১৫ এপ্রিল ২০২৪ / ২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ / বিকাল ৩:৪৯/ সোমবার
এপ্রিল ১৫, ২০২৪ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নৃতৃত্বে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু টানেলের দুয়ার খুলবে শীগ্রই

     

বিপ্লব কান্তি নাথ

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর গেল বছর বাংলাদেশ বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সাহায্য করতে গিয়ে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। এরপর দারিদ্র্যের কশাঘাতে ধুঁকতে ধুঁকতে ২২ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ। এরপর এক যুগ ১বছর আওয়ামী লীগের একটানা ক্ষমতাকালে সেই বাংলাদেশ এখন অন্য দেশকেও সাহায্য-সহযোগিতা করছে। উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটে চলা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ এখন সাহায্য গ্রহীতা নয়, সাহায্যদাতার কাতারে উঠে এসেছে। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে লাল-সবুজের বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের মধ্য দিয়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে এখন চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটল বাংলাদেশের।
৭৫ বছর আগে স্বাধীন হওয়া পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এমনকি ভারতকেও ছুঁয়ে ফেলেছে প্রায়। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস অভিঘাতে বিপর্যস্ত বিশ্বে বাংলাদেশ গেল অর্থবছরে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপির সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে বলে খোদ বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ এখন আর আগের অবস্থানে নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা দিনে দিনে বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে আমাদের সামনে। বিশ্বকে জানান দেওয়ার এখনই মোক্ষম সময়। ঠিক সেই সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।মেট্রোরেল ২৮ ডিসেম্বর ২০২২ সালে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয়। সরকার ২০১২ সালে মেট্রোরেল প্রকল্প গ্রহণ করে। বাস্তবে কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে।
একের পর এক মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল প্রত্যেকটি প্রকল্পই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য ও অদ্বিতীয়। তবে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল যেন একটু বেশিই ব্যতিক্রম। প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র আন্ডার ওয়াটার টানেল। ৯.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলটির নদীর তলদেশের অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৫ কি.মি.। প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন প্রায় তিন হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। বাকি পাঁচ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ সহায়তা প্রদান করছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। নদীর তলদেশে সর্বনিম্ন ৩৬ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ১০৮ ফুট গভীরে স্থাপন করা হচ্ছে দুটি টিউব। নদীর তলদেশে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরে চার লেনের টানেলে চলবে যানবাহন।
২০১৩ সালে কারিগরি সমীক্ষার পর ‘কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেনবিশিষ্ট সড়ক টানেল নির্মাণ’ শীর্ষক মেগাপ্রকল্প সরকার অনুমোদন করে। পরবর্তী বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বেজিংয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয় এ বিষয়ে। ২০১৫ সালের ৩০ জুন নির্মাতা চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিসিসির সঙ্গে চুক্তি সই হয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যৌথভাবে এ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধু টানেল যোগ করবে নতুন মাত্রা। টানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে কর্ণফুলীর দুই তীরে গড়ে উঠবে ‘এক নগর, দুই শহর’। এ রকম নগরীর দেখা মেলে চীনের সাংহাইয়ে। দেশটির সবচেয়ে বড় ও জনবহুল নগরী সাংহাই পরিচিত ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে। এই শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্রকে দুই ভাগে ভাগ করেছে চ্যাং জিয়াং নদীর উপনদী হুয়াংপু, যে নদীতে নির্মিত টানেল যুক্ত করেছে দুই তীরকে। সাংহাই সমুদ্রবন্দর বর্তমান বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্র বন্দর। সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দরগুলোর একটিও। সাংহাই নগরীর মতো চট্টগ্রাম নগরী থেকে আনোয়ারা উপজেলাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে কর্ণফুলী নদী।
ইতোমধ্যে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারায় ৭৬০ একরের অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন বিদেশী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। টানেলের সংযোগ সড়ক থেকে শুরু করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় পোশাক, সার, সিমেন্ট, ইস্পাত, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন ধরনের শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। কিছু শিল্প কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে এখানে গড়ে উঠছে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও হাসপাতাল। এসব শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শুধু আনোয়ারা বা কর্ণফুলীই নয়, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সমগ্র এলাকাতেই তৈরি হয়েছে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা।
কর্ণফুলী টানেল চট্টগ্রাম শহর এড়িয়ে মাতারবাড়িতে নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সারাদেশের সড়কপথে যোগাযোগ সহজ করবে। উপরন্তু টানেলের সংযোগ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক। যার মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে সরাসরি পণ্য পরিবহন করা যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও শিল্প-বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি এ টানেল সড়কপথে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু টানেলের কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশেরও অধিক শেষ হয়েছে। বাকি কাজ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সেতু কর্তৃপক্ষ। আগামী কয়েক মাসে কাজ শেষ করে বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদায়ী বছরের ২৬ নভেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের’ দু’টি সুড়ঙ্গপথের (টিউব) একটির কাজ শেষে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, দক্ষিণ টিউবের কাজ শেষের পর এখন উত্তর টিউবসহ আনুষাঙ্গিক কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। গত বছর ডিসেম্বরে উত্তর টিউবের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় কিছুটা বাড়তি লাগছে। তবে চলতি বচরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে উত্তর টিউবসহ বাকি কাজ শেষ করার টার্গেট নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
কর্ণফুলী নদীর দুইপাড়ে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ গড়ে তুলতে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন টানেল প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। নির্মাণ কাজ করছে চীনা কোম্পানি ‘চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।’
নগরীর পতেঙ্গায় নেভাল একাডেমির পাশ দিয়ে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় নেমে যাওয়া এই টানেল কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্বে আনোয়ারায় সিইউএফএল ও কাফকোর মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে স্থলপথে বের হবে। ৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতার টানেলে দুটি টিউব দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে। টানেলের উত্তরে নগরীর দিকে আউটার রিং রোড, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কাটগড় সড়ক, বিমানবন্দর সড়ক এবং পতেঙ্গা বিচ সড়ক দিয়ে টানেলে প্রবেশ করা যাবে।
টানেল দিয়ে মোটর সাইকেল ও তিন চাকার গাড়ি চলতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্মাণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। টানেলের ভেতর দিয়ে কী ধরনের গাড়ি চলবে এবং টোল কত হবে এর একটা প্রস্তাবিত তালিকা করেছে সংস্থাটি। প্রস্তাবিত টোল হার সদ্যসমাপ্ত বছরের (২০২২) ২০ ডিসেম্বর অনুমোদন দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এখন সেটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের নির্ধারণ করা টোল অনুযায়ী, টানেলের মধ্যে দিয়ে যেতে হলে ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার), জিপ ও পিকআপকে দিতে হবে ২০০ টাকা করে। আর মাইক্রোবাসের জন্য দিতে হবে ২৫০ টাকা। ৩১ বা এর চেয়ে কম আসনের বাসের জন্য ৩০০ এবং ৩২ বা তার চেয়ে বেশি আসনের জন্য ৪০০ টাকা টোল দিতে হবে।
টানেলে দিয়ে যেতে হলে ৫ টনের ট্রাককে ৪০০ টাকা, ৫ থেকে ৮ টনের ট্রাককে ৫০০, ৮ থেকে ১১ টনের ট্রাককে ৬০০ টাকা টোল দিতে হবে। ট্রেইলরের টোল নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা।

About The Author

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply