ভাষা শেখার মানোন্নয়ন করতে হলে তৃণমূল থেকেই করতে হবে। বাজেট লাগবে, ভাল শিক্ষক লাগবে, কমপক্ষে মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগে আলাদা পিএসসি লাগবে, সরকারি, বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে নিয়োগ দেবে পিএসসি, স্থানীয় বডি দিয়ে দলীয় নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে।
ভাষা পরিবর্তনশীল। এটি সর্বজন স্বীকৃত। সে পরিবর্তন হবে যৌক্তিক, নান্দনিক, ক্ষেত্রবিশেষে ঐতিহ্যমন্ডিত এবং ব্যবহারে তুলনামূলক সুবিধাজনক। বিকৃতি ও এক ধরনের পরিবর্তন, কিন্তু সেটা তো কারো কাম্য নয়।
১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাংলা ভাষা এখন আন্তজার্তিক মাতৃভাষা। এ ভাষা অচিরেই জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হতে যাচ্ছে। বাংলা ভাষাকে ইউনাইটেড নেটওয়ার্কিং ল্যাংগুয়েজ এ অন্তর্ভূক্ত করার কাজ চলছে, শুদ্ধ বাংলা ব্যবহারের জন্য আদালতের নির্দেশনা রয়েছে।
এ সময়ে বাংলা ভাষাকে আমরা অতি প্রয়োজন ছাড়া যেন বেশি ওলট পালট না করি। অধিকতর জানান দেয়ার প্রয়াসে ‘ক’ তালিকা ও ‘খ’ তালিকা শিরোনামে দীর্ঘস্বরের ন্যূনতম দুটি তালিকা এতদ্সঙ্গে সংযোযিত হল। সামর্থ্যরে অভাবে আমাদের সাধারণের অনেকের পক্ষে লাইব্রেরি, বই-পুস্তক ইত্যাদির সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনা। আশা করি তালিকা দুটিতে বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত দীর্ঘস্বরের সিংহ ভাগ শব্দাবলী এক-দুই পাতায় চলে আসবে।
‘ক’ তালিকা
দীর্ঘ-ই-কার যুক্ত শব্দাবলী
ঈয় যোগেঃ বর্গীয়, স্বর্গীয়, করণীয়, গোপনীয়, স্মরণীয়, ঈর্ষণীয়, জাতীয়, স্থানীয়, দ্বিতীয়, তৃতীয়, তত্ত্বীয়, ধর্মীয়, পানীয়, বিভাগীয়, মাননীয়, সম্পাদকীয়, প্রার্থনীয়, প্রয়োজনীয়, অভাবনীয়, দর্শনীয়, বাষ্পীয়, মার্জনীয়, জলীয়, ভারতীয়, দলীয়, বাঞ্ছনীয়, রাষ্ট্রীয়, অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়, বরণীয়, অনুসরণীয়, অনুকরণীয় ইত্যাদি।
অর্থী যোগেঃ প্রার্থী, বিদ্যার্থী, শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী, পরীক্ষার্থী, প্রশিক্ষণার্থী, পদপ্রার্থী ইত্যাদি।
ঈন যোগেঃ সমকালীন চলাকালীন, অভ্যন্তরীণ, অন্তবর্তীকালীন, উদাসীন, গ্রামীণ, সম্মুখীন, প্রাচীন, প্রবীণ ইত্যাদি।
শীল যোগেঃ উন্নয়নশীল, গতিশীল, প্রগতিশীল, পঁচনশীল, সুশীল ইত্যাদি।
চারী যোগেঃ নভোচারী, পথচারী, পায়চারী, কর্মচারী ইত্যাদি।
ধারী যোগেঃ সনদধারী, ধ্বজাধারী, নামধারী, অস্ত্রধারী ইত্যাদি।
বাহী যোগেঃ পতাকাবাহী, ঐতিহ্যবাহী, ভারবাহী ইত্যাদি।
গামী যোগেঃ বিদেশগামী, ঢাকাগামী, অস্তাচলগামী, ইত্যাদি।
কামী যোগেঃ স্বাধীনতাকামী, মঙ্গলকামী ইত্যাদি।
মুখী যোগেঃ কর্মমুখী, জীবন মুখী, পশ্চাদ মুখী ইত্যাদি।
জয়ী যোগেঃ কালজয়ী, সোনাজয়ী, দিগি¦জয়ী ইত্যাদি।
শালী যোগেঃ প্রভাবশালী, সম্পদশালী, শক্তিশালী, পরাক্রমশালী ইত্যাদি।
বর্তীযোগেঃ পরবর্তী, মধ্যবর্তী, স্থলবর্তী, পূর্ববর্তী, অন্তবর্তী, অনুবর্তী, বশবর্তী, পাশ্ববর্তী ইত্যাদি।
ভূত যোগেঃ একীভূত,ঘনীভূত, দ্রবীভূত, বাষ্পীভূত, বশীভূত, পুঞ্জিভূত ইত্যাদি।
মানযোগেঃ শ্রীমান, ধীমান, প্রতীয়মান, ক্ষীয়মান, উদীয়মান ইত্যাদি।
তৎসম শব্দে রেফ (র্ ) এর পূর্ববর্ণে-ই-স্বর থাকলে তা দীর্ঘ-ই-স্বর (ী) হয়ঃ জীর্ণ, বিদীর্ণ, শীর্ণ, তীর্থ, সতীর্থ, শীর্ষ, বীর্য, চিকীর্ষা, ঈর্ষা, আকীর্ণ, সংকীর্ণ, অবতীর্ণ, দীর্ঘ ইত্যাদি।
ঈক্ষা যোগেঃ পরীক্ষা, অভীক্ষা, সমীক্ষা ইত্যাদি।
কতগুলো শব্দে স্বভাবতই দীর্ঘ-ই-কার (ী) হয়। যেমনঃ অবীরা, অধীর, অর্তীত, অধীন, অনীহা, অগ্রণী, অভীষ্ট, অবার্চীন, অধিকারী, অঙ্গীকার, অবিনাশী, আশীর্বাদ, আশীবিষ, আইনজীবি, আগামী, আগমনী, আগ্রহী, আগ্রাসী, ঈষৎ, উবর্শী, উপযোগী, একাকী, একীভূত, উদ্বোধনী, ঐশী, ক্রীড়া, কৃতী, কাহিনী, কিশোরী, কৌঁসুলী, কীর্তন, কল্যাণীয়েযু, গ্রীবা, গৌষ্ঠী, গিরীশ, গীতি, গ্রীষ্ম, গরীয়সী, গভীর, গাম্ভীর্য, গুণী, চীবর, ছাত্রী, জীবন, জীবিকা, জিগীষা, জগদীশ, টীকা, তীর তীর্যক, তরী, তরণী, দীন, তল্পীবাহক, দীপ, দ্বীপ, ধীবর, ধীর, ধীশক্তি, দীক্ষা, দাত্রী, ধরিত্রী, দলীয়, দীপ্ত, নদী, নীল, নীর, নীড়, নির্বাচনী, নীতি, নিশীথ, নীরব, নীলিমা, নির্ণীত, নেত্রী, নারী, নীরীহ, পীড়া, প্রমীলা, প্রত্যাশী, প্রীতি, পৃথিবী, প্রতীক্ষা, প্রতীতি, প্রতীক, পিয়াসী, পাত্রী, প্রতিযোগী, প্রকৌশলী, পল্লী, পদবী, বীর, বীণা, বিহীন, ব্যতীত, বাণী, বিনয়ী, বীথি, বীভৎস, বিনীত, বিহঙ্গী, বিভীষিকা, বহুবীহি, বিদ্রোহী, বাহিনী, বীমা, বিভাবরী, ব্যবসায়ী, বিদেহী, বিলাসী, বীত শ্রদ্ধ, বিরোধী, বিপরীত, বীজ, ভোগী, ভীষন, ভাগীরথী, ভীতি, ভূয়সী, মাধবী, মানসী, মায়াবী, মহতী, মীন, মহীরুহ, মন্ত্রী, মনীষী, মনীষা, মহীয়সী, মীমাংসা, মনোযোগী, মৃণালিণী, মন্ডলী, যামিনী, যাত্রী, যোগী, যুদ্ধংদেহী, রীতি, রবীন্দ্র , রাজ্ঞী, রূপবর্তী, রোগী, লীলা, নীলা, লক্ষ্মী, শশী, শীত, শালীন, শরীর, শৈলী, শতাব্দী, শীষ, শীতল, স্বাধীন, সীতা, স্বীকার, স্বাবলম্বী, সাবলীল, স্থায়ী, সমীহ, সাহসী, সমীকরণ, সমীভবন, সম্প্রীতি, স¤্রাজ্ঞী, স্ত্রী, স্থিতধী, সীমা, সীমানা, সীমান্ত, সীমন্ত, সহযোগী, সংবীক্ষন, হীন, হীরা, হৃদয় গ্রাহী, ইত্যাদি।
বি:দ্র: সহযোগী, উপযোগী, প্রতিযোগী, শব্দগুলোর সাথে ‘তা’ যুক্ত হলে শব্দান্ত বর্ণে দীর্ঘ-ই-কারের পরিবর্তে হস্ব-ই-কার হবে, যেমন- সহযোগী, সহযোগিতা, উপযোগী, উপযোগিতা, প্রতিযোগী, প্রতিযোগিতা, এরূপ কৃতী, কৃতিত্ব।
‘খ’ তালিকা
দীর্ঘ-উকার (ূ) যুক্ত শব্দাবলী
তৎসম শব্দে রেফ র্() এর পূর্ব বর্ণে উ-স্বর থাকলে তা দীর্ঘ-উ(ূ) স্বর হয়ঃ যেমন- ঘূর্ণি, চূর্ণ, তূর্ণা, তূর্য, দূর্বা, ধূর্ত, পূর্ণ, পূর্ণিমা, পূর্ব, মূর্খ, মূর্ছনা, মূছা, মূর্ধন্য, মূর্ধা, মূর্ত, মুহূর্ত, সূর্য, স্বতস্ফুর্ত, স্ফুর্তি, ঊর্মি ইত্যাদি।
ভুত-প্রেত ব্যতীত যত ভুত সব দীর্ঘ-উ-কার (ূ) হয়- যেমনঃ ভূত, ভূতপূর্ব, গোচরীভূত, একীভূত, ঘনীভূত, দ্রবীভূত, বাষ্পীভূত, পুঞ্জীভূত, অভিভূত, আবির্ভূত, অনুভূত, ভূতাপেক্ষ, পরাভূত, অঙ্গীভূত ইত্যাদি।
ভুবন শব্দটি ব্যতীত ভূমি অর্থে যত ভূ সব দীর্ঘ-উ-কার হয়- যেমনঃ ভূমি, ভূগোল, ভূমিকম্প, ভূ-সম্পত্তি, ভূ-ত্বক, ভূ-প্রকৃতি ইত্যাদি।
কিছু শব্দে স্বভাবতই ঊ বা দীর্ঘ-উ-কার (ূ) হয় যেমন : ঊষা, ঊন, ঊর্ধ্ব, কূজন (পাখির ডাক), কর্পূর, গূঢ়, ঘূর্ণন, চূড়া, চূড়ান্ত, চূত, তূণ, দূর, দূত, দূষিত, দুরূহ, দুর্গাপূজা, ধূপ, ধূলী, নূপুর, নূতন, ন্যূন, প্রসূ, প্রভূত, প্রতিভূ, ব্যূহ, ব্যূঢ়, বধূ, ভূমিকা, ভূয়সী, ভূষন, মূল, মূল্য, মূক, মূষিক, যূথ, যূথী, যূথিকা, যুপকাষ্ঠ, রূপ, রূপালি, রূঢ়, শূন্য, শূল, শুশ্রƒষা, সূচক, সূচনা, সূচি, সূত, সূতা, সূত্র, স্ফূলিঙ্গ, সূক্ষ্ম, স্ফূরণ, স্তূপ, সূর, সমূহ ইত্যাদি।
সাহায্যকারী বইঃ বাংলা একাডেমী বাংলা বানান অভিধান ৩য় সংস্করণ। বাঙালা ব্যাকরণ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মাধ্যমিক বাংলা ব্যাকরণ (বোর্ড), বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা শিক্ষা, হর লাল রায়।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply