ডিসেম্বর ২, ২০২১ ৪:৩৫ অপরাহ্ণ

ধর্মকে কেন বারবার আঘাত করা হয় ?

আজহার মাহমুদ

 

 

 

 

অসামপ্রদায়িক এবং সম্প্রীতির দেশ আমাদের বাংলাদেশ। এতোদিন এটাই আমাদের জানা ছিলো। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এই ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ ধর্মপরায়ণ। যে কোনো ধর্মের প্রতি এদেশের মানুষের সম্মান শ্রদ্ধা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এই সোনার বাংলায় যেনো সকল ধর্মের মানুষ মুক্ত বাতাস নিয়ে দেশকে ভালোবেসে বাঁচতে পারে সেটাই সকলের চাওয়া। কিন্তু এই চাওয়া এখন চাওয়াই থেকে গেলো। দিন দিন যেন দেশে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ বাড়ছে।
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন সকল ধর্মের মানুষ যেনো যার যার ধর্ম শান্তিতে পালন করতে পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে এদেশের কিছু ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী। বঙ্গবন্ধুর সাজানো এই বাংলায় আজ অশান্ত হয়ে উঠেছে ধর্মীয় হানাহানী এবং আঘাতে। বাংলাদেশে এখন সাম্প্রদায়িকতার হাওয়া বইছে। ইসলাম হোক কিংবা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যে কোনো ধর্মেই অশান্তি চায় না। প্রতিটা ধর্মের মানুষ চাইবে তার ধর্ম যেনো সে শান্তিতে পালন করতে পারে। তাহলে আপনি বলতে পারেন, অশান্তি চায় কারা ? সহজ প্রশ্ন। অশান্তি চায় তারাই যাদের স্বার্থ হাসিল করতে হবে, যারা কোনো ধর্মেই পড়ে না, যারা দেশের শত্রু, যারা মানবতার শত্রু তারাই অশান্তি চায়।
বর্তমান সময়ে এদেশে ধর্ম পালনে বাঁধা দেওয়ার মতো নিকৃষ্ট এবং জঘন্য অপরাধের চিত্রও দেখা যায়। আমাদের সমাজে এবং দেশে এখন আমরা দেখতে পাই মসজিদ মন্দির সহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়ে হামলা হতে। ভেঙ্গে দেওয়া হয় মসজিদ, মন্দির, প্যাগুডা। সম্প্রতি যা ঘটে গেলো সেটাতো আমরা দেখলাম। রংপুরের পীরগঞ্জে জেলে পাড়ায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কিছু সন্ত্রাসী। এর আগে কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন শরীফ রেখে ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করেছে কিছু সন্ত্রাসী। যাতে বাংলার হিন্দু-মুসলমান আলাদা হয়ে যেতে পারে, দাঙ্গায় জড়াতে পারে। সেটা তারা পেরেছেও, যার ফল হিসেবে কিছু ধর্মান্ধ যাচাই বাছাই ছাড়া পূজা মণ্ডপে ভাঙচুর চালিয়েছে। এরপর ফেনী বড় মসজিদে কিছু সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এভাবে এর শেষ কোথায় হয় সেটাই বড় প্রশ্ন এখন!
আমরা যদি একদম অতীতে ফিরে দেখি তবে দেখতে পাবো ২০০২ সালের রঘুনাথ মন্দির হামলা , ২০১২ সালের কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিএনএস ইশা খাঁ ঘাঁটি সংলঘ্ন মসজিদে বোমা হামলা চালানো হয়।

এ ছাড়াও ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাজশাহির বাগমারা এলাকায় একটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় কিছু আত্বঘাতী হামলাকারী। এই হামলায় দুর্বৃত্তরা সহ নিহত হয় একজন এবং আহত হয় ৩০ জনেরও অধিক। ২০১৬ সালের ৮ জুন বগুড়ার শিয়া মসজিদের হামলা সম্পর্কেও আমাদের অজানা কিছু নয়। ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার একটি গ্রামে কালী মন্দিরে হামলা ও অগ্নি সংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। এ রকম হাজারো নথি আমাদের নিকট থাকতে পারে। কিন্তু এর পরেও এই ধরনের অপরাধের বিরোদ্ধে কোনো সচেতনতা কিংবা আইনি পদক্ষেপ আমরা দেখছিনা। আমরা মসজিদ ভাঙ্গলে হিন্দুদের দোষারুপ করি আর মন্দির ভাঙ্গলে মুসলমানদের দোষারুপ করে থাকি। কিন্তু মূলত অপরাধী কারা তা আমরা যাচাই করি না। আসলে অপরাধী কোনো ধর্মের নয়। এরা অন্য একটি দল কিংবা গোত্র। যারা ধর্ম বিশ্বাস করে না তারাই এসব কর্মকান্ড করে থাকে। আসলে এদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের দাঙ্গা তৈরী করে দেওয়া। ইসলাম কখনোই এসব সমর্থন করে না। আমরা জানা মতে কোনো ধর্মেই এসব নোংরা কাজ সমর্থন করে না। প্রতিটা ধর্মই শান্তি চায়। সারা বাংলাদেশে ২ লাখ ৫০ হাজার ৩১৯ টিরও অধিক মসজিদ রয়েছে। ধর্মপরায়ন মানুষ না থাকলে এতো মসজিদ তৈরী হতো না বাংলাদেশে। একইভাবে মন্দিররের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশে। ধর্মের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আছে বলেই দেশে এতো বেশী বেশী ধর্মীয় প্রতিষ্টান তৈরী হচ্ছে। কোনো ধর্মে মারামারি, হানাহানী, এবং হামলা সমর্থন করে না। এটা কোনো ধর্মে উল্লেখও নেই। যারা এসকল কথা বলে মানুষকে বিপথগামী করে তুলে তারা আসলেই ধর্মবিরোধী, দেশ ও জনগনের শত্রু। তাই বর্তমান সরকারের কাছে প্রত্যাশা এসকল কর্মকান্ডে যারা জড়িত তাদের দেশ থেকে অতিদ্রুত উচ্ছেদ করা। সরকারেরও ধর্মের প্রতি আরো সহনশীল হতে হবে। বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এবং ভালোবাসা আছে। তাই আমি আশাকরি বর্তমান সরকার কোনো ধর্মকেই অবহেলা করবে না। প্রতিটা ধর্মের মানুষদের সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের। বঙ্গবন্ধুর এই সাজানো সোনার বাংলায় যেনো সকল ধর্মের মানুষ সুন্দর এবং স্বাভাবিক ভাবে জীবন যাপন করতে পারে সেটাই আমাদের কাম্য। দেশে যেনো আর কোনো মসজিদ, মন্দির এবং ধর্মিয় প্রতিষ্টান ভাঙ্গতে না পারে সে দিকে নজর দেওয়া অতীব জরুরী।

আশা করি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে দেখবে। দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে তাদের ধর্মের প্রতি কখনোই আঘাত হানতে দিবেন না বর্তমান সরকার। এটা আমরা বিশ্বাস। আমাদের এই সোনার বাংলায় ধর্মকে হাতিয়ার করে যেনো কোনো ধরনের রাজনীতি করা না হয় সেটাও সকলের মাথায় রাখতে হবে। আমাদের সকলের এক হতে হবে। মুসলমানদের পাশে হিন্দু, হিন্দুর পাশে মুসলমান, এভাবেই সকলের এক থাকতে হবে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান সহ সকল ধর্মের মানুষরা যদি এক হয়ে কাজ করতে পারে তবে আমাদের এই সোনার বাংলা বিশ্বের মাঝে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে থাকবে। চাই শুধু একতা। সম্মান দিতে হবে প্রতিটা ধর্মের মানুষকে। সম্মান দিতে হবে প্রতিটা ধর্মকে। এক ধর্ম যদি অন্য ধর্মকে হিংসার চোখে দেখে তবে কখনোই এই সমস্যার সমাধান হবে না। তখন সুযোগ নিবে তৃতীয় কোনো পক্ষ। যারা ধর্মে বিশ্বাসী নয়। যারা ধর্ম বিরোধী তারাই এসকল হামলা করে এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের দ্বন্ধ তৈরী করে দেয়। যারা ধর্ম বিরোধী তারা মানবতা বিরোধী। এরা সবকিছুই করতে পারে। এরা মানুষ খুন থেকে শুরু করে যাবতীয় ধর্ম বিরোধী কাজ করবে। ধর্ম যা সমর্থন করে না এরা তাই করে। এসকল মানবতা বিরোধীদের বিরোদ্ধে এক হতে হবে আমাদের। সচেতন হতে হবে সকল ধর্মের মানুষদের। এক হতে হবে প্রতিটা ধর্মালম্বীদের। আমরা জানি একতাই বল। তাই সকলে এক হয়ে এসকল ধর্ম এবং মানবতা বিরোধীদের বিরোদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবেই বাঁচবে ধর্ম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্টান। তাই আসুন সকলে এক হয়ে সকলের পাশে দাঁড়াই, সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, এক ধর্মের বিপদে অন্য ধর্ম এগিয়ে যাই। দেখবেন পৃথিবীটা যেমন সুন্দর তেমনী সুন্দর লাগবে সকল ধর্ম। সুন্দর হয়ে উঠবে প্রতিটা মুনষ এবং মানুষের মানসিকতা। তাই ধর্মের প্রতি সকলের শ্রদ্ধা থাকা একান্ত জরুরী বলে আমি মনে করি।

লেখক: আজহার মাহমুদ, শিক্ষার্থী, বি.বি.এ(অনার্স), হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ(৩য় বর্ষ), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ওমরগনি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চট্টগ্রাম।

শেয়ার করুনঃ

খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করতে হবে

সামাজিক শৃংখলার অধঃপতন

Leave a Reply