অক্টোবর ৪, ২০২২ ৩:১৮ পূর্বাহ্ণ

১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন বর্তমান সময়ের ছাত্ররা কতটুকু ধারণ করে ?

মো. আবদুর রহিম
১৯৬২ সাল। তখন ছিল পাকিস্তানের শাসন আমল। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গঠিত যুক্তফ্রন্টের কাছে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম পরাজয়ের পর পাকিস্তানী শাসক শ্রেণি পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার প্রতি বৈরি আচরণ ক্রমান্বয়ে কঠোর থেকে কঠোর করতে শুরু করে। পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানকে তারা দমিয়ে রাখা, অনুগত রাখা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে পরিগণিত করতে থাকে। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার মতো মৌলিক ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য সৃষ্টি করতে থাকে। তারা শিক্ষার অধিকার সংকুচিত করা এবং সার্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য সৃষ্টির লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা উপমহাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির তোয়াক্কা না করে ‘শরীফ কমিশন’ গঠন করে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি নিয়ে ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ‘শরীফ কমিশন” গঠন করে সেই কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট ‘শরীফ কমিশন’ তাদের প্রতিবেদন সরকারের নিকট পেশ করে। শরীফ কমিশনের রিপোর্টে শিক্ষা বিষয়ে যেসব প্রস্তাবনা নিয়ে আসা হয় তার প্রধান উদ্দেশ্যে বাঙালির শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া। এ কমিশন বিশ^বিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তন করে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অসামাঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ১৯৫২ সালে অর্জিত মায়ের ভাষার অধিকার অর্থাৎ বাংলা বর্ণমালাকে পরিবর্তন করার দুরভিসন্ধিসহ ছাত্র শিক্ষকরা কি কার্যকলাপ করছে তা নিয়মিত তদারকি করার সুপারিশ করে। তৎকালীন ছাত্র সংগঠনগুলো শরীফ কমিশনের সুপারিশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলে। দেশের সাধারণ মানুষ ও সরকারের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে শরীফ কমিশন বাতিলের জন্য ছাত্রদের সাথে একাকার হয়ে যায়। শিক্ষার অধিকার সমুন্নত রাখতে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নিপীড়ন ও শিক্ষা ও সংকোচন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। এদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দেশব্যাপী হরতাল আহবান করে। হরতালে হাজার হাজার ছাত্রজনতা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। সমাবেশ পরবর্তী মিছিলে পুলিশ নিরস্ত্র মানুষের ওপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। এতে শহিদ হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুল সহ নাম না জানা অনেকেই। সেই তীব্র আন্দোলন সামাল দিতে ব্যর্থ হয় সামরিক সরকার। বাধ্য হয়ে ‘শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্ট স্থগিত করা হয়। বিজয় হয় বাংলার বাঙালির, বিজয় সূচিত হয় ভাষা আন্দোলনের শহীদদের।
সেই দিন থেকে ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। বাঙালি জাতি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার একটি বীজ বপন করেছিল। ১৯৬২ সালের শিক্ষার অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার এই বীজ থেকে অংকুরোদগম হলো। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম যে শুরু হয় তাঁর ধারাবাহিক প্রতিফলন ১৯৫২ ও ১৯৬২ সালের ২টি আন্দোলন। এসবের পেছনে মূলপ্রেরণা ও শক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্র সমাজের দাবী আদায়ের পথ ধরে তৎকালীন স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে একের পর এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন পরিচালনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ৬দফা ঘোষনার পর গোটাজাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খান বাঙালির অধিকার আন্দোলন দমাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও অন্যদের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। তারই প্রতিবাদে ১৯৬৯ সালে ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতন হয়। দেশে নির্বাচন হয়। আওয়ামী লীগ মহাবিজয় অর্জন করে। পাকিস্তানীরা ক্ষমতার মসনদ দখলে রেখে বাঙালিদের চিরতরে নিঃশেষ করতে ১৯৭১ এর সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার ডাক দেন। বাঙালি জাতি একসাগর রক্ত উৎসর্গ করে পাকিস্তানী ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে বাংলাদেশের বিজয় ছিনিয়ে আনে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু রচিত সংবিধানে শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন। সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা। তাতে বলা হয় ‘(ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য খ) সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য এবং যে প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ আমরা জানি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সামরিক জ্যান্তা ও তাদের দোসর আলবদর, আলশামস ও রাজাকাররা পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর এদেশকে মেধাশূণ্য করার লক্ষ্যে দেশের বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলে যায়। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে জাতির পিতা স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তিনি ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষা সংস্কার, জীবনজীবিকার শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ড. কুদরত ই-ক্ষুদাকে চেয়ারম্যান করে শিক্ষা কমিশন গঠন, বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠন, প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ এবং জাতীয় সংবিধানে শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে দেশের শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসে। স্বাধীন দেশে বৈষম্যহীন ও সুযোপযোগী শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম গ্রহণ করেন জাতির পিতা। তিনি ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন যাতে সেই সময়ে শিক্ষার অধিকারের আদায়ের শহীদদের আত্মা শান্তি পায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে সেই ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের সময়ের সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার মূলনীতি বাতিল করে দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে ১৯৭৩ সালে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই ও গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক প্রদান, ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ, ১১ হাজার প্রাথমিক স্থাপন, ৪৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ প্রদানের মতো বৃহৎ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্ধ রেখেছিলেন। দুঃখের বিষয় যে, করোনা মহামারির কারণে বিশ^ব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১৯০টি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। ফলে প্রায় ১২০ কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি ক্লাস না হওয়ায় দেশের শিক্ষার ক্ষতি হয়েছে, সংসদ টিভি, বেতার, অনলাইন, মুঠোফোনের মাধ্যম পাঠদান করা হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত থেকে পাঠ গ্রহণের পূর্ণতা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের শিশু তহবিল এর তথ্য থেকে জানা যায়, মহামারির শুরুতে বিশে^র মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষা ব্যাহত হয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকারের পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে মোট স্বাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বর্তমান সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান, দুপুরের খাবার প্রদান সহ বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরে দেশের কর্মসংস্থানের শিক্ষার সার্বজনীন শিক্ষা, বিশ^মানের শিক্ষা, সৃজনশীল শিক্ষা, মেধা, বুদ্ধি নির্ভর শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, জ্ঞানমুখী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সরকার ২০১০ সালে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। বিষয়বস্তু ও পাঠ্যপুস্তকের বোঝা ও চাপ কমিয়ে আনন্দময় শিক্ষাপদ্ধতি চালু হয়েছে। এ শিক্ষানীতিতে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা মধ্যে ৪নং লক্ষ ‘গুণগত শিক্ষা’ অর্থাৎ সবার জন্য অন্তর্ভূক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ অব্যাহত রাখার সহ বৈষম্যহীন শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের চেতনায় শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি দেশকে অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য সরকার বহুমুখি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সরকার আশা করছে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশে^র ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। সরকারের ‘রূপকল্প ২০৪১’ এবং ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতাকে আরো সম্মান ও পুরস্কৃত করতে সরকার প্রস্তুত। প্রিয় প্রজন্ম আমরা যদি দেশের সুনাগরিক হই, তাহলে আমরা ১৯৬২’র শিক্ষার অধিকার আন্দোলনের চেতনায় শানিত হয়ে দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবো এবং দেশকে উচ্চতায় নিতে জ্ঞান নির্ভর শিক্ষায় সুশিক্ষিত হবো এবং শহীদের রক্তের মর্যাদা দেবো।লেখক: সাধারন সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা স্মৃতি পরিষদ

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply