১৫ জুলাই ২০২৪ / ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ / সকাল ১১:১২/ সোমবার
জুলাই ১৫, ২০২৪ ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী

     

 

বিপ্লব কান্তি নাথ

রথযাত্রা সনাতনধর্মের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। ভারতের ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। এছাড়া ইসকনের ব্যাপক প্রচারের জন্য এখন এটি বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। ভারতের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ রথযাত্রা ওড়িশার পুরী শহরের জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা। পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল, শ্রীরামপুর শহরের মাহেশের রথযাত্রা, গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের রথ, কলকাতার রথ এবং বাংলাদেশের ইসকনের রথ ও ধামরাই জগন্নাথ রথ বিশেষ প্রসিদ্ধ।
রথযাত্রা উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রার সময় যাত্রাপালা মঞ্চস্থের রীতি বেশ জনপ্রিয়। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, তাঁর স্ত্রী মা সারদা দেবী, নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-সহ প্রমুখ ব্যক্তিরা রথের বিখ্যাত মেলা পরিদর্শনে আসতেন। শ্রী রামকৃষ্ণ বলতেন যাত্রাপালায় লোকশিক্ষা হয়।
পুরাণ থেকে রথ যাত্রার কথা জানা যায়। স্কন্দ পুরাণে আমরা পাই যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে এক রাজা ছিলেন উৎকল রাজ্যে, (বর্তমান উড়িষ্যা) তিনি ছিলেন পরম ভক্ত। তিনি একদিন স্বপ্নাদিষ্ট হন একটি মন্দির নির্মাণের জন্য। পরে দেবর্ষী নারদ এসে জানান স্বয়ং ব্রহ্মারও তাই ইচ্ছা, তিনি নিজে সেটা উদ্বোধন করবেন। নারদ রাজাকে বললেন আপনি বহ্মাকে নিমন্ত্রন করুন। সেই উপদেশ মাথায় রেখে রাজা ব্রহ্মলোকে গেলেন এবং বহ্মাকে নিমন্ত্রণ করলেন। কিন্তু ব্রহ্মলোকের সময় এর সাথে তো পৃথিবীর মিল নেই, আর পৃথিবীতে তত দিনে তাই কয়েক শতবছর পার হয়ে গেছে। ফিরে এসে রাজা দেখলেন তাকে কেউ চেনে না। যা হোক তিনি আবার সব কিছু নতুন করে করলেন। দৈবভাবে রাজা জানতে পারলেন সমুদ্র সৈকতে একটি নিম কাঠ ভেসে আসবে, সেটা দিয়েই তৈরি হবে দেব বিগ্রহ।
একজন কারিগর এলেন বিগ্রহ তৈরি করতে, কিন্তু নির্মাতা শর্ত দিলেন তিনি নিভৃতে কাজ করবেন। আর বিগ্রহ তৈরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে বিরক্ত করা যাবে না এবং মন্দিরে যাওয়াও যাবে না। এদিকে মূর্তি তৈরি শুরুর কিছু দিন পর রাজা কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে মন্দিরে প্রবেশ করে দেখেন কেউ নেই সেখানে। আর আমরা যে রূপে এখন জগন্নাথ দেবকে দেখি, সেই মূর্তিটি শুধু রয়েছে। পরে ঐ ভাবেই স্থাপিত হয় মূর্তি। ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজা জগন্নাথ দেবের মূর্তিতেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে শ্রীকৃষ্ণ এবং জগন্নাথ দেব একই সত্ত্বা চিন্তা করে একই আদলে তার পাশে ভাই বলরাম এবং আদরের বোন সুভদ্রার মূর্তি স্থাপন করা হয়। পুরীতে তিন রথের যাত্রা হয়, প্রথমে বলরাম তার পর সুভদ্রা এবং শেষে জগন্নাথ। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা অনঙ্গভীমদেব তিনরথের রথ যাত্রা প্রচলন করেন।
কঠোপনিষদে বলা হয়েছে- আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মন: প্রগ্রহমেব চ।। (১/৩/৩)
এই দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী। আর ঈশ্বর থাকেন অন্তরে। রথ যাত্রার রূপক অর্থ কিন্তু এমনই। যা হোক তিনি আমাদের অন্তরে থাকেন। তাঁর কোন রূপ নেই। তিনি সর্বত্র বিরাজিত অর্থাৎ-
ঈশাব্যাসমিদং।
বেদ বলছে, আবাঙমানসগোচর, মানে মানুষের বাক্য এবং মনের অতীত। আমরা মানুষ তাই তাকে মানব ভাবে সাজাই। এ বিষয়ে কৃষ্ণ যজুর্বেদিয় শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের তৃতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে-
অপাণিপাদো জাবানো গ্রহীতাপশ্যত্যচ ক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্নঃ। স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তাতমাহুরগগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্।।
অর্থাৎ : তার লৌকিক হস্ত নাই, অথচ তিনি সকল দ্রব্য গ্রহণ করেন। তাঁর পদ নাই অথচ সর্বত্রই চলেন। তাঁর চোখ নাই অথচ সবই দেখন। কান নাই কিন্তু সবই শোনেন। তাঁকে জানা কঠিন, তিনি জগতের আদিপুরুষ। এই বামনদেব ই বিশ্বাত্মা, তাঁর রূপ নেই, আকার নেই। উপনিষদের এই বর্ণনার প্রতীকী রূই হল পুরীর জগন্নাথদেব। পুরাণ মানেই ধর্ম কথাকেই গল্পচ্ছলে বা রূপকের মাধ্যমে প্রচার। তাঁর পুরো বিগ্রহ তৈরি সম্ভব হয়নি- কারণ তাঁর রূপ তৈরিতে আমরা অক্ষম। শুধু প্রতীককে দেখান হয়েছে মাত্র। তাছাড়া ও আর একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে সেটা হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করেন, তারপর তিনি আর বৃন্দাবনে আসেননি। কিন্তু একবার রথে করে পার্শ্ববর্তী গ্রামে এসেছিলেন বৃন্দাবনবাসিদের সাথে দেখা করতে। বৃন্দাবনবাসিরা কৃষ্ণকে প্রাণাধিক ভালবাসত তাই তাঁর বিরহে তাঁর প্রিয়জনদের অবস্থা দেখে কিছুক্ষণের জন্যে কৃষ্ণ বলরাম সুভদ্রা তিন জন নির্বাক হয়ে যান এই ভালবাসা দেখে। তখন তাঁদের অমূর্ত রুপ ফুটে ওঠে। এই রূপই বর্তমান জগন্নাথ দেবের রূপ।
রথযাত্রা এবং সামাজিক ঐক্য: পুরীকে পুরুষত্তোম ক্ষেত্র বলা হয়। এখানকার রথ যাত্রায় দিন কোন ভেদাভেদ থাকে না। ধনী,দরিদ্র, উচু, নিচু, স্পৃশ্য, অস্পৃশ্য সবাই এক কাতারে ভগবানকে নিয়ে রাজ পথে নামে। আর আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভগবান সবার এবং সবাইকে একত্রিত হতে। কারণ ভগবান সকলের, ভগবানে সবার সমান অধিকার। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু সবাইকে নিয়ে কীর্তন করতে রথযাত্রায় অংশ নিতেন। তাছাড়া প্রভাষখন্ড থেকে জানা যায় যে পুরীতে অভক্তু থেকে বিগ্রহ দর্শন করা যাবে না। আগে প্রসাদ খেতে হবে পরে দেব বিগ্রহ দর্শন। এখনও এ নিয়ম চলে আসছে। পুরীকে শঙ্খক্ষেত্রও বলা হয় কারণ মানচিত্রে একে শঙ্খের মত দেখতে লাগে।
জগন্নাথের রথের রশি একবারের জন্য হলেও স্পর্শ করা :
রথযাত্রায় জগন্নাথের রথের রশি একবারের জন্য হলেও স্পর্শ করবেন। জগন্নাথ ভক্তের মন আকুল হয়ে থাকে রথের রশি একবারের জন্য হলেও, মুহূর্তের জন্য হলেও ছোঁয়ার জন্য। কিন্তু কি এমন মাহাত্ম্য আছে জগন্নাথের রথের রশিতে যা ছোঁয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যাকুল হয়ে থাকে ?
কিংবদন্তি বলে একটা সময়ে ছিল যখন জগন্নাথের রথের রশি ছুঁয়ে সেই রথের চাকার তলায় আত্মঘাতী হত কোনও এক ভক্ত।কিন্তু কি বিশ্বাসে এই আত্ম বলিদান? এ এক অনাদিকাল ব্যাপি বিশ্বাস জগন্নাথদেবের রথের রশি স্পর্শ করে রথের চাকার তলায় একবার প্রাণ বিসর্জন দিতে পারলে পুনর্জন্মের কষ্ট সহ্য করতে হয় না। রথের চাকার তলায় ভক্তের এই আত্মবলিদানই পরবর্তীকালে জন্ম দেয় ইংরেজি শব্দ- লঁমমবৎহধঁঃ– এর যার অর্থ- অপ্রতিরোধ্য ধবংসাত্মক শক্তি।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের উৎকল খণ্ড অনুযায়ী জগন্নাথদেবের রথের রশি স্পর্শ করলে- অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। এই রথের দড়ি মাথায় ঠেকালে আর দুঃস্বপ্ন দর্শন হয় না। মানুষের সব পাপ থেকে মুক্তি পায়, রোগ থেকে মুক্তিলাভ করে।
সূতসংহিতা বলে- ” রথে তু বামনাং দৃষ্টা,পুনর্জন্ম ন বিদতে।” অর্থাৎ : জগন্নাথদেবের রথের রশি একবার স্পর্শে আর পুনর্জন্ম হয় না। শ্রীজগন্নাথের বামন অবতার রথে। তাই ইন্দ্রনীলময় পুরাণের মতে, জগন্নাথের রথের রশি কোনমতে স্পর্শ করলেও পুনর্জন্মের কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। “পুনর্জন্ম ন ভূঞতে”‘।
কথিত আছে সনাতন গোস্বামী, শ্রীচৈতন্যদেবের অন্যতম প্রিয়শিষ্য অসুস্থ হয়ে রথযাত্রার দিন জগন্নাথদেবের চলন্ত চাকার তলে প্রাণ বিসর্জন দিতে চেয়েছিলেন। তাঁকে বাধা দিয়ে শ্রীচৈতন্যদেব বলেন-, ‘‘সনাতন, এ রকম দেহত্যাগে যদি কৃষ্ণকে পাওয়া যেত তাহলে এক মূহুর্তের মধ্যে আমিও আমার লক্ষ জন্ম তাঁর শ্রীচরণে সমর্পন করতাম। কিন্তু দেহত্যাগে কৃষ্ণকে পাওয়া যায় না। এরকম দেহত্যাগ হচ্ছে তমোগুণ। তমোগুণে কৃষ্ণকে পাওয়া যাবে না। ভক্তি ছাড়া, ভজন ছাড়া তাঁকে পাওয়ার উপায় নেই।’’
কপিল সংহিতায় রয়েছে, জগন্নাথ নিজে বলেছেন গুণ্ডিচা মহাযাত্রায় যে আমাকে দর্শন করবে সে কালক্রমে সব পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আমার ভুবনে যাবে।
জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার পৃথক রথ :
শাস্ত্র মতে নীম কাঠ দিয়ে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার রথের নির্মাণ করা হয়। বসন্ত পঞ্চমী তিথি থেকেই রথের উপযুক্ত কাঠ নির্বাচন শুরু হয়। রথ নির্মাণে পেরেক, কাঁটা বা অন্য কোনও ধাতু ব্যবহার করা হয় না। যে তিনটি রথে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা নগরযাত্রায় বের হন, তাদের প্রতিটির পৃথক নাম ও বিশেষত্ব রয়েছে।
জগন্নাথ :
জগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ, ১৬ চাকার এই রথ ৪৫ ফুট উঁচু এবং লাল ও হলুদ রঙের হয়। এই রথের পতাকার নাম ত্রৈলোক্যমোহন, এর রক্ষক গরুড়, সারথী দারুকা। যে রশি দিয়ে জগন্নাথের রথ টানা হয় তার নাম শঙ্খচূড়া।
বলভদ্র :
বলরাম বা বলভদ্রের রথ তালধ্বজ নামে পরিচিত। ১৪ চাকা বিশিষ্ট ৪৩ ফুট উঁচু এই রথ লাল, নীল ও সবুজ রঙের হয়ে থাকে। তালধ্বজের চূড়ায় যে পতাকা শোভা পায়, তার নাম উনানি। এই রথের রক্ষক বাসুদেব, সারথী মাতালি, দড়ির নাম স্বর্ণচূড়া।
সুভদ্রা :
শাস্ত্র মতে সুভদ্রার ১২ চাকার ৪২ ফুট উঁচু রথের নাম দেবদলন। লাল ও কালো এই রথের পতাকার নাম নন্দ্বিক। এই রথের রক্ষক জয়দুর্গা, সারথী অর্জুন ও রশির নাম স্বর্ণচূড়া।
সুভদ্রা, বলরাম ও জগন্নাথ দর্শনে সবার মন অনন্ত সুখ ও শান্তিতে ভরে ওঠে। রথের দড়ির স্পর্শ মানে মানুষের জীবনে গতি ও জীবন জোয়ারের আনন্দ। জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসবের মধ্যে প্রাণের স্পন্দন ও আকূলতার পূর্ণ নিদর্শন বর্তমান। রথের দড়ি টানা, নানা আচার ও অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তারই প্রবাহধারার প্রমাণ পাওয়া।
সুভদ্রার অনুধ্যান ব্যতীত রথযাত্রার পূর্ণতা ঘটে না। মূলত পুরীর রথযাত্রা ত্রৈয়ী আধারের বিমূর্ত প্রকাশ। জগন্নাথদেবের পূজারী হলেন শবরশ্রেণির মানুষ। তারা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে সম ভাবে আরাধনা করেন পূর্ণ ভক্তির মাধ্যমে।
ভগবানকে শুদ্ধ চিত্তে, নিষ্ঠাভরে ভজন করলে অতি সহজেই তাঁর কৃপা লাভ করা যাবে এবং মনে শান্তি বিরাজ করবে।
প্রবাহমানতা, নির্মলতা, গতিময়তা, সুস্বাস্থ্য এবং অনন্য অনাবিল সুন্দরের প্রতীক রথযাত্রা। যেখানে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মঙ্গল স্পর্শে মানবকূলের পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়। মূলত উন্নতি, গতি ও রূপান্তরের আলেখ্যে সুষম সন্নিধান ঘটে মানুষের প্রদীপ্তময় উজ্জ্বলতার তীর্থে। যেখানে রথযাত্রা জগন্নাথদেব, বলভদ্র এবং সুভদ্রার সংসর্গে অর্থ, সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তির প্রতীক হয়ে প্রতীয়মান রয়।

লেখক : সংবাদকর্মী, সাধারণ সম্পাদক, রুদ্রজ ব্রাহ্মণ পুরোহিত সংঘ, বাংলাদেশ, কেন্দ্রীয় সংসদ

About The Author

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply