অক্টোবর ২১, ২০২১ ৮:১৪ অপরাহ্ণ

জ্বিনের বাদশার খপ্পরে পড়ে চট্টগ্রামে ১ প্রবাসীর স্ত্রী খোয়ালেন ২২ লাখ টাকা, একের পর এক আসছে জ্বিনের বাদশার বিরুদ্ধে অভিযোগ

চট্টগ্রামের এক প্রবাসীর স্ত্রী কথিত অনলাইন টিভির বিজ্ঞাপন দেখে দুরারোগ্য রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় শরণাপন্ন হন ‘জ্বিনের বাদশা’র। এক জবাবেই কথিত ‘বাদশা’ দেন সব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস। পাতানো ফাঁদে পা দেওয়ার পর সেই প্রবাসীর স্ত্রীর কাছ থেকে একে একে হাতিয়ে নেওয়া হয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। শুধু চট্টগ্রামের ওই গৃহবধূই নন, গত ৬ মাসে ‘জ্বিনের বাদশা’র প্রতারণার জালে পড়ে আরও বিভিন্নজন খুইয়েছেন কমপক্ষে ৬০ লাখ টাকা। তবে পুলিশ ধারণা করছে, চক্রটি অন্তত কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারণার মাধ্যমে। এই প্রতারণার প্রচারণার জন্য চক্রটি ব্যবহার করতো সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া হেলেনা জাহাঙ্গীরের ‘জয়যাত্রা টিভি’সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।

 

 

 

 

ঢাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ‘জ্বিনের বাদশা’ পরিচয় দেওয়া চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। গ্রেপ্তার হওয়া এই তিনজন হলেন— মূল হোতা আল আমিন, মো. রাসেল ও মো. সোহাগ। এর মধ্যে ৩ আগস্ট মঙ্গলবার ভোলায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় প্রতারক চক্রের হোতা আল আমিনকে। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী  ৪ আগস্ট বুধবার ভোররাতে রাজধানীর ডেমরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তার দুই সহযোগী রাসেল ও সোহাগকে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মুক্তা ধর জানান, চট্টগ্রামের ওই ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বিদেশে থাকেন। তার একটি দুরারোগ্য ব্যাধি ছিল। এই রোগ থেকে মুক্তির আশায় টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন দেখে কথিত ‘জ্বিনের বাদশা’কে ফোন করলে ওই নারীকে বলা হয়, তার সমস্যার সমাধান করানো সম্ভব।

‘জ্বিনের বাদশা’ নামধারী চক্রটি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য ওই নারীর কাছ থেকে প্রথমে ৯৯৯ টাকা নেয় গরিব মানুষকে খাওয়ানোর কথা বলে। এরপর ধাপে ধাপে ‘জ্বিনের বাদশা’র সঙ্গে কথা বলে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তির আশায় মোট ২২ লাখ টাকা খোয়ান চট্টগ্রামের ওই নারী।

এক পর্যায়ে ওই নারী প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন বুঝতে পেরে চট্টগ্রামের খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্তে নেমেই ‘জ্বিনের বাদশা’ চক্রের তিনজন সদস্যকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

সিআইডির এসএসপি মুক্তা ধর বলেন, ‘জ্বিনের বাদশা’ চক্রের মো. আল আমিন সাম্প্রতিককালে আলোচিত ও সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া হেলেনা জাহাঙ্গীরের ‘জয়যাত্রা টিভি’সহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ক্যাবল নেটওয়ার্কের লোকাল চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিতো। সেই বিজ্ঞাপনে দেওয়া হতো জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করা, বিদেশে যাওয়ার সুব্যবস্থা করা, দাম্পত্য কলহ দূর করা, বিয়ের বাধা দূর করা, অবাধ্যকে বাধ্য করা, চাকরিতে পদোন্নতির আশ্বাস। সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন মানুষ যোগাযোগ করলে মেয়েলি কণ্ঠে কথা বলে সরলমনা মানুষকে ফাঁদে ফেলা হতো। পরবর্তীতে তাদের কথা অনুযায়ী কাজ না করলে প্রিয়জনের ক্ষতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতো এই জ্বিনের বাদশা চক্র।

পুলিশ জানায়, কথিত অনলাইন টিভিগুলোতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বরে ফোন দিলে একজন ফোন রিসিভ করে বিস্তারিত তথ্য নিতেন। পরে ওই ফোন দাতাকে বলা হতো তারা ‘কাজ’ করছেন। গরিব মানুষকে এক বেলা খাওয়ানোর জন্য পাঠাতে হবে ৯৯৯ টাকা বা ১১১১ টাকা। টাকা পাঠানোর পর দেওয়া হয় ‘জ্বিনের বাদশা’র ফোন নম্বর। এই সঙ্গে নির্দেশনাও দেওয়া হয়, ‘জ্বিনের বাদশা’কে ফোন করতে হবে রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে।

রাতে নির্ধারিত সময়ে ওই নম্বরে ফোন দিলে একজন পুরুষ ফোনটি রিসিভ করেন। সালাম বিনিময়ের পরিবারের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য নেন তিনি। এরপর সাহায্য প্রার্থীদের জানানো হয়, জ্বিন-পরীর মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবেন। আশ্বস্ত করা হয়, পরে সাধনা করে সব সমস্যার সমাধান করা হবে।

২২ লাখ টাকা খোয়ানো চট্টগ্রামের ওই প্রবাসীর স্ত্রীকে বলা হয়, তার বাসার নিচে আড়াই কেজি স্বর্ণ লুকানো আছে। আর সেই স্বর্ণ পাহারা দিচ্ছে অজগর সাপ। ওই স্বর্ণ আনতে পারলে তাদের একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দিতে হবে। পরে তাকে বলা হয়, সাপকে খাওয়ানোর জন্য আড়াই মণ দুধ ও ১০ কেজি আতর লাগবে। এভাবে বিভিন্ন সময় ওই নারীর কাছ থেকে চক্রটি ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

ওই নারীকে বারবার বলা হতো, তার স্বামী-সন্তান বা অভিভাবককে কোনোভাবেই যেন এসব কথা জানানো না হয়। জানালে তার স্বামী ও সন্তানের ক্ষতি হতে পারে।

চক্রটির তিন সদস্যকে ধরার পর পুলিশ জানিয়েছে, গত ছয় মাসেই চক্রটি কয়েকজনের কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তবে তাদের জব্দ করা ব্যাংক একাউন্টে পাওয়া গেছে মাত্র ১২ লাখ টাকা।

পুলিশ বলছে, আরও যেসব ভুক্তভোগীর কাছে থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে হাতানো টাকার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা হতে পারে।

 

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply