বাংলাদেশ, রবিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২০ ইং, ২২শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আলেম সমাজের অহংকার আল্লামা আবুল খাইর রহ.

মুহাম্মদ সোহাইল সালেহ

আল্লামা আবুল খাইর রহ. এর জন্মের সমকালীন সমাজ ব্যবস্থা আজকের মত বেয়াড়া ও
কলুষময় নয়। মানুষের না ছিল কুঁজো স্বার্থান্বেষি স্বভাব। এখন যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে
সমাজে, বিগত তিন দশক বা তারও পূর্বে এসব ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার-স্যাপার। যাদের ছিল
বিশেষ করে আলেমশ্রেণির দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতীয় দুর্যোগে দুর্দান্ত শক্তি-সাহস এবং
অন্যায়কে রুখে দিয়ে সত্যকে জাগিয়ে তোলার যে মসি তাদের হাতে ছিল, তা আজ বর্তমানের
পক্ষে হকের উচ্চারণ করাও রীতিমত অসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতে-ফিরতে, সকাল-সন্ধ্যা
এমন এমন বিষয় নজরে পড়ছে যে, সুস্থ ও স্বাভাবিক পথ চলতে যারা এক সময় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ
করতেন, বর্তমান বিশ্বসময় তাদের জন্য সুখকর বলা যথার্থই মিথ্যাচার। মিথ্যা নিয়ে খেলা হচ্ছে
বিশ্বময়। মিথ্যাকেই ধ্যান-জ্ঞান করা হচ্ছে। ধরাকে সরা জ্ঞান করছে সরাইখানার কসাইজীবীরা!
মানুষ যে আস্থা রাখবে, সেই ঈমান-বিশ্বাস ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে ধারাক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ
ফ্লাইওভার নির্মাণ করে চলেছে। সুন্দর মানব-মন নিয়ে তৃপ্ত হবার কথা থাকলেও, বর্তমান
সমাজে বিদ্যমান অবমান-অপমানধারা সামাজিক দেহে বইতে শুরু করেছে এবং পরিবর্তনের এ
চলতি হাওয়া বেশ দমকায়িত এবং বিক্ষুব্ধই বলতে হয়। পশুত্বের চরিত্র লকলকিয়ে বেড়ে উঠছে
সবখানে-সর্বত্রেই। বহমান নষ্ট জীবনের উপান্তে দাঁড়িয়ে সুন্দর সকাল বেলার পাখির সুমধুর গান
শুনবে, অমন ভাবনা কর্কশকণ্ঠী কাকের কা কা-তে পরিণত হয়েছে। জীবন, সংসার, সমাজ,
পরিবার, ধর্ম, মৃত্যু, এসব বিবর্ণ-বিরস উপাদান সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে বিবাগি জীবনপথের
ভোরের পাখি শূন্যতায় ডানা মেলে স্বত্ত্বাহীন কোন সত্ত্বার কাছে করুণার শরণার্থী হয়ে আছে!
থমথমে পরিস্থিতে বিবেকবান মানুষ চায়, আবারও মানুষ হয়ে বাঁচতে। মানুষই চায়, সমাজ বান্ধব
হয়ে উঠতে। অপরিশীলিত জীবনবোধকে শালিন-শীলন করে তুলতে চায় মানুষ। কতটুকু
পারবে, সে সংবাদ শোনার জন্য সময়ের গহিনে কান পাততে হবে।

দাবি করতেই পারি, তখনের মনুষ্যজীবন একেকটি প্রতিষ্ঠান তুল্য। আলেমশ্রেণির মানুষরা যে
আরও অধিক কিছু ছিলেন, বানোয়াট কথা নয়। তারা আমাদের সমাজ-শুদ্ধতার সর্বশেষ
আপডেট। সমাজের প্রয়োজনে, সময়ের তাগিদে, প্রয়োজনের প্রয়োজনে যেসব ব্যক্তি-নামের
সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমাজব্যবস্থায় গড়ে উঠেছিল একদিন অবিভাজ্য অংশ হয়ে, তার যে বিলয়
ঘটতে চলেছে, এমন দাবিকে থুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার সাহস কারও আছে কী ? অন্তত আমার
মনে তা হয় না। যেসব মানুষ মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠান হয়ে সেবাব্রতে ছিলেন, আজ তাদের জা’গায়
আমরা যা করছি বা এ সমাজ যা করছে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, এতে করে সোনালি
দিনের ওপর থেকে মানুষের আস্থার পরস্পর সাপেক্ষ বিষয়গুলো নির্বাসিত হয়ে পড়তে চায়,
একথা অস্বীকার করার জো নেই। এমন ক্ষতিকারক ফরমালিন অব্যাহতভাবে ছড়াতে থাকলে
বিষক্রিয়ায় একদিন সমগ্র জাতির মুলুৎপাত হবে, এমন ভাবনা মন থেকে সরিয়ে দেয়া যায় না।
পরম সত্যকথা হল, বিগত কয়েক দশক যাবত আমাদের সামাজিক সামিয়ানায় যে অধোগামি
চরিত্রের অব্যাহত লোনাজল প্রবেশ করছে আর সমগ্র সমাজব্যবস্থাকে ওই লোনাজল পান করতে
হচ্ছে, এইটে মোটে অপলাপ নয়।
ইসলামের সুন্দর নীতিমালা কিংবা ইসলামশাসিত সোনালি দিনের কথা উচ্চারিত হলে অনেকের
মনে হয়, এসব গল্প-অপলাপ। বিশ্ববাসী, আরব-অনারব, সভ্য-অসভ্য সকলে ইসলামের
শাসনব্যবস্থাকে একবাক্যে ঝলমলিয়ে ওঠা ভোরের সূর্যোদয় বলবেন,  দীপ্তিময় সত্য।
একসময় মুসলমান পরিবারের সন্তানের মাথায় টুপি না থাকলে ভর্ৎসনা মেলত। এখন না
থাকাটাই বাহ্বার ও খোশ নসিবের বিষয়। মক্তব শিক্ষা পরিবারে পরিবারে ঐতিহ্য ছিল। এখন
ঐচ্ছিক বিষয়। ধর্মীয় পরিমণ্ডল থেকে একটু একটু করে সরে আসার কারণে সমাজ বেহায়াপনার
পীড়ায় যে ভীষণ রকম ভুগছে, একথা বলতে অনেকেই শোকার্ত দুপুরের মত বেশ কাতর বলেই
মনে হচ্ছে। আল্লামাদের সময় ব্যবস্থায় স্থিরীকৃত ধর্মীয় অনুশাসন আর সামাজিক বন্ধনের যে
মেলবন্ধন ছিল, তা বর্তমানে কোষে আবদ্ধ তরবারির মত অসার্থক মনে হবে। এমন দাবির
পেছনে গুচ্ছ গুচ্ছ কারণও রয়েছে। পরিবারের কম মেধা সম্পন্ন সন্তানকে মাদরাসায় পাঠিয়ে
বাবা-মা’রা দায়িত্ব শেষ করছেন। মেধাবি, সুন্দর-স্বাস্থ্যবান ছেলেকে ভর্তি করাচ্ছেন স্কুলে।
বাজেটের সব থেকে বেশি বরাদ্দ স্কুলছাত্রের জন্য! ভালো খাবার, বিনোদন, আদর-কদর ইংলিশ
মিডিয়ামে পড়ুয়া ছেলের জন্য। জুলুম ও বৈষম্যের বাহাদুরিতে একসময় দেখা যায়, পরিবারের
কম আদর পাওয়া ছেলেটি নৈতিকতাসম্পন্ন, পিতা-মাতার একমাত্র অবলম্বন বলে প্রতিভাত
হচ্ছে।
আমাদের চারপাশে এই যে ঘূর্ণায়মান ঘুড়ির মত বৈষম্য ঘুরপাক খাচ্ছে, ধর্মকে বাদ দিয়ে এর
থেকে পরিত্রাণের যে পথ-পদ্ধতি খোঁজা হচ্ছে, সে পথ আসলে রুদ্ধ। কব্জির জোরে নয়, সত্যের
সাথে বলতে চাই, আল্লামা আবুল খাইর রহ. তাঁর পূর্বসূরিদের মত সমাজবান্ধব মানুষ তৈরি
করতে যেয়ে তৎকালীন সময়ে ঘরে-পরিবারে ধরে-পরে মাদরাসার জন্য শিক্ষার্থী খুঁজেছেন।
এজন্যই তৎকালের আলেম সমাজ এতটে জ্ঞানবান ছিলেন!
বর্তমানে এ শুভব্রতবোধ ও সমাচার সত্যি সত্যি রুচিবৈকল্যের ক্রীতদাসে পর্যবসিত হয়েছে
মনে হয়। ভদ্রতা, নম্রতা, সভ্যতার সূত্র এবং গুণাগুণের প্রভিন্ন সম্ভাবনা আজ দুঃসময়ের মুখে
দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের দাবিতে, সমাজের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে। মনে রাখতে
হবে, সহানুভূতি অনুভূতিহীনে আদায় হয় না। তার জন্য অতীত ঐতিহ্য মারফত গুণাগুণ রপ্ত
করতে হয়। মানব সভ্যতার ঝরা পাতাগুলো আর্কাইভ থেকে এনে সময় ও জীবনের গতিকে
পথিক বানাতে পারলেই আপনাতে অধিকার আদায় হয়ে যায়। আমাদের আর্কাইভ হচ্ছেন
আলেমসমাজ এবং শুদ্ধতম ব্যক্তিবর্গ। তাঁদেরকে মানবসভ্যতার নিক্তি বানানোর কাজে নামতে
হবে। নইলে আমাদের অবস্থা যে কে সেই; রয়ে যাবে।

বুদ্ধিজীবী প্রচ্ছদে পরজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের অধোগামি চরিত্র, আধুনিকতার ঝাঁঝালো
সাম্প্রদায়িকতা, নৈতিক-দেউল প্রগতিশীল সর্বোপরি বিচারিক প্রহসন যারা করেন তাদের জটিল,
পঙ্কিল চরিত্র বিশ্লেষণ করে আজ কাল বলা হচ্ছে এরা শুদ্ধচারী! অথচ কথিত শুদ্ধচারীদের
সমাজব্যবস্থা থেকে তাড়িত করবার গরজ কেউ বোধ করছেন না। উপরন্তু যারা নবি সা. এর
উত্তরসূরি হয়ে কাজ করছেন তাদেরই মুখে কুলুপ আটা হচ্ছে। সমাজব্যবস্থার দুরাচার দূর
করতে আলেমসমাজের এক সময়ের উপস্থিতিটা চলমানে অস্তাচলের পথে। প্রতিবাদ করবার
মতন মানসিক শক্তি যাদের ছিল, যারা বলতে পারতেন অনেক কথা, তাদের অনেকেই আজ
বেঁচে নেই, তাই এসব হচ্ছে? কেন?
মানুষ বিচ্ছেদি। চলে যাওয়ায়ই তার ধর্ম। ওই সব মানুষ বেশ আগেই বিগত হয়েছেন তাই।
কিন্তু যারা বেঁচে আছেন, তারা তো তাদেরকে দেখেছেন নতুবা তাদেরকে পড়েছেন। সমাজের
ক্ষত দেখার পরও যারা চুপ করে থাকেন তারা ঘাতক, শয়তান মিনমিনে, একথা আমরা
আমাদের পূর্বসূরীর কাছ থেকে জেনেছি। যারা আকাবেরদের পরিচ্ছন্ন সমাজ দানে আশ্বাস
দিয়েছিলেন, তাঁরা আশ্বাসঘাতকের পরিচয় দিতে লজ্জা করেননি এবং করছেন না। আজ
আলেমসমাজ ঐক্যহীন। তাঁরা যে এক হতে পারবেন না, তাতেই তাঁরা একমত! আল্লামা আবুল
খাইর রহ. এর সমকালীন সময়ে দেখা গেছে, দেশের চরম মুহূর্তে তাঁরা সবাই এক হয়ে কাজ
করেছেন। সমাধান দিয়েছেন কঠিনে-দুর্দিনে। এখন আপস-রফা করে চলছেন তাঁদের
উত্তরসূরীরা। প্রতিবাদ করতে অপারগ নন, এমন মানুষও স্বেচ্ছায় একাকীত্বের বাহুলতায় পিষ্ট
হয়ে ধরায় বেঁচে থাকছেন। কেউ কেউ আছেন, একলা চলো নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে ভালোর সাথে
দিনমান কাটাচ্ছেন। তাদের দেখলে মনে হবে, মানসিক স্তরে তারা বেশ কঠিন। কিন্তু বাস্তব
বিচারে এ ধারণা সঠিক বলে দাবি করা যায় না। নীতি-নৈতিকতার ধার না ধারার চলমান সময়ে
শুধু ওয়াজ, নসিহত, আলোচনা, বক্তব্য, টকশো, মুনাজারা, বিবৃতি প্রভৃতি দিয়ে সমৃদ্ধি আনয়ন
সম্ভব নয়। ঘরে-বাইরে ইকুয়াল হতে না পারলে দু’মুখো সাপের ছোবল থেকে মুসলমানসমাজ
কেন, কোন জাতিরই পরিত্রাণ পাওয়ার কথা নয়।
আজকের আমলহীন সমাজব্যবস্থায় ইলমের সাথে আমলের সমন্বয়সাধন বেশ জরুরি হয়ে
পড়েছে। তাওবার কষ্টিপাথরে কপাল-স্পর্শে খোদার রেজামন্দির জন্য ধাবমান অবশ্য কর্তব্য
কাতারে, বলাটা অতিরিক্ত বলা নয়। নইলে ঝরাপাতার নিঃশব্দ পতনের মতন মুসলিমজাতি
জগৎসংসার থেকে অন্তর্লীন হয়ে যাবে, সন্দেহের ইখতিয়ার নেই। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের ত্রাহি
অবস্থা এ কথারই ইঙ্গিত-ইশারা দেয়!
আল্লামা আবুল খাইর রহ. জীবিত থাকতে সময় ও জাতির ক্রান্তিকালে শারীরিক, মানসিক,
আর্থিকভাবে অনেক নজির স্থাপন করে গেছেন, যা ভুলে যেতে চাইলেও অসম্ভব! মাদরাসা
শিক্ষার উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, সমাজের সালিশি ক্ষেত্রে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা, অবদানের
কথা জনমুখবিধিত। যতদিন বেঁচে ছিলেন এমন ভূমিকা অক্লেশে পালন করে গেছেন। আজকের
রুদ্রসময়ে তরুণ-প্রজন্ম বা তার সমসাময়িক মানুষের কাছে আল্লামা আবুল খাইর রহ.এর
উদ্যম, উদ্যোগ, প্রতিভা ও সাহসের কথা অলিকজ্ঞান হলেও, সত্য এটাই। এটাই সত্য।
আল্লামা আমাদের ভাবনার বাইরেও অনেক ভূমিকা রেখেছেন। মনে রেখাপাত করতে সমর্থ,
এমন ছয় দশক তিনি মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। সেখান থেকে বিশেষ অংশ তুলে ধরা যায়
বলে কাগজের পাতায় অক্ষরের সম্মিলন।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপশহরের উত্তর পরুয়াপাড়া গ্রামে মুসলিম উম্মাহর শুভার্থী
আল্লামা আবুল খাইর রহ. ১৯১২ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৭ খৃস্টাব্দের ১৬
সেপ্টেম্বর, বুধবার পবিত্র হজব্রত পালন শেষে দেশে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক
আহত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাইহে রাজিউন)।

শেয়ার করুনঃ

আরো খবর

Leave a Reply