জুলাই ২৮, ২০২১ ৫:৪৯ অপরাহ্ণ

হাসপাতালের টর্সার সেলে নির্মম নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু কমিশনার রাজুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের

আশরাফ উদ্দিন, মিরসরাই

চট্টগ্রামের মিরসরাই পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও ৪নং ওয়ার্ড কমিশনার শাখের ইসলাম রাজুকে প্রধান আসামী করে মিরসরাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে, মামলা নং-১৩। এতে আসামী করা হয়েছে কমিশনার রাজুর আরো তিন সহযোগী ফরীদ, তারেক ও জাহীদকে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আসামী রাখা হয়েছে আরো একাদিক। শাখের ইসলাম রাজুর ঘৃহপরিচালিকার সৎ পুত্র আজীম হোসেন শাহদাত (২০) কে তার পরিচালনাধিন হোপ-মা ও শিশু হাসপাতালের টর্সার সেলে নির্মম নির্যাতন করে মেরে ফেলার অভিযোগ এনে রবিবার (২৬ জুন) রাতে মামলা টি দায়ের করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের পিতা মো: আব্দুল বাতেন। নির্মম নির্যাতনে নিহত আজিমের পিতা নিরীহ আব্দুল বাতেন তার অভিযোগে বলেন, শুক্রবার (২৫ জুন) বিকাল ৪টায় আমার ছেলেকে কোন অপরাধে কমিশনার রাজু ধরে নিয়ে এসেছে আমি জানি না। রাত ৮টায় খবর পেয়ে আমি হোপ হাসপাতালের ৬ষ্ট তলায় কমিশনারের টর্সার সেলে গিয়ে দেখি আমার ছেলেকে কমিশনার রাজু সহ আরো তিন জন এলোপাতাড়ি মারধর করছে। মারধরের কারন জানতে চাইলে তারা আমাকেও মারধর করে ও হুমকি দেয়। আমাকে বলে এখানে কোন কথা বলা যাবে না, একদম চুপ থাকতে হবে। চোখে তাকিয়ে থাকতে হবে কিছু বলা যাবে না। চোখের সামনে চারটা লোক হাতের লাঠি দেয় একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছে ছেলেটাকে নিজেকে সামলাতে না পারলেও কিছুই করার ছিলোনা শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়েছে। কমিশনারের লাঠির আঘাতে ছেলের সামনের দুটি দাত পড়ে গিয়ে মুখ থেকে রক্ত ঝরছিলো। সামনের টেবিলে একটি বোতলে পানি খেতে ছেয়েছিল ছেলেটি একটু পানি থেকে না পেরে চুপ হয়ে যায় ছেলেটি। কমিশনারের খাটের পাশেই অচেতন হয়ে পড়ে থাকে আজিম। তার নিথর দেহ টেনে সরাতেই রক্ত লাগে কাউন্সিলর রাজুর তোষকে। নিথর দেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয় আজিমের পিতা আব্দুল বাতেনকে। নির্যাতনে সকল আলামত ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। নিযাতনে ব্যবহৃত সকল লাঠি সরিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া হুশিয়ার করে দেওয়া হয় যেন কারো কাছে মুখ না খোলে, মুখ খুললেই একই পরিনতী হবে পিতা আব্দুল বাতেনেরও। ভয়ে আতঙ্কে আব্দুল বাতেন নিজ সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে রওনা হয় বাড়ির পথে। যাত্রা পথে ফেনী সরকারী হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার আজিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

আজিমের শরীরে আঘাতে চিহ্ন দেখে হাসপাতাল থেকে থানায় খবর দিলে খবর বিষয়টি হয়ে যায়। সংবাদ পৌছে যায় গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে। তাই বাধ্য হয়ে আজিমের চাচা বাদি হয়ে প্রথম মামলা করেন দাগন ভূঞা থানায়। দাগন ভূইয়ার বিভিন্ন আঞ্চলিক পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশ হলে টনক নড়ে মিরসরাই প্রশাসনসহ সর্বমহলের। মিরসরাই থানা পুলিশ, পুলিশের উদ্ধতন কর্তৃপক্ষ ও সংবাদকর্মীরা ভিড় জমান রাজু কমিশনারের পরিচালনাধিন হোপ মা ও শিশু হাসপাতালের ৬ষ্ট তলার সেই টর্সার সেলে। পুলিশ উপস্থিত হয়ে দেখতে পায় টর্সার সেলের দরজায় তালা লাগানো পলাতক কমিশনার রাজু সহ তার বাহিনীর অন্যরাও। টর্সার সেলের দরজার লিখা আছে শাখের ইসলাম রাজু ম্যানেজিং ডিরেক্টর। স্থানিয়দের সাক্ষিরেখে ও পুলিশের উপস্থিতিতে তালা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে টর্সার সেলের তেমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। পুলিশ ধারনা করছে দীর্ঘ সময় পাওয়ায় সমস্ত আলামত সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে শাখের ইসলাম রাজু। ঘটনার দিন হাসপাতালে কর্মরত ৫ জনের মোবাইল নাম্বারে হাসপাতালের নাম্বার থেকে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোউ ফোন রিসিভ করেনি। হাসপাতালের নৈশপ্রহরীকেও পাওয়া যায়নি। সরজমিনে খোজখবর নিতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাদিক সূত্র জানায়, প্রতিনিয়ত রাত গভীরে হাসপাতালের উপর তলা (৬ষ্ট) থেকে মানুষের আত্নচিৎকারের শব্দ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে দেখা যায় নির্যাতনের নির্মমতা। তবে মুখ খোলার সাহস হয়না কারো। ঘটনার দিন রাতেও মানুষের আতœচিৎকারের শব্দ ভেসে আসে হাসপাতালের সেই চিলেকোঠা থেকে। মিরসরাই থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান মামরার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, প্যানেল মেয়র শাখের ইসলাম রাজুকে প্রধান আসিমী ও তার সাথে হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া আরো তিনজনে আসামী করে হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে, মামল নং-১৩। আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলমান আছে, হত্যা কান্ডের কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে তবে তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা যাচ্ছে না। টর্সার সেল সম্পর্কে তিনি বলেন, এরকম শুনা যাচ্ছে তবে তেমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। তার পরও ব্যাপক খোজখবর নেওয়া হচ্ছে। সত্যাতা পেলে ওটার ব্যাপারেও ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া কমিশনার রাজুর বিরুদ্ধে গত ফেবরুয়ারী মাসে পৌরসভা নির্বাচন কালিন তার প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী নিজাম উদ্দিনের বড় ভাই ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীনের দুই পা ভেঙ্গে দেওয়ার অভিযোগও করেছে। ওই ঘটনায়ও মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কমিশনার প্রার্থী নাজিম উদ্দিন বলেন, কমিশনার রাজু এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে মানুষদের জীম্মি করে রেখেছে তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। তার সাথে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করায় আমার বড় ভাইয়ের দুই পা ভেঙ্গে দিয়েছে। সেই ঘটনায় মামলা করা হলেও প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কোন আইননি ব্যাবস্থা গ্রহণ করেনি। তখন যদি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হতো তাহলে আজকে সে এই ঘটনা ঘটাতে পারতো না। এই দায় প্রশাসনেরও কোন অংশে কম নয়। প্রশাসন কে টাকা দিয়ে সে হাতের মুঠোয় রেখেছে অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যাবহার করে মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নির্বীঘেœ চালিয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply