সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১ ৪:০৫ পূর্বাহ্ণ

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে সেফুদা নাতিন ডাকতেন, সম্পর্ক ছিল মধুর ছিল লেনদেনও !

  ঢাকা অফিস

 

 

অস্ট্রিয়া প্রবাসী সেফাতউল্লাহ ওরফে সেফুদার সঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীরের ‘যোগাযোগ ও লেনদেন’ ছিল বলে জানিয়েছেন র‌্যাব।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেছেন, “সেফুদা তাকে (হেলেনা জাহাঙ্গীর) নাতনি হিসাবে সম্বোধন করে থাকে। তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং লেনদেন আছে।”

ফেইসবুক লাইভে বিভিন্ন অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে ২০১৮ সালে আলোচনায় আসেন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় বসবাসকারী সেফুদা। ফেইসবুক লাইভে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকার আদালতে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা হয়েছিল।

এক আইনজীবীর দায়ের করা ওই মামলায় সেফুদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে তার সম্পত্তি জব্দেরও নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।

আওয়ামী লীগে পদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে বৃহস্পতিবার রাতে তার গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে বিদেশি মদ, ক্যাঙ্গারু ও হরিণের চামড়া, বিদেশি মুদ্রা, ওয়াকিটকি ও ক্যাসিনোর সরঞ্জাম জব্দ করার কথা জানানো হয় র‌্যাবের পক্ষ থেকে।

পরে মিরপুরে হেলেনার মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপি টিভির কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সেটি বন্ধ করে দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এফবিসিসিআইর পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা গ্রুপের কর্ণধার। তিনি এক সময় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপকমিটিতে ছিলেন। কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদেও ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি ‘ভূইফোঁড়’ সংগঠনে হেলেনা জাহাঙ্গীরের সভাপতি হওয়ার খবর চাউর হলে সম্প্রতি তাকে দুই কমিটি থেকেই বাদ দেয় আওয়ামী লীগ।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলননে বলেন, নানা ধরনের ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নে সোশাল মিডিয়ায় ‘অপপ্রচার চালানোর একটি সংঘবদ্ধ চক্র’ গড়ে তুলেছিলেন হেলেনা জাহাঙ্গীর।

“তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন। নিজের খ্যাতি লাভের আশায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে ছবি তুলে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে খ্যাতনামা হিসাবে উপস্থাপন করতে চাতুরির আশ্রয় নিতেন হেলেনা জাহাঙ্গীর।”

ব্যবসা থেকে রাজনীতিতে আসা হেলেনা ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী’ ছিলেন মন্তব্য করে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মঈন জানান, তার বিরুদ্ধে পাঁচটি আইনে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

                                                                             কে এই সিফাত উল্লাহ ওরফে সেফুদা?

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্প্রতি নানা ধরণের অশ্লীল, অসঙ্গতিপূর্ণ ভিডিওবার্তা ছড়িয়ে বেশ আলোচনায় সিফাত উল্লাহ ওরফে সেফুদা নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশি। নানা বিষয় নিয়ে ফেসবুক লাইভে এসে অল্প সময়ে ‘তারকা’ বনে যান সেফুদা। প্রথমের দিকে সেফুদা নামটি তার নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তখন তার ফেসবুক লাইভ দেখার মতো মানুষও ছিল না।

সেই সময়য় শুধু সিফাত উল্লাহ নামেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত ছিলেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারের সাথে এক তরুণীর ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময়য় সিফাত উল্লাহ ফেসবুকে একটি লাইভ করেন। তখন থেকেই মূলত তার লাইভে দর্শক বাড়তে থাকে।

বর্তমানে অস্ট্রিয়া প্রবাসী এ বাংলাদেশির এমন আচরণে অনেকটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে তার পরিবার। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। ১৯৯০ সাল থেকে তিনি অস্ট্রিয়ার রাজধানীর ভিয়েনায় বসবাস করছেন।

অল্প সময়ে ফেসবুক তারকা বনে যাওয়া এ সেফুদা মূলত মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তার এমন কর্মকাণ্ডে পরিবারসহ আত্মীয়-স্বজন খুবই লজ্জিত বলেন তার স্ত্রী। জানা যায় তার পুরো নাম সেফাতউল্লাহ মজুমদার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা পড়া করেছেন l

ভিয়েনা বাঙালি কমিউনিটির পরিচিত মুখ ও প্রবাসী সাংবাদিক ফিরোজ আহমেদ জানান, ভিয়েনা বাংলাদেশ কমিউনিটির এক পারিবারিক ঝগড়ার কারণে কোর্টের রায়ে দীর্ঘদিন ভিয়েনায় জেল খাটেন সেফাতউল্লাহ। মুক্ত হবার পর অস্ট্রিয়ার আইন অনুযায়ী তার লিগ্যাল হবার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। স্ত্রী সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন সেফাতউল্লাহ।

সেফুদার কর্মকাণ্ডে তার পরিবার বিব্রত। সিফাত উল্লাহর স্ত্রী এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমরা এখন কি করতে পারি, এগুলো বন্ধ করার কি কোনো উপায় নেই? সে তো অসুস্থ কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া কর্তৃপক্ষ কি এগুলো বন্ধ করে দিতে পারেনা? উনিতো আসলে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত।

তিনি যদি এই রোগে আক্রান্ত হন তাহলে চাকরি করছেন কীভাবে? সিফাত উল্লাহ একাই অস্ট্রিয়ার একটি বাসায় থাকেন। পরিপাটি হয়ে অফিসে যান, অফিস থেকে ফেরেন। তার ফেসবুক লাইভেও এসবের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে তিনি অসলংগ্ন কথাবার্তা বলেন।

বাংলাদেশ পুলিশের মহা পরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারি জানান, এধরনের যারা দেশের বাইরে বসে দেশের সম্পর্কে বিরুপ মন্তব্য করে নিজ দেশের সম্মান নষ্ট করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

     হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ৩ মামলা  

আওয়ামী লীগের উপ কমিটির পদ হারানো হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে। ৩০ জুলাই শুক্রবার তার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দুটি এবং পল্লবী থানায় একটি মামলা হয়েছে।

গুলশান থানায় করা দুটি মামলার একটি করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। একই থানায় দায়ের করা অন্য মামলাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো একত্রিত করে করা হয়। তৃতীয় মামলাটি করা হয় পল্লবী থানায়। সেখানে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি করা হয়েছে।

গুলশাল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় হেলেনার বিরুদ্ধে ২৫, ২৯ ও ৩১ ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে।

যে সাজা হতে পারে হেলেনা জাহাঙ্গীরের

ডিজিটাল নিরাপত্তা আ্নের ২৫, ২৯ ও ৩১ ধারায় মূলত হানহানি ভীতি প্রদর্শন ও রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কথা বলা হয়েছে। এ আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে: আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ, ইত্যাদি।

২৫ ধারায় বলা হয়েছে: আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ, ইত্যাদি।

(১) বলা হয়েছে যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে- (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণু করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

২৯ ধারায় বলা হয়েছে: মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি

(১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860) এর section 499 এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

৩১ ধারায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

(১) বলা হয়েছে যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৭ (সাত) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

 

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply