সাঈদুর রহমান লিটন

 

মজুমদার স্যারের একটা অটল বিশ্বাস, ভোরের হাঁটা মানেই ওষুধ ছাড়া চিকিৎসা। প্রতিদিন সকালের প্রার্থনা শেষে তিনি গ্রামের পাকা রাস্তা ধরে হাঁটতে বের হন। টানা এক ঘন্টা হাঁটেন। গ্রামের মানুষ বলে, স্যারের কাছে নাকি রোগবালাই আসতে গিয়েও পথ হারিয়ে ফেলে।

তাঁর হাঁটার পথে জলকর এলাকার পাশে একটা বিশাল গর্ত আছে। গর্ত বললে অবশ্য একটু কম বলা হয়। বর্ষাকালে দেখলে মনে হয় ছোটখাটো পুকুর। চারদিকে বেতঝাড়, আর একপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বুড়ো ডুমুর গাছ। সেই গাছের ডালে ঝুলছে এক বিরাট মৌচাক। এত বড় যে গ্রামের লোকজন মজা করে বলে, এই মৌমাছি গুনতে বসলে নাতির বিয়ের বয়স ও পার হয়ে যাবে।

সকালের সূর্যের আলো পুকুরের পানিতে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে মৌচাকে এসে লাগে। তখন হাজার হাজার মৌমাছি এমন ঝিকমিক করে, যেন কেউ সোনার গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে এমন মনে হয়। মজুমদার স্যার দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন। মনে মনে বলেন, হায় ভগবান ! এত ছোট্ট প্রাণী, অথচ মানুষের জন্য কত অমূল্য মধু তৈরি করে!

কিন্তু সেদিনের সকালটা ছিল একটু অন্য রকম।

সেদিন স্যার একটু দেরিতে বের হয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে মৌচাকের কাছে যেতেই দেখলেন, এক দুষ্টু চিল মৌচাকের দিকে হামলা চালিয়েছে। চিলের উদ্দেশ্য একটাই, আজকের সকালের নাস্তা করবে মধু দিয়ে।

ব্যস! মৌমাছিদের আর রাগ ধরে না। তারা দল বেঁধে চিলকে তাড়া করল। কিন্তু চিল তো আকাশের উস্তাদ, মুহূর্তেই উড়ে পালাল। আর ঠিক তখনই সামনে দেখা গেল একমাত্র জীবন্ত প্রাণী,মজুমদার স্যার!

মৌমাছিদের মনে কী হলো কে জানে! তারা বুঝি ভাবল, এই লোকটাই নিশ্চয় চিলের ওস্তাদ !

মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মৌমাছি স্যারের পেছনে লেগে গেল।

মজুমদার স্যারও কম যান না। জীবনে এত দ্রুত দৌড়েছেন কি না, তা তিনি নিজেও জানেন না। হাঁটার ব্যায়াম মুহূর্তেই পরিণত হলো শত মিটার স্প্রিন্টে!

দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বলছেন, —আরে বাবা! আমি মধু নিতেও আসিনি, কিনতেও আসিনি! তবে কেন আমার পিছনে!

কিন্তু মৌমাছিদের কোনো যুক্তি নেই। তারা হুলের ভাষাতেই আলোচনা চালিয়ে যেতে লাগল।

ভোরবেলা হওয়ায় চারপাশে লোকজনও নেই। স্যারের চিৎকার শুনে সবার আগে ছুটে এলেন দাস বাড়ির নতুন বউ। হাতে ছিল একটা মোটা কাঁথা। কোনো কিছু না ভেবেই তিনি কাঁথাটা স্যারের গায়ে জড়িয়ে দিলেন।

স্যার বাঁচলেন ঠিকই, কিন্তু বেচারি নতুন বউও কয়েকটা হুলের স্মারক উপহার পেলেন।

কিছুক্ষণ পর মৌমাছিদের রাগ কমল। তারা আবার নিজেদের কাজে ফিরে গেল।

এদিকে গ্রামের লোকজন এসে স্যারের শরীর থেকে একে একে হুল বের করতে লাগল। কেউ বলল, স্যার, এতগুলো হুল তো পরীক্ষার খাতায়ও একসঙ্গে কখনো দেননি!

আরেকজন মলম লাগাতে লাগাতে বলল, স্যার, আজকের হাঁটার ক্যালরি তো আর আলাদা করে মাপতে হবে না!

সবাই হেসে উঠল। ব্যথার মধ্যেও মজুমদার স্যারের মুখে ফুটে উঠল মৃদু হাসি।

দুই ঘণ্টা বিশ্রাম আর প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি বাড়ির পথে রওনা হলেন। হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবলেন,

জীবনে কখন কার ভুলের শাস্তি কার ঘাড়ে এসে পড়ে, তা বলা বড় কঠিন! ঈশ্বরের কৃপা থাকলে বিপদের মধ্যেও মানুষ রক্ষা পায়।

সেদিনের পর থেকে মজুমদার স্যার অবশ্য মৌচাকের পাশ দিয়ে হাঁটেন ঠিকই, তবে একটু দূর দিয়ে। আর গ্রামের মানুষ তাঁকে দেখলেই মুচকি হেসে বলে,

স্যার, আজকে আবার মৌমাছিদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই তো?

স্যারও হেসে উত্তর দেন,

না ভাই, আজ শুধু হাঁটতে এসেছি, তাদের সাথে সাক্ষাৎকার নিতে নয়!

শেয়ার করুনঃ